
গত
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর সরকার গঠন
করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মানুষের
উৎকণ্ঠার অবসান হয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের আপামর
জনসাধারণের প্রত্যাশা- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে জবাবদিহিমূলক
শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক কাঠামোয় সংস্কার আনতে
সক্ষম হবেন। মানুষ তার যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের
মৌলিক অধিকার বিশেষ করে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষিত হবে। নাগরিককের
মুক্তচিন্তা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর অধিকারগুলো রাষ্ট্র সুনিশ্চিত করবে।
যদিও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর পরই তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন
আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ড সচল করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
‘ভোক্তা’ শব্দের সঙ্গে
আমরা সবাই পরিচিত। ভোক্তার ইংরেজি শব্দ কনজুমার, যার অর্থ ভোগকারী। অর্থাৎ
কেউ কোনো পণ্য, খাদ্য, পানীয়দ্রব্য বা সেবা প্রদানকারীর সেবা গ্রহণকারী
অর্থাৎ যারা ভোগ করে তাদের ভোক্তা বলে। দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন
২০০৯-এর আওতায় ভোক্তা হলেন ‘তিনি-ই যিনি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ব্যতীত,
সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে বা সম্পূর্ণ বাকিতে পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন,
অথবা কিস্তিতে পণ্য বা সেবা ক্রয় করেন’। যিনি ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী তিনি
হয়তো একটি পণ্যের ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী হলেও আরও ৫০টি পণ্য ও সেবার
ভোক্তা। আবার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যেসব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা
রাষ্ট্র ও জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত সবই ভোক্তা অধিকারের আওতায়। সে হিসেবে
একজন মানুষের প্রতিদিনের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে ভোক্তা অধিকারের বিষয়গুলো
সরাসরি জড়িত। সে হিসেবে সবাই অপকটে স্বীকার করে থাকেন যে, দেশের ১৮ কোটি
মানুষই ভোক্তা। তার পরও ভোক্তা হিসেবে সাধারণ জনগণের কোনো অধিকার ক্ষুণ্ন,
প্রতারিত বা হয়রানির সম্মুখীন হলে বা তাদের মনোবেদনা জানানোর সুযোগ নেই।
যদিও সরকার ভোক্তা সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান,
শিক্ষা, চিকিৎসা, গণপরিবহন, নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ পরিবেশে বসবাস ও
জীবনযাপনের অধিকার, যা একজন মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা।
ত্রয়োদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে রাজনৈতিক দলগুলো বরাবরের মতো ব্যবসায়ীদের
অগ্রাধিকার দিয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদের
৫৪ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান
ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির
অঙ্গীকার করেছিলেন। সে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মন্ত্রিসভা ও সংসদে বিপুল
সংখ্যক ব্যবসায়ী স্থান পেলেও দেশের ভোক্তা অধিকার কর্মী ও সচেতন জনগণ আশা
ছাড়েননি। কারণ সুদীর্ঘ সময় ধরে দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের
অধিকার আদায়ে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আপসহীন
নেতৃত্বে দেশের মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের হাত ধরেই দেশের
২৪ জুলাইয়ের আশা-আকাক্সক্ষাসহ শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, সত্যিকারের সুশাসন
প্রতিষ্ঠাসহ অনেক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে। যদিও বিগত নির্দলীয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেক সংস্কার কমিশন করলেও মানুষের নিত্যদিনের
বাজারব্যবস্থা সংস্কারে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সে কারণে
জনপ্রত্যাশা হলো সাধারণ জনগণের নিত্যদিনকার সমস্যা, নিত্য ভোগ্যপণ্য
মূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, মজুদদারি, ফড়িয়া ও কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত
বাজারব্যবস্থা সংস্কারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাজারে অসাধু সংঘবদ্ধ
ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেট রোধে প্রতিযোগিতামূলক আইনের যথাযথ প্রয়োগ, পণ্যমূল্য
সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলনে
পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন ও বাস্তবায়ন, পণ্যমূল্যের সিন্ডিকেট,
বাণিজ্যে অনৈতিকতা রোধ ও সব সেবা-সার্ভিসে অব্যবস্থাপনা রোধে ভোক্তা অধিকার
সংরক্ষণ আইন-০৯ পরিবর্তন-পরিমার্জন করা, নিত্য ভোগ্যপণ্যের আপদকালীন
বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে টিসিবিকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা; শহর-নগরে
