
আমরা
বরাবরই দেখে এসেছি, নির্বাচন যখনই দেরিতে হয়েছে, দেশে তত বেশি সমস্যা তৈরি
হয়েছে। গণতন্ত্রের বিকাশে নির্বাচন আরও আগে হলে আরও ভালো হতো। এমনিতই বেশ
দেরি করার ফলে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে
বড় যে ক্ষতির সম্মুখীন মানুষ হয়েছে, সেটা হলো ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে গেলে
থেমে গেছে। এ সময় বড় আকারে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। কারণ, যেকোনো ব্যবসায়ী দেশি
হোক বা বিদেশি, সবাই চায় স্থিতিশীল পরিবেশ। সেই স্থিতিশীলতার একটা উপায় হলো
নির্বাচনের মাধ্যমে যদি গণতান্ত্রিক সরকার আসে তখন অনুকূল পরিবেশ আশা করা
যায়। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচিত সরকাররের চেষ্টা থাকবে, যেসব সমস্যা এসেছে
সেগুলো সমাধান করার। বর্তমানে যে বড় সমস্যাটা আমরা দেখছি এবং যেটা নিয়ে
নির্বাচনকে নিয়ে আতঙ্ক আছে সেটা হলো, দেড় বছরে সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা
বেড়েছে। সেটা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব থেকে শুরু করে অন্যান্য যেসব
জরিপ আছে, আমরা যারা বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি ম্যাপিং করি, সেখানে দেখা
গেছে যে, সেগুলো আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেকাংশে বেড়েছে। এখন এ সহিংসতা কীভাবে
থামানো যায়, এটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে আধুনিক সরকারের জন্য। সেই হিসেবে এ
চ্যালেঞ্জটা আরও পরিষ্কার হবে। নির্বাচনের মধ্যে যদি ঝামেলা তৈরি হয় তাহলে
অন্য ধরনের সমস্যা হবে। আমাদের আশা থাকবে যে, অন্তর্র্বতী সরকার
নির্বাচনের ব্যাপারে সচেতন থাকবে।
গণভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে ঝাপসা একটা
অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। সরকার এ জটিলতা তৈরি না করলেই পারত। কারণ গণভোটকে
যেভাবে উত্থাপন করা হচ্ছে, আমি নিজে একজন ছাত্র হিসেবে বলছি, আমি যদি না
বুঝতে পারি তাহলে স্বাভাবিকভাবে জনগণ কীভাবে বুঝবে, আমার জানা নেই। জোর করে
কিছু চাপিয়ে দেওয়া মানুষের মধ্যে একটা সন্দেহ তৈরি করে।
মনে রাখতে হবে
যে, গণতন্ত্র জোর করে চাপিয়ে দিয়ে কিছু হয় না। অত সহজেই যদি গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে আমেরিকা বা যারা বহুদিন ধরে গণতন্ত্র চর্চা করছে,
সেখানেও বড় ঘাটতি আছে আমরা জানি, সেটা থাকত না। ক্ষমতায় যে সরকারই আসুক না
কেন, নির্বাচিত সরকারের জন্য জটিলতা বাড়বে। এ জটিলতা হওয়ার কারণ আমি মনে
করছি, যারা এ ধরনের সংস্কার চাচ্ছে তারা নিজেরা কখনো রাজনীতি করেননি। তারা
রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। এটা একটা বড় ঘাটতি নিঃসন্দেহে। আমরা অনেক সময় দেখি
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোক বসানো বা সরানোর ক্ষেত্রে মব সন্ত্রাসের মতো
প্রবণতা তৈরি হয়, তাহলে সেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এখন এ অবস্থায়
প্রধান উপদেষ্টার ওপর বর্তায়। তার বিচার-বিবেচনা, দক্ষতা, সক্ষমতা,
নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা সবকিছুর ওপর এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি
কতটা তা কার্যকরভাবে করতে পারবেন, সেটিই এখন মূল বিষয়।
রাজনৈতিক তিনটি
দল যে তিন ধরনের অভিযোগ করছে, আমরা বাইরে থেকে দেখছি। তবে এ তিন দলের
মধ্যেই দলীয় প্রভাব বাড়ানোর একটা প্রবণতা আছে। কোথাও জোরজবরদস্তি হচ্ছে,
