বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৪ ফাল্গুন ১৪৩২
জনশৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের কঠোরতার সীমানা
আমীন আল রশীদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:১৫ এএম আপডেট: ২৬.০২.২০২৬ ১:৫২ এএম |

 জনশৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের কঠোরতার সীমানা

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর পুরোপুরি ভেঙে পড়ে পুলিশ বাহিনী। আগে থেকেই পুলিশের ব্যাপারে মানুষের নেতিবাচক ধারণা এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর অনেক সদস্যের নৃশংসতার কারণে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ ‘ভিলেন’ হয়ে ওঠে। অন্তর্র্বতী সরকারের পুরো দেড় বছর পুলিশ বাহিনী আর সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। পুলিশের পোশাকের রং পরিবর্তনসহ সরকারের তরফে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অন্তর্র্বতী সরকারের প্রথম বছর পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা বেশ স্পষ্ট ছিল। শেষদিকে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে চাঙা ভাব লক্ষ্য করা যায় এবং দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুলিশের মারমুখী আচরণও দেখা যায়।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর কিছু ঘটনায় মনে হচ্ছে পুলিশ আগের মতোই মারমুখী আচরণ শুরু করেছে। বিগত অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরের চরম বিশৃঙ্খলা, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া ‘মব জাস্টিস’ এবং দাবি আদায়ের নামে ছাত্র-তরুণদের রাজপথ দখল—সব মিলিয়ে সামাজিক ভারসাম্য ও রাজনৈতিক বিভাজন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকার শুরু থেকেই কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের বক্তব্যে স্পষ্ট। মিলন এমনও বলেছেন যে, কিশোর-তরুণরা সন্ধ্যার পরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করলে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে এবং সেখানে সংবিধান লঙ্ঘন হলেও তারা সেটি পরে দেখবেন।
সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষ বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। এই বিধান প্রত্যেক নাগরিককে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার দেয়। কিন্তু জনস্বার্থ এবং আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত উপায়ে রাষ্ট্র এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু ওই নিয়ন্ত্রণের তরিকা কী হবে; জনশৃঙ্খলা ফেরানোর নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা রুঢ় হবে; ছোটোখাটো অজুহাতে যে কোনো নাগরিকের গায়ে হাত তোলা বা লাঠি দিয়ে পেটানোর অধিকার তাদের আছে কি না—ওই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় চলছে। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক এবং চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযানে মারধর ও আটকের ঘটনা ঘিরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অভিযানের সময় পুলিশের শক্তি প্রয়োগ তাদের আইনি এখতিয়ারের বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সময় দুজন সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মারধর করা হয়েছে। এমনকি কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করতেও দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে। অবশ্য পরে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো ধরনের অবৈধ কিছু না পেয়েও পুলিশ তাদেরকে মারধর করেছে। যদিও পুলিশ বলছে, অভিযান চালানোর সময় কাজে বাধা দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়াও রাজধানীর ধানমন্ডি লেক এবং শিক্ষামন্ত্রীর এলাকা চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে আটক করে পুলিশ। তাদেরকে মারধর করা, কানে ধরিয়ে উঠবস করানো বা মুচলেকা নিয়ে ছাড়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। যদিও এসব ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদকসেবী কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এমন নানা অভিযোগ আনা হয়েছে পুলিশের তরফ থেকে।
প্রশ্ন হলো, পুলিশ কি রাজনৈতিক সরকার আসার কারণে নিজেদের হারানো শক্তি ফিরে পেয়েছে বলে মনে করছে নাকি অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরে পুলিশ যেভাবে মনোবল হারিয়ে হতাশ ও শক্তিহীন হয়েছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা নতুন করে আশার আলো দেখছে? জুলাই আন্দোলনে তাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যও নিহত হয়েছেন। থানা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশের মনে এসব নিয়ে ক্ষোভ আছে। ফলে পুলিশের আচরণে কি এখন ওই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে? যদিও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কারও প্রতি পক্ষপাত কিংবা কারও ওপর বিরাগভাজনের সুযোগ নেই।