বসবাসকারী নাগরিকদের জীবনমান রক্ষায় বিদ্যমান ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ
আইন-১৯৯১’ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে জনস্বার্থে তা কার্যকর করা,
সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিয়ে নগরে বসবাসরত
নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা, সীমিত
আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণ, খাদ্যে ভেজাল, ফরমালিন ও
বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশ্রণরোধে নিরাপদ খাদ্য আইন-১৩ বাস্তবায়ন জোরদার করা,
সিন্ডিকেট-ভিত্তিক বর্তমান গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সংস্কার করা, রেলপথকে
আধুনিকায়ন করে রেলসেবাকে আরও সম্প্রসারণ করা, সরকারি নাগরিক সেবা
প্রদানকারী সংস্থার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষে ভোক্তাদের সত্যিকারের
অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভোক্তা প্রতিনিধি নির্বাচনে ক্যাব প্রতিনিধিত্ব
নিশ্চিত, বাজার তদারকিকে স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অত্যাবশ্যকীয়
কাজের আওতায় আনার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি, সরকারিভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর
পৃষ্ঠোপোষকতার পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোকেও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া,
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণ কেলেংকারী রোধ, এ খাতে গ্রাহকদের অধিকার সংরক্ষণ,
ভোগান্তি নিরসনে ব্যাংক, আর্থিক খাতে সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা,
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গ্রাহকদের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব
নিশ্চিত করা, সরকারি-বেসকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য,
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, নিয়ন্ত্রণহীন টেলিকম ও আইটি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়
ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে
নিয়ন্ত্রণহীন ভেজালের ছড়াছড়ি, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকে অধিক মূল্য আদায়ের
নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবাপ্রাপ্তিতে
ভোগান্তি নিরসন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা,
কৃষি খাতে সত্যিকারের কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকি পৌঁছানো নিশ্চিত ও প্রণোদনা
বাড়ানো নিশ্চিত করা, কৃষকের পণ্যের বিক্রয়মূল্য ও খোলা বাজারে খুচরা
বিক্রয়মূল্যের একটি সীমা নির্ধারণ, খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধিকারীদের
শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য
প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করবেন। কারণ মন্ত্রিসভায় বা সরকারের
বিভিন্ন অঙ্গে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা সরাসরি ভোক্তা না হলেও এ
সমস্যাগুলো থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ সাধারণ জনগণ কেউ
রেহাই পাচ্ছে না। সে কারণে দেশের মানুষ প্রতিনিয়তই এ ধরনের সমস্যায় জর্জরিত
এবং জীবন ও জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাগরিকদের নিত্যদিনের
সমস্যা, জীবন ও জীবিকার অধিকার সুরক্ষায় নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা,
বাজারে অসাধু চক্রের প্রভাব বন্ধে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা,
সিন্ডিকেট, মজুতদারি বন্ধ করা, সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও
জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জনসস্পৃক্ত ও সেবাপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের
প্রশাসনিক ও আর্থিক জবাবদিহিকে নাগরিক তদারকি ও পরিবীক্ষণের আওতায় আনতে
হবে। নাগরিক অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক
স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভোক্তা অধিকার ও নাগরিক সংগঠনগুলোকে সরকারি-বেসরকারি
পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সরকারি নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কমিটি ও সেবাদানকারী
প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দান এবং এসব
নাগরিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।
গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, হোল্ডিং ট্যাক্স,
গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে নাগরিক ভোগান্তি
নিরসনে গ্রাহক, সেবাদানকারী সংস্থা ও ভোক্তা প্রতিনিধি, প্রশাসনের সমন্বয়ে
ত্রিপক্ষীয় গণশুনানির মাধ্যমে নাগরিক পরিবীক্ষণ, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা
নিশ্চিত করে সুশাসন জোরদার করার পাশাপাশি এসব খাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
নিশ্চিতে সংস্কার জোরদার করতে হবে।
লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
