
বিগত
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৪,
২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে। প্রতিটি নির্বাচনই বিভিন্ন কারণে প্রশ্নবিদ্ধ
ছিল। ২০১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পদ্ধতি বাতিল হওয়ার কারণে
দ্বিতীয় বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪টিতে কোনো
প্রতিযোগী ছিল না; ১২৭টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে স্বয়ংক্রীয়ভাবে জয়ী
ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির
পাতানো খেলা। ব্যালট বাক্সে রাতে সরকারি দলের অনুচররা প্রশাসনের সহায়তায়
ভোটপত্র পূরণ করে আওয়ামী লীগকে অসদুপায়ে জয়ী করতে সফল হয়েছিল। ২০২৪ সালের
নির্বাচনেও বিএনপি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে।
গত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত
তিনটি নির্বাচনে যে চিত্রগুলো ফুটে উঠেছিল, তা ছিল গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত
মর্মান্তিক এবং সামাজিক জীবনে সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে
অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ফিরে এসেছে। কারণ তার ভোট
আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীরা কারচুপি করে দিয়ে ফেলেছে। অনেককে আবার
জোরপূর্বক ভোটকেন্দ্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা যেতে বাধা দেয়। ভোটের
দিনগুলোতে অনেক কেন্দ্রে মানুষ এক শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্কের মধ্যে কাটিয়েছিল।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় ছিল, ২০১৮ সালে বিশ্বস্ত সূত্রে ধারণা করা হয়েছিল
যে, সরকার-মদদপুষ্ট প্রশাসন সচিবালয়ে বসে আগের রাতে ভোটের সব ফলাফল
দুর্বৃত্তায়নের খেলা অত্যন্ত নগ্নভাবে শেষ করে ফেলেছিল। ফলে পরদিন পোলিং
স্টেশনে ভোটদাতার গমন ছিল প্রহসন মাত্র।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রথম
ধাপ হলো একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা নিশ্চিত
করা। কথায় বলে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে ইচ্ছা তাকে দেব’।
বিখ্যাত গ্রিক
দার্শনিক প্লেটো তার রিপাবলিক পুস্তকে বলেছিলেন যে, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
থেকে বিরত থাকার সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো নাগরিকরা তাদের চেয়ে নিম্নমানের
মানুষ দ্বারা শাসিত হওয়ার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে দেন।’ প্লেটোর শিষ্য
অ্যারিস্টোটল আরও একধাপ যোজন করে বলতেন যে, ‘মানুষ একটি রাজনৈতিক জীব’। এ
কারণেই বোধ হয়, উভয়েই প্রত্যক্ষ ভোট প্রদানের মাধ্যমে ভালো প্রার্থীকে
নির্বাচন করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের প্রতি প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হওয়ার
জন্য রাজনৈতিক দর্শনে বিস্তারিত আলোকপাত করেছিলেন। রিপাবলিকে প্লেটোর একটি
অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠ মন্তব্য রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য কঠিনভাবে প্রযোজ্য,
‘যদি ভালো, সম্মানিত এবং মেধাবী লোক দ্বারা সরকার পরিচালিত না হয়। তাহলে
নাগরিকদের শাস্তি হলো দুষ্টু, দুর্নীতিপরায়ণ এবং নির্বুদ্ধিসম্পন্ন
ব্যক্তিদের দ্বারা শাসিত হওয়া।’ তাই নির্বাচনে উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে
নিজেদের ভবিষ্যৎকে কল্যাণকর করাই হলো নাগরিকের সামাজিক দায়িত্ব।
আড়াই
হাজার বছর আগে প্লেটোর দেওয়া মর্মবাণী যে কত সত্য প্রমাণিত হয়েছে, তার
উদাহরণ আমরা দেখেছি গত আওয়ামী লীগ সরকারের সাজানো জাতীয় নির্বাচনের
মধ্যদিয়ে। প্রত্যেকটি নির্বাচনের পরে যারা মন্ত্রী কিংবা সাংসদ হয়েছিলেন
তারা জ্ঞান, মেধা এবং দায়িত্ব পালনে ছিলেন নিম্নমানের জনপ্রতিনিধি।
জনসাধারণকে সেবাদানের পরিবর্তে রাষ্ট্র থেকে সেবা গ্রহণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এ
শাসকশ্রেণি শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্টের রূপ ধারণ করেছিল। এর কার্যক্রম
জনসাধারণের জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি বয়ে এনেছিল। ফলে যা হয়েছে, আওয়ামী লীগের
মতো এক ঐতিহ্যবাহী দলের করুন পতন ঘটেছে।
অতএব, সুষ্ঠু নির্বাচন জাতীয়
জীবনে যে কত গুরুত্ব বহন করে বাংলাদেশ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভোট
কারচুপি করে ক্ষমতায় আসা যায়। কিন্তু সেই ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। ক্ষমতায় একটি
দল তখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে যখন তার নেতৃত্বে মেধাসম্পন্ন ভালো মানুষের সমাহার
ঘটবে। এবং এ নেতৃত্ব প্রতিটি জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে সুষ্ঠুভাবে
নির্ভয়ে প্রতিযোগিতার প্রত্যয় দেখাতে পারবে। তা না হলে যেকোনো রাজনৈতিক দল,
