
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বছরজুড়েই চোখে পড়ে খোঁড়াখুঁড়ি। উন্নয়ন বা সংস্কারের নামে বছরের বেশির ভাগ সময়েই সড়কগুলো ক্ষতবিক্ষত হতে দেখা যায়। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নকাজের নামে সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও পানির লাইন বসানো হচ্ছে, কোথাও ড্রেনেজ উন্নয়ন, আবার কোথাও গ্যাস বা বিদ্যুৎ-সংযোগের কাজ চলছে। এসব কাজ করছে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা যায়, রোদ উঠলে খোঁড়া রাস্তার মাটি শুকিয়ে ধুলাবালিতে পরিণত হচ্ছে, যা সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পথচারী, দোকানদার এবং যানবাহনের চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। কাজ শেষ হওয়ার পরও অনেক জায়গায় রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। ফলে সড়কের মাঝখানে বা এক পাশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে যানজট, পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনদুর্ভোগ কমাতে সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে মন্ত্রণালয় থেকে ‘ওয়ান স্টপ সেল’ গঠন করা হয়েছে। এ নীতিমালার আওতায় কোনো সড়ক খোঁড়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে অবহিত করা এবং নির্দিষ্ট মাসের মধ্যে কাজ শেষ করে দ্রুত সড়ক সংস্কারের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই নীতিমালা খুব একটা মানা হচ্ছে না। বরং এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপাচ্ছে। সিটি করপোরেশন বরাবরই দ্রুত কাজ শেষ করে সড়ক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতার সঙ্গে এ আশ্বাসের খুব একটা মিল নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উন্নয়নকাজ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা পরিকল্পনাহীনভাবে পরিচালিত হলে জনদুর্ভোগ বাড়ে। কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিতের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে খোঁড়াখুঁড়ির পর দ্রুত সড়ক সংস্কার নিশ্চিত না করলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেক সময় দেখা যায় ওয়াসার একাধিক প্রকল্প ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বাস্তবায়ন হওয়ায় একই সড়ক বারবার খোঁড়া হচ্ছে। আবার কাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিবর্তন হওয়ায় নতুন কর্মকর্তার দায়িত্ব বুঝে নিতে সময় লাগে, যা কাজের গতি আরও মন্থর করে দেয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীর সড়কে দীর্ঘমেয়াদি খোঁড়াখুঁড়ি ও বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট গর্ত এখন ঢাকাবাসীর জন্য চরম আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলে সেবামূলক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। খুঁড়ে রাখা গর্তগুলো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে একেকটি মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর জনজীবনকে এভাবে জিম্মি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনভোগান্তি লাঘবে দ্রুততম সময়ে সংস্কারকাজ শেষ করা এবং বৃষ্টির মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখা দরকার। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সরেজমিন পরিদর্শন ও সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এই ‘নরকযন্ত্রণা’ থেকে সাধারণ জনগণের মুক্তি মিলবে না।
রাজধানীতে উন্নয়নের নামে সংস্কারের যে চিত্র দেখা যায়, তাতে সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থার দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন জনদুর্ভোগে রূপ নেয়। তাই উন্নয়নকাজে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সড়কে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন জরুরি। নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে এবং উন্নয়নের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, সেটাই কাম্য।
