বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৪ ফাল্গুন ১৪৩২
জলবায়ু পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকতা
অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:১৫ এএম আপডেট: ২৬.০২.২০২৬ ১:৫২ এএম |

জলবায়ু পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকতা
এই প্রথম টানা তিনবছর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশে^র গড় তাপমাত্রা প্রাক শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর উপর অবস্থান করছে। তাপমাত্রার নিরাপদ সীমার শেষ বলে আমরা যা মনে করতাম পৃথিবী তা অতিক্রম করছে বারবার। এ উষ্ণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব। ২০২৪ সালে কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও মিথেন তিনটিই সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড এখন প্রাক শিল্পায়ন যুগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। ফলে উষ্ণতা আর ব্যতিক্রম নয় Ñএটাই হয়ে উঠেছে ‘নতুন স্বাভাবিক’ রূপ। ২০১৫ থেকে ২০২৫ এ দশক পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম অধ্যায়।
বাড়তি তাপের প্রায় ৯০ শতাংশ শুষে নিচ্ছে মহাসাগর। ২০২৫ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও তাপধারণ ক্ষমতা পৌঁছেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কিন্তু এ তাপ শোষণ কোন সুরক্ষার বিষয় নয় Ñবরং এটি ঝড়, হারিকেন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে আরও ভয়াবহ লক্ষণগুলো তুলে ধরছে। একই সঙ্গে গলছে বরফ ও গ্লেসিয়ার। ২০২৫ সালে আর্কটিক সাগরে বার্ষিক বরফ জমার পরিমাণ ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্নে। গ্রিনল্যান্ড হারিয়েছে ১২৯ বিলিয়ন টন বরফ। আটলান্টিক সাগরের বরফ স্তর নেমে এসেছে তার ইতিহাসের তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরে অস্বস্তিকর দৃশ্য Ñআর্কটিক অঞ্চলের নদীগুলোর পানির রং হয়ে কমলা বর্ণের। পারমাফ্রষ্ট বা চিরহিমায়িত ভূমি গলে যাওয়ায় নদীতে মিশছে আয়রন ও বিষাক্ত ধাতুর সঙ্গে, যা বাস্তসংস্থানের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
বিশ^জুড়ে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯৩ থেকে ২০০২ সালে যেখানে বছরে গড়ে ২.১ মিলিমিটার করে বাড়ত, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে বছরে ৪.১ মিলিমিটারে। গ্রিনল্যান্ডের বয়ফস্তর নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে। আগে ধারণা করা হত ৩ ডিগ্রী উষ্ণতা বাড়লে এটি অস্থিতিশীল হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মাত্র ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতা বাড়লেই এ বিশাল বরফ স্তরের ধস নামার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে Ñযার প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাকৃতিক ‘লা নিনা’ পরিস্থিতির কারণে ২০২৫ সাল হয়ত ২০২৪ সালের তুলনায় সামান্য শীতল মনে হতে পারে। কিন্তু এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কোন সুযোগ নাই। সার্বিক উষ্ণায়নের এ প্রবণতা যে ‘মানুষের তৈরি নিঃসরণেরই ফলাফল’ Ñএতে দ্বিমত নাই।
তাপপ্রবাহ এখন সবচেয়ে নীরব কিন্তু প্রাণঘাতি জলবায়ু বিপর্যয় চলমান। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে তাপপ্রবাহ তিনগুণ বেশি নিয়মিত হয়ে উঠেছে, অথবা তাপের তুলনায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপ অনুভূত হচ্ছে। উত্তপ্ত মহাসাগর শক্তি জুগিয়েছে বিধ্বংসী ঝড়কে। মেক্সিকো উপসাগরের রেকর্ড তাপমাত্রা ২০২৫ সালে ‘হেলেন’ ও ‘মিল্টন’ এর মত হ্যরিকেনকে করেছে আরও ভয়ংকর। একই সময়ে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাত ও বন্যায় লাখো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করেছে। ইউরোপ দাবানল ও দীর্ঘায়িত হয়েছে। ২০২৫ সালে দাবানলের কারণে সেখানে বায়ুমন্ডলে কার্বন নিঃসরণের সর্বোচ্চ রেকর্ড তৈরি হয়েছে, যা পৃথিবী উষ্ণায়নের চক্রকে আরও বেশি ত্বরন্বিত করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি দাবানলেই পুড়ে খাক হয়ে যায় ২৩,৪৪৮ একর জমি এবং ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় ৬,৮৩৭ টি বাড়ী ও স্থাপনা। পাশাপাশি ‘হিউজ ফায়ার’ ১০,৪২৫ একর এলাকাকে গ্রাস করে নেয়। এসব দাবানলের ফলে ২ লাখ বাসিন্দাকে জরুরী ভিত্তিতে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়। ২০২৫ এ প্রায় ৬০ টি টর্নেডোর তান্ডবে ২৯ জনের মৃত্যু ঘটে। তবে বছরের আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ১৯ থেকে ২২ শে জুনের মধ্যে। উত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় টর্নেডোর প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ‘ডেরেচো’ (এক ধরনের তীব্র ঝড়) আঘাত হানে, যার আঘাতে অন্তত সাতজন প্রান হারান।
