
অভিনন্দন, অভিনন্দন,
অভিনন্দন... বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও তার নির্বাচনি জোটকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে তারা। এখন ধরেই
নেওয়া যায় বিএনপিই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বস্তির বিষয় হলো,
’৭১ অর্থাৎ মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদার
প্রশ্নে দেশের মানুষ সঠিক রায় দিয়েছেন। এখন ধরেই নেওয়া যায় মহান
মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আপাতত কোনও অপশক্তি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার সুযোগ পাবে
না।
প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, এবার উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার
ক্ষেত্রে সাহস এবং শক্তি দুটোই পাবে। এ জন্য বিএনপি ও তাদের নির্বাচনি
জোটকে আবারও অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। পাশাপাশি দেশের মানুষের প্রতি ও
রইলো অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায়
তারা ভুল করেননি। বরং ৭১ ও ২৪-এর আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে
তারা সঠিক রায় দিয়েছেন। আবারও দেশের মানুষের প্রতি রইলো অফুরান শ্রদ্ধা ও
ভালোবাসা।
আনন্দের খবর, ঐতিহাসিক বিজয়ের পর বিএনপি আপাতত বিজয় মিছিল
করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার পবিত্র জুমার দিন
দেশব্যাপী মোনাজাত ও শোকরানা আদায়ের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এ
জন্য বিএনপিকে ধন্যবাদ জানতেই হয়। এত বড় বিজয়ের পর বিজয় মিছিল হতেই পারে।
কিন্তু বিজয় মিছিল করার আগে দরকার বিজয়কে সুসংহত করা। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে
বিএনপি ও তার নির্বাচনি জোট এবারের নির্বাচনে দেশের মানুষের গভীর আস্থা ও
বিশ্বাস অর্জন করেছে বাস্তবে তা রক্ষা করা সময়ের দাবি। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমের দোর্দণ্ড প্রতাপের এই যুগে বিশ্বাস ভঙ্গের কোনও সুযোগ নেই।
কথা দিয়ে কথা না রাখলে ব্যাপক বিশাল সমর্থনও বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যায় না।
কাজেই বিজয় মিছিলের চেয়ে বিজয় টিকিয়ে রাখার বাস্তব পরিকল্পনা এখন বেশি
জরুরি। আরও জরুরি।
এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত
রাজনৈতিক চরিত্র বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিশ্চয়ই তার বিচক্ষণ
দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে দেশ পরিচালনায় এগিয়ে যাবেন। তাকে ভাবতে হবে বাবা
জিয়াউর রহমান ছিলেন এই দেশের সফল রাষ্ট্রপতি। মা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন
তিন তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী। দেশ পরিচালনায় বাবা-মায়ের সাফল্য তারেক
রহমানের অনুপ্রেরণার উৎস বটেই। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তারেক রহমানকে হতে
হবে আরও বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জননেতা। শুধুমাত্র দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি
নয়, বিরোধী দলের গ্রহণযোগ্য মতামতের প্রতিও তাকে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। এ কথা
সত্য চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য ও অন্যায়ভাবে আধিপত্য বজায় রাখার ব্যাপারে
বিএনপির কিছু দুর্নাম আছে। এত বড় বিজয়ের পর বিএনপির নেতা, সমর্থক, কর্মীরা
যেন এসব অন্যায়-অপকর্মে আরও বেশি করে জড়িয়ে যাবার বৈধ লাইসেন্স না পেয়ে যায়
সেটা নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সময়ের দাবি।
প্রসঙ্গক্রমে শুধু দুটি দিনের কথা
তুলে ধরতে চাই। এক. ১৭ বছর পর দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। হযরত শাহজালাল
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই দেশের মাটি খুঁজে নিয়ে পরম মমতায় চুমু
দিলেন। জনতার ভিড়ের কারণে মাত্র ১০ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে তার সময়
লেগেছিল ৪ ঘণ্টারও বেশি। সেদিন জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা
দিয়েছিলেন ‘আই হ্যাভ এ প্লান’। তার এই একটি কথাই দেশের মানুষকে বেশি
আশাবাদী করে তুলেছেন।
দুই. প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার
নামাজে জানাজার দিনে গোটা ঢাকা শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ একটা
বার্তা দিয়েছিল- দেশটা যেন ভালো থাকে... ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
দেশের মানুষ বিএনপিকে সমর্থন জানিয়ে আবারও সেই বার্তা দিলো- আমরা যেন
দেশটাকে ভালো রাখি। দেশ মানে তো মা। মা ভালো থাকলে পরিবার ভালো থাকবে।
আনন্দের
মধ্যেও কিছু শঙ্কার কথা বলি। নিরঙ্কুশ জয় পেলে নিজেকেই শ্রেষ্ঠ ভাবার
প্রবণতা দেখা দেয় অনেকের মধ্যে। বিএনপির মধ্যে সে প্রবণতা যেন দেখা না দেয়।
দেশের প্রধানমন্ত্রী যেন দেশের সবার প্রধানমন্ত্রী হন। অতীতে দলীয় প্রভাব
বলয়কে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা সাধারণ মানুষকেও খেপিয়ে তুলেছিল।
আমরা বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নিশ্চয়ই শুধুমাত্র দলীয়
প্রভাব বলয়কে গুরুত্ব দিবেন না। বিরোধী পক্ষের মতামতকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব
দিবেন। সংসদ নির্বাচনে সপরিবারে ভোট দিতে এসে তারেক রহমান প্রচার মাধ্যমকে
বলেছেন, যদি তিনি দেশের নেতৃত্ব দেবার সুযোগ পান তাহলে তাঁর প্রথম কাজ হবে
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বাস্তবে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। কাজেই জবাবদিহিমূলক একটি
শান্তিময় দেশের স্বপ্ন আমরা দেখতে পারি। যেখানে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান
হবে। দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতি হবে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে
থাকবে। সিন্ডিকেট বাণিজ্যের বিলোপ ঘটবে। মেধার যথার্থ মূল্যায়ন হবে। সমাজে ও
কার্যক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমতা বজায় থাকবে। অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতি
চিরতরে বন্ধ হবে।
এবারের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল দেশের উন্নয়ন
অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ব্যাপক আশা-ভরসার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আশা আছে বলেই
মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। এই বেঁচে থাকার স্বপ্ন যেন এবার বাস্তবে
মর্যাদাবান হয়ে ওঠে এই শুভকামনা করি। একটি সুন্দর সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন
জাতিকে উপহার দেবার জন্য অন্তর্র্বতী সরকার ও জাতীয় নির্বাচন কমিশন
কর্তৃপক্ষ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। শুভকামনা সবার জন্য।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার; সম্পাদক, আনন্দ আলো