এখানে যে প্রশ্নটি অনেকের মনেই আছে সেটি হলো, দেড় বছর ধরে তরুণ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ যেভাবে দাবি আদায়, আন্দোলন, রাজনীতি আর টাকা কামানোর জন্য পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে, তাদেরকে আবারও পড়ার টেবিলে বা শ্রেণিকক্ষে ফেরানোর উপায় কী? আন্দোলনের নামে যে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের মুখের ভাষা বদলে গেছে; অশ্লীলতা আর গালাগালকে যারা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে—ওই প্রজন্মকে সুস্থ স্বাভাবিক পথে আনার দায়িত্ব কার? নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের। জনশৃঙ্খলা ফেরাতে রাষ্ট্রকে অনেক সময় কঠোর হতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই কঠোরতা যে সীমা ছাড়িয়ে না যায়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরতে গেলে বা সেখানে বসে গল্প করলেই সে মাদকসেবী; সন্ধ্যার পরে রাস্তায় বের হলেই সে বখাটে বা ছিনতাইকারী—এমন সরল ধারণা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। এরকম অভিযানে অনেক সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং থানায় ধরে নিয়ে টাকা-পয়সার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে অনেক সময় পুলিশ সমাজের বিশিষ্টজন বা টাকাওয়ালা লোকদের সন্তানদের টার্গেট করে ধরে নিয়ে যায় যাতে তাদের ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পুলিশ মোটা অঙ্কের ঘুষ নিতে পারে। পুলিশের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বেশ পুরোনো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশেও পুলিশ একই আচরণ করবে কি না? পুলিশের পোশাকের রং বদলে গেছে। কিন্তু তাদের আচরণে কতটুকু পরিবর্তন হলো, ওই প্রশ্ন জনমনে আছে। যদিও এখন পুলিশ তাদের পুরোনো পোশাকেই ফিরে যেতে চায় বলে জানিয়েছে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
প্রশিক্ষিত বাহিনী হিসেবে পুলিশকে যেমন আইন ও বিধানের মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়, তেমনি পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া; পুলিশকে গালাগাল করা বা তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণও গ্রহণযোগ্য নয়। এরকম পরিস্থিতিতে পুলিশ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটিও একটু বেশি চাওয়া হযে যায়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে পুলিশ যেভাবে মানুষের বন্ধু তথা মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা হয়ে ওঠার কথা ছিল, তা হয়নি। বরং পুলিশের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক হয়েছে অনেকটা ‘চোর-পুলিশের মতো’। অর্থাৎ পুলিশ গণহারে সবাইকে অপরাধী ভাবে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও তাদেরকে বন্ধু নয়, নিপীড়ক বলে মনে করে। এরকম একটি ধারণা জনপরিসরে তৈরি হয়েছে। এখান থেকে বের হতে গেলে পুলিশকে মনোবলহীন ও শক্তিহীন করে রাখাও যেমন সমাধান নয়, তেমনি পুলিশ আগের মতোই আচরণ করতে থাকবে, তাদের মধ্যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না—সেটিও কাম্য নয়।
পরিশেষে, পুলিশের সমস্যা এত বেশি যে, একদিনে, এক মাসে বা এক বছরেও হয়তো এগুলো ঠিক করা যাবে না। কিন্তু পরিবর্তনের শুরুটা করতে হবে। পুলিশ নিজেও যে পরিবর্তন চায়, তা তাদেরকেই প্রমাণ করতে হবে। জনশৃঙ্খলা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বই যেমন প্রধান, তেমনি ওই বাহিনীকেও জানতে হবে তার সীমানা কত দূর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে গিয়ে নাগরিকের মানবাধিকার যেন লঙ্ঘন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৫ জানুয়ারি পুলিশ সংস্কার কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেখানে ১১৩টি সুপারিশ রয়েছে। নতুন সরকারকে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। কমিশনের এই প্রতিবেদন যাতে ফাইলবন্দি হয়ে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
উদ্বোধনের ২০ বছর পর চালু হলো নাঙ্গলকোটের গোহারুয়া ২০ শয্যা সরকারি হাসপাতাল
বুড়িচংয়ে কৃষিজমির মাটি কাটায় রাতভর অভিযান; ৩ ট্রাক জব্দ , জরিমানা আদায়
থানা-পুলিশ ‘ম্যানেজ’ করেই গোমতী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা হচ্ছে : এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষ্যে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা প্রশাসনের তদারকি অভিযান॥ ৩১ হাজার টাকা জরিমানা
রমজানে ব্রাহ্মণপাড়ায় খেজুর ও ফলের বাজারে চড়া দাম
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হতে আগ্রহী কুমিল্লার ৪ নেত্রী
কুমিল্লা থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় আহত চট্টগ্রামের এমপি নুরুল আমিন
সেই ভবনের গ্যাস লাইন ছিল অবৈধ
লালমাইয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর মহব্বত
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২