
প্রাণঘাতী ডেঙ্গু জনজীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানীজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরের শঙ্কা। ইতোমধ্যে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হলে রোগীর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, স্যালাইন, রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার তাগিদ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশঙ্কা প্রকাশ করছে, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। সময় থাকতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলেছে অধিদপ্তর। একই সঙ্গে জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
রাজধানীতে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় খাল, নালা ও ড্রেনে পানি জমে ঢাকায় মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খাল এখন আবর্জনায় ভরা। কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এসব ময়লা ও স্থির পানিতে দ্রুত বিস্তার ঘটছে এডিস মশার। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এ পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখলেও বাস্তবে মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যমতে, রাজধানীর অধিকাংশ নালা-খালে পানি জমে রয়েছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালির বর্জ্যে অনেক ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে দীর্ঘ সময় স্থির পানি জমে থাকছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব স্থির পানিতে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব এতটাই বেড়ে যায় যে, অনেক এলাকায় স্বাভাবিকভাবে বসে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার দিনের বেলায় মশারি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তা ছাড়া নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। এতে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরিকল্পত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের স্থায়ী উদ্যোগের অভাবই মূল সমস্যা। দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। পরিকল্পনাবিদদের মতে, খাল-নালা ও ড্রেন পরিষ্কারের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত খাল-নালা পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়, দেশব্যাপী এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগের বিস্তার জনজীবনে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সরকারকে এখন থেকেই নিতে হবে। এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট করতে হবে। বাড়ির আঙিনা বা চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলোর কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারকে কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