যত বড়ই সে হোক না কেন, তার করুন পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। এর অসংখ্য উদাহরণ
ইতিহাসে রয়েছে। সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদের পতন ঘটে ১৯৮৯ সালে। ১৯৯০
সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে এলে, ধারণা করা হয়েছিল দেশে একটি
সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশের সৃষ্টি হবে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ বেসামরিক
সরকারের আমলে রাজনৈতিক মুক্তি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্তর্ভূক্তিমূলক
সার্বিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।
এ কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
আমাদের জীবনে মানুষের আকাঙ্ক্ষার নবজাগরণের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার
উন্মোচন করেছে। বহু বছর পর রাজনৈতিক দলগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছে যে,
জনসাধারণ ভালো এবং সৎ মানুষকে ভোট দিয়ে সংসদে দেখতে চায়। অন্তর্বর্তী
সরকারের অধীনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে একটি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ
নির্বাচন উপহার দেওয়া অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়। ডক্টর ইউনূসের অধীনে
প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রমাণ করেছে যে,
সাধারণ মানুষের ভোটের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রাখাই হলো সরকারের সবচেয়ে বড়
নৈতিক দায়িত্ব। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঘটে থাকলেও
সার্বিকভাবে তা ভোটের নিরপেক্ষতাকে সমুন্নত রেখেছে। মানুষ যখন তার ভোট
নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে দিতে পারে তখন সে সত্যিকার অর্থে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে
ক্ষমতাপ্রাপ্ত মনে করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তার আত্মবিশ্বাস গড়ে
ওঠে। এ আত্মবিশ্বাসের জায়গাটিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তার সবচেয়ে বড়
অবদান আমাদের জাতীয় জীবনে উপহার দিয়ে গেল বলে ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত
রাখাটাই হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘবদ্ধ অস্বীকার। এ অঙ্কীকারের ব্যত্যয় হলে
তা হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
বেসরকারিভাবে
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, বিপুল ভোটে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয়
আসনে নির্বাচিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ
আমলের মতো পতানো নির্বাচন না হওয়ার কারণে সংসদে প্রতিপক্ষ একটা বলিষ্ঠ
ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়। কারণ, জামায়াতে ইসলামের আসন সংখ্যাও
প্রতিযোগিতামূলক প্রতিপক্ষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। জাতি আশা
করে, আগামী সংসদে অনেক গঠনমূলক রাজনৈতিক বির্তক হবে, যা দেশের ভবিষ্যতে
তরুণ রাজনীতিবিদদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উৎসাহিত করবে।
অবশ্য
এ বাস্তবতা অনুস্বীকার্য যে, বিএনপির জন্য সংসদে দুটি বিরাট চ্যালেঞ্জ
রয়েছে। এবার, গণভোটে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়েছে। এর
অর্থ হলো, জনসাধারণ দেখতে চাইবে, যে সংস্কারের পক্ষে তারা ভোট দিয়েছে,
বিএনপি তার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না। এর জন্য প্রয়োজন
বিএনপিকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে উদার মনোভাব নিয়ে কাজ
করা। দ্বিতীয়ত, সংসদে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা এবং
গুণগত মান নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামের জন্য সংসদে এতগুলো
আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার এই প্রথমবার সুযোগ ঘটেছে। এর উপযুক্ত ফলপ্রসূ প্রয়োগে
দলটিকে চিন্তা করতে হবে, কেবলমাত্র ধর্মীয় অনুশাসনে বাংলাদেশের জনসাধারণের
আবেগকে ধরে রাখাটা রাজনৈতিকভাবে টেকসই হবে কি না।
পরিশেষে, ত্রয়োদশ
নির্বাচনের সার্থকতা নির্ভর করবে প্লেটোর বিখ্যাত উক্তির মধ্যদিয়ে, ‘একটা
ভালো সিদ্ধান্ত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে
নয়।’ জনসাধারণ তাদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এটাই আশা করে যে, ভবিষ্যৎ
নেতৃত্ব জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসবে। এর দায়বদ্ধতা জয়ী এবং বিজিত উভয়
রাজনৈতিক দলের রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সফলতা সুন্দর ভবিষ্যৎ
স্বপ্ন বাস্তবায়নের শুরু মাত্র। সামনের পথ দুর্গম কিন্তু অসম্ভব নয়।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট
অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত
