
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ছিল
সরকারি দল বিএনপির। একই কথা আবারও বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন
আহমদ। আশার কথা, প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সরকারের
সিদ্ধান্তের কথাও জানালেন তিনি। স্পষ্টত স্বীকার করেছেন-৫ আগস্টের পর বেশ
কিছু মামলা দায়ের হয়েছে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের উদ্দেশে। যেখানে সাধারণ
নিরীহ মানুষও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।
সরকারি উদ্যোগে যাচাই-বাছাইয়ের
জন্য কমিটিও গঠন করা হচ্ছে। এটি স্বচ্ছতার জন্য প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে কথা বলছিলেন, তখনই পত্রিকায়
প্রকাশ হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর
‘অনৈতিক সুবিধা’র বিনিময়ে রাজসাক্ষী বানিয়েছেন। আর সেই অভিযোগটিও করেছেন
তারই এক সহকর্মী আরেকজন প্রসিকিউটর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ
প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে অপসারণ করে সেখানে বিএনপি সরকার নতুন চিফ
প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামকে।
এ নিয়ে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় হচ্ছে, বিশেষ করে তাজুল ইসলামের সমালোচনায়
মুখর অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। নতুন সরকার তার নীতিমালা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী
গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তাদের পছন্দের কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে এটা
স্বাভাবিক। সব সরকারই সেটা করে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, উন্নত দেশগুলোতেও এর
রেওয়াজ আছে। সুতরাং, তাজুল ইসলামের পরিবর্তে আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়ার
ব্যাপারে তেমন কিছু কথা নাই বা বলা হলো। তারপরও বলতে হবে- আন্তর্জাতিক
অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটরের পরিবর্তনকালে কোনও অনাকাক্সিক্ষত
পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। অন্তত ‘মব’- এর মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি মানুষ। হয়তো
আদালতের কারণে মবকারীরা হৈহুল্লুর থেকে বিরত ছিল।
কিন্তু কিছু
প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পরিবর্তন করতে গিয়ে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে,
তাকে স্বাভাবিক বলে মনে করা যায় না। যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান
এইচ মনসুরকে মব সৃষ্টি করে সরিয়ে সেখানে মোহাম্মদ মোস্তাকুর রহমানকে নতুন
গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ
চৌধুরী গণমাধ্যমে তার মতামত প্রকাশ করেছেন। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ
চৌধুরী বলেছেন, ‘নতুন সরকারের যে কর্মসূচি আছে, যে অগ্রাধিকার আছে এবং যে
চিন্তাভাবনা আছে— এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই
পরিবর্তন হবে।’ তিনি জানান, আরও পরিবর্তন হবে। (প্রথম আলো ২৫
ফেব্রুয়ারি,২০২৬)
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অবশ্যই যৌক্তিক। এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু যখন আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকে মব এর শিকার হন, তখনই প্রশ্ন
আসে- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা সহনীয়। ড. মুহম্মদ ইউনূসের সরকার ক্ষমতা
গ্রহণের নবম দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আহসান
এইচ মনসুরকে। একইভাবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার দশম দিনে নিয়োগ দেয়
মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামকে। মনসুর সাহেবকে নিয়োগ দেওয়ার সময়ও পরিস্থিতি খুব
একটা স্বাভাবিক ছিল না। তার চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিই দেখা গেলো তার
বিদায়কালে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আরও প্রতিষ্ঠানেও পরিবর্তন হবে। হতেই
পারে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় আহসান এইচ মনসুরকে বিদায় নিতে হলো এবং আরও কিছু
প্রতিষ্ঠানে যেভাবে মবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাকে স্বাভাবিক বলার সুযোগ
নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়োজিত গভর্নরের বিরুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক
আচরণের অভিযোগ এনেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা এ বিষয়ে