বালি আর তপ্ত রোদের দেশ সৌদি আরব। সেখানে বৃষ্টির দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রকৃতি দেখিয়ে দিল এক ভিন্নরূপ। আরব মরুভূমির বুকে যেন নেমে এলো মহাপ্লাবন। জেদ্দা থেকে শুরু করে মক্কা-মদিনা-সৌদি আরবের বিশাল অংশজুড়ে বয়ে গেল অভূতপূর্ব বৃষ্টি আর বিধ্বংসী বন্যা। নতুন বছরের শুরুতেই আগ্নেয়গিরির উত্তাপ গ্রাস করেছে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলকে। জানুয়ারীর তপ্ত রোদে পুড়ে খাক হচ্ছে মাইলের পর মাইল। ২০২৬ এর গত ২৩ থেকে ২৭ জানুয়ারীর মধ্যে এ তাপপ্রবাহ এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাছে, যা বাসিন্দাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১৯-২০ সালের ‘ব্লাক সামার’Ñএর স্মৃতি। দক্ষিণ অষ্ট্রেলিয়ার এডিলেডে তাপমাত্রা ৪৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করার পাশাপাশি কিছু কিছু শহরে তা ৪৮.৯ ডিগ্রি পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের মেট অফিসও ২০২৫ সালকে তৃতীয় উষ্ণতম বছর হিসাবে চিহ্নিত করেছে। জলবায়ু বিজ্ঞানী কলিন মরিস এক বিবৃতিতে চিহ্নিত করেছে। জলবায়ু বিজ্ঞানী কলিন মরিস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বায়ুমন্ডলে মানুষের কর্মকান্ডের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়াই বৈশি^ক গড় তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ার প্রধান কারণ।’ ২০১৫ সালে প্যারিস সম্মেলন প্রায় ২০০ টি দেশ বৈশি^ক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তাকে চরম অনিশ্চিয়তার মুখে ফেলেছে। বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিহহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের শুরুতে প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের প্রাথমিক পদক্ষেপ। চীন বিশে^র শীর্ষ দোষণকারী দেশ প্রথমবারের মত নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন। ২০২৫ সালে পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, একটি বর্তমান বাস্তবতা।
গ্রাম বাংলার খেজুরের রস, শীতের পিঠাপুলি, ভোরের শিশির সবই যেন সময়ের অভাবে অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। শহরে শীতের অনুভূতি তো প্রায় বিলাসে পরিণত হয়েছে। তবে উল্টো চিত্রটা দেখা যাচ্ছে গ্রীষ্মকালে। তাপমাত্রা শুধু বাড়ছে না, বাড়ছে গরমের স্বায়িত্বও। মার্চ থেকে শুরু হয়ে অক্টোবরে গিয়েও গরম যেন বিদায় নিতে চায় না। শরৎ ও হেমন্ত আলাদা করে চেনার সুযোগই পাচ্ছে না মানুষ। বর্ষাও আর আগের মত ছন্দে আসে না। কখনো অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি ডেকে আনে বন্যা, কখনো দীর্ঘ বিরতিতে মাঠ ফেটে যায় খরায়। কৃষক বুঝে উঠতে পারে না কখন বীজ বুনবেন আর কখন ফসল কাটবেন। গ্রীষ্মের দাবদাহ, বর্ষার জলছবি, শরতের নীল আকাশ, হেমন্তের সোনালি মাঠ, শীতের কুয়াশা আর বসন্তের রং সব মিলিয়ে বছরটা ছিল প্রকৃতির বর্ষপঞ্জী। কিন্তু এখন সেই বর্ষপঞ্জীর পাতাগুলো যেন ছিড়ে যাচ্ছে একে একে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশ আজ আটকে পড়েছে দুটি বা বড় জোড় তিনটি ঋতুর ঘূর্ণিতে Ñএকদিকে দীর্ঘ ক্লান্তিকর গরম, অন্যদিকে অনিয়মিত বর্ষা আর তার ফাঁকে ক্ষীণ, অচেনা এক শীত।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোন বৈজ্ঞানিক শব্দ নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। নদীভাঙ্গন, ঘূর্ণিঝড়, লবনাক্ততা আর অনিশ্চিত আবহাওয়া মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, প্রকৃতি যেন প্রতিদিন নতুন করে সতর্কতা দিচ্ছে। অথচ এ সংকটের দায় সবচেয়ে কম যাদের, তারাই ভুগছে বেশি। বাংলাদেশের ঋতুচক্রের এ বদল শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়, একটি সংস্কৃতি, স্মৃতি আর জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাওয়ার গল্প ও কঠিন বাস্তবতা। এ বাস্তবতাকে আমরা এখনই গুরুত্ব দেব, নাকি আরও ভয়াবহ অবস্থার অপেক্ষায় থাকব?
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
উদ্বোধনের ২০ বছর পর চালু হলো নাঙ্গলকোটের গোহারুয়া ২০ শয্যা সরকারি হাসপাতাল
বুড়িচংয়ে কৃষিজমির মাটি কাটায় রাতভর অভিযান; ৩ ট্রাক জব্দ , জরিমানা আদায়
থানা-পুলিশ ‘ম্যানেজ’ করেই গোমতী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা হচ্ছে : এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষ্যে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা প্রশাসনের তদারকি অভিযান॥ ৩১ হাজার টাকা জরিমানা
রমজানে ব্রাহ্মণপাড়ায় খেজুর ও ফলের বাজারে চড়া দাম
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হতে আগ্রহী কুমিল্লার ৪ নেত্রী
কুমিল্লা থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় আহত চট্টগ্রামের এমপি নুরুল আমিন
সেই ভবনের গ্যাস লাইন ছিল অবৈধ
লালমাইয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর মহব্বত
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২