
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিনই শিশুমৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে কিটসংকট নিয়ে। কিটস্বল্পতার কারণে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে (ল্যাবরেটরি)। হাম শনাক্তের কিট সরবরাহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরবরাহ করা কিট ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে পাওয়া কিট এই ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় না। তথ্যমতে, প্রতিদিন সারা দেশ থেকে গড়ে ৩০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে আসে। এরই মধ্যে ৭ হাজার ৭৫৮টি নমুনা জমা হয়েছে পরীক্ষার জন্য। ফলে পরিস্থিতি দ্রুতই আরও সংকটময় রূপ নেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হামের এ প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তের কিট না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা অফিস ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। দায়ভার তারা এড়াতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত একটি সমন্বিত চিকিৎসা প্রটোকল প্রস্তুত করা যেত। সেটা হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও মাঠপর্যায়ে পাঠানো যেত। পাশাপাশি ব্যাপক হারে পরীক্ষা বাড়িয়ে রোগী শনাক্ত করে তাদের আলাদা রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত। এটা স্পষ্ট অবহেলার ফল এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কিটসংকটে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে।
শিশু বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক শিশুর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্কে প্রদাহ, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, খিঁচুনিসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। ফলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। হামের পরীক্ষার সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ এখন জরুরি। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা চালু করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং ঢাকামুখী চাপও কমবে।
মৃত্যুহার কমাতে বড় ধরনের কার্যকর উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নিউমোনিয়াসহ জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ঘাটতি আছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেছেন, হামের সংক্রমণের বিপদটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। যারা মাঠে কাজ করেছে, তারাই এর ভয়াবহতা টের পেয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, মহামারি মোকাবিলার মৌলিক ধাপের মধ্যে আছে ডেথ রিভিউ, সমন্বিত চিকিৎসা প্রটোকল, ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন ও জনসচেতনতা। কিন্তু এসব ধাপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা, দ্রুত টিকাদান জোরদার, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো, অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হাম পরিস্থিতিকে উচ্চঝুঁকি হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর এ নিয়ে সরকারের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল। এতে এক দিকে যেমন সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো যেত।
হাম পরীক্ষার কিটসংকটে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসংকটও কাটছে না। তাই সরকারকে জরুরিভাবে কিটের সরবরাহ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া টিকাদানের পাশাপাশি হাম প্রতিরোধে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সরকার বিদ্যমান হামের প্রাদুর্ভাব কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সঠিক নজরদারি এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেটাই প্রত্যাশা।