গভর্নরের সঙ্গে আলোচনাও করতে চেয়েছেন। দেখা গেছে, গভর্নর তাদের তোয়াক্কা না
করে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন।
শুধু তাই নয় তিনি মবের শিকার হয়ে যখন অফিস ত্যাগ করছিলেন, তখনও বলেছেন তিনি
পদত্যাগ করেননি। দুটো বিষয়ই বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। গভর্নর সাহেব
বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বিজ্ঞ মানুষ। তিনি নিজেও জানেন,
সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গভর্নরকে সরকারের আস্থাভাজন হতে হয়।
শুধু তাই নয়, তিনি পরিস্থিতি দেখার পরও পদত্যাগ না করে অনাকাক্সিক্ষত
পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা বললেও কি বাড়িয়ে বলা হবে? এই
পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী, সেটা বিচার করার ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু এটা বলতে
হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানে যা ঘটলো তা হতবাক করার
মতো। এখানে বাংলাদেশের মেধাবীরাই চাকরির সুযোগ পান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক
হিসেবে এখানকার কর্মীদেরও মান- মর্যাদা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে
উঁচুতে। সুতরাং, এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি সেরকম থাকুক এটা সবারই
প্রত্যাশা।
আবার বাংলাদেশ ব্যাংকে যখন মব তৈরি হচ্ছিল, তার আগে থেকেই
সেখানে অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেখানে সরকারও স্বাভাবিক প্রস্থানের
ব্যবস্থা করতে পারতো। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে যে মবের মাধ্যমে
সরানো হয়েছে, এমন মব যদি বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তৈরি হতে থাকে, তখন কি
গোটা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে না?
অনেকেই বলতে পারেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরদের অনেককেই এভাবেই সরতে হয়েছে। এটাও যুক্তিসঙ্গত নয়।
ইতোপূর্বে
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদকে সরানোর জন্য
সেখানেও মব তৈরি হওয়ার কথা মাহবুব মোরশেদ নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, মব সৃষ্টি না করে প্রক্রিয়া মানা উচিত। এখানেও
আগের এমডি/প্রধান সম্পাদককে নাজেহাল হয়েই বেরিয়ে যেতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের এমডিকে কিছু বলারও সুযোগ
দেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজেই মব উসকে দিয়েছে- এমন অভিযোগ শুরু
থেকেই আছে। এই প্রসঙ্গে বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের কথারও
সমালোচনা হয় এখনও। তিনি মব সংস্কৃতির পক্ষে কথা বলতে গিয়ে মবকে প্রেসার
গ্রুপের কাজ বলে অভিহিত করেছেন। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নেই,
গণতান্ত্রিক সরকার আমলে প্রেসারগ্রুপের আবরণে মব সংস্কৃতি চলা উচিত নয়।
ইতোমধ্যে
আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে এমন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা
দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসন শেষ হওয়ার পর
উল্লেখযোগ্য একটা নির্বাচন মাধ্যমে সরকার গঠন হয়েছে। সুতরাং, মানুষের
প্রত্যাশা অনুযায়ী মব সংস্কৃতির অবসান হবে এই চাওয়াটা খুব বেশি বলে মনে করি
না। এই মব সংস্কৃতি যারা তৈরি করছেন, তাদেরকে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের
শুভাকাক্সিক্ষ মনে করা যায় কিনা, সেই প্রশ্নটিও আসে।
সরকার মব চায় না
এমনটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম কার্যদিবসেই উচ্চারণ করেছেন। নবনিযুক্ত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ গ্রহণের পর প্রথম সচিবালয়ে অফিস
করার দিন বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে
না। তবে যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল ও সমাবেশ করা যাবে, স্মারকলিপিও
দেওয়া যাবে। আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে চাই (প্রথম আলো,১৮
ফেব্রুয়ারি,২০২৬)।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার পূণর্ব্যক্ত করে বলা যায়-
মব সংস্কৃতি বিদায় হোক। পরিবর্তন আসুক স্বাভাবিক নিয়মে। চেইন অব কমান্ড
ভেঙে না যায়। সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের সুযোগ দিতে হবে, না হলে আখেরে
ভোগতে হবে দেশের মানুষকেই।
লেখক-সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।