কোথাও কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে, কোথাও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ প্রবণতা
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য একটা বড় হুমকি। আমরা অতীতে দেখেছি,
তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেছে।
কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এখনকার অন্তর্র্বতী সরকার
শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও দলীয় প্রভাবের মধ্যে আছে। ফলে সমাজে এক ধরনের
অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান একটা
সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে সত্যি। বাংলাদেশে দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা একটি গভীর
দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে এ গণ-অভ্যুত্থান। একালে
বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে, স্বৈরাচার ও
বৈষম্যমুক্ত সমাজের জন্য শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে,
সরকার পরিচালনার বিষয়টা রাজনৈতিক দলের ওপরে চাপিয়ে দিয়ে হয় না। তারা যদি
সেটাকে ঠিকমতো গ্রহণ না করে বা যতক্ষণ তারা গ্রহণ করতে না পারবে, আমরা যতই
চেষ্টা করি না কেন, অথবা এ বিষয়ে আমরা অনেক লেখালেখি করতে পারি, কিন্তু
জনগণ কীভাবে অংশগ্রহণ করছে অথবা কীভাবে গ্রহণ করছে, সেটা আরেকটা বিষয়। ভোট
ব্যাংক চিন্তা করে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা বা এমন একটা পরিকল্পনা করা উচিত
ছিল, যেন এই সমস্যাটা না হয়। কিন্তু সেই জায়গায় খুব একটা বড় আকারে কোনো
পরিবর্তন বা কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ফলে মনে হচ্ছে যে, নির্বাচন নিয়ে
মানুষের আতঙ্কটা নির্বাচনের আগেও আছে, নির্বাচনের সময়ও থাকবে, আবার
নির্বাচনের পরেও থাকবে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ খুবই দরকার।
কারণ এই বিনিয়োগ যদি বড় আকারে না বাড়ে, তাহলে কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বড়
ধরনের ঝামেলায় পড়বে এবং যত বেশি কর্মসংস্থানের জায়গায় সমস্যা হবে তত
অস্থিরতা বাড়বে। অর্থনীতিতে বড় আকারে স্থিতিশীলতা দরকার। আবার অনেক দেশ আছে
তারা হয়তো স্থিতিশীলতাটুকু চায় না। তারা চায় বাংলাদেশ যত বেশি অস্থিতিশীল
থাকবে তত তাদের লাভ হবে। কারণ, তখন তারা তাদের যে এজেন্ডা বা তাদের যে
স্বার্থ সেগুলো খুব সহজে রাখতে পারে। কারণ তারা ভালো করেই বুঝতে পারে যে
সরকার আছে সেতো দুর্বল। আমি যা বলব তারা তাই শুনবে। সেই জায়গায় আমাদের
চিন্তাভাবনা এবং মানসিকতার পরিবর্তন করা দরকার।
যারা এ গণতন্ত্র
গণতন্ত্রায়ন চর্চার কথা বলে তাদেরও চিন্তাভাবনা করা দরকার যে, আমরা একটা
বিশ্বের মধ্যে আছি। যে বিশ্বে বিরাট একটা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি আছে।
অনেক দেশ আছে তারা স্থিতিশীলতা চায় না এবং যত বেশি অস্থিতিশীল পরিবেশ
সৃষ্টি হয়, তাহলে অনেক দিক থেকে লাভ হয়। আমার মনে হয়, জনগণের সচেতনতা হলো
সবচেয়ে বড় কথা। আমাদের ভরসা রাখতেই হবে যে, জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে। সেই
হিসাবে আমাদের এখন অপেক্ষা করা দরকার। নির্বাচনের পর অস্পষ্ট অনেক কিছুই
আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে প্রত্যাশা করা যায়। আমাদের অপেক্ষা করে
দেখতে হবে,আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেমন হচ্ছে!
লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
