
অপেক্ষা ও
অনিশ্চয়তার জাল ছিন্ন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত
হলো। গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন প্রত্যাশিত থাকলেও নানা হিসেব নিকেশ শেষে
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করেছে
নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল আপাতত
ঘোষণা করা হয়নি। কমিশন জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এই
দুই আসনের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে। প্রার্থী মৃত্যুবরণ করার
কারণে শেরপুরের আসনের ফলাফল আগেই স্থগিত করা হয়।
ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে
যে, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১২ আসন। বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য পেয়েছে ৭৭ আসন, ইসলামী
আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, স্বতন্ত্ররা পেয়েছে ৭টি আসন। একক দল হিসেবে বিবেচনা
করলে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন, জাতীয় নাগরিক
পার্টি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, বাংলাদেশ জাতীয়
পার্টি-বিজেপি ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি আসন পেয়েছে।
ফলে কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে
যাচ্ছে বিএনপি। এবারের নির্বাচনে অন্যতম বিষয় ছিল গণভোট। গণভোট পড়েছে ৬০
দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি।
আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। ফলে হ্যাঁ বিজয়ী তবে না
ভোটের পক্ষে কম ভোট পড়েছে তা বলা যাবে না। যারা ভোট দেয়নি তাদের মনোভাব
জানা গেল না কিন্তু তাদের সংখ্যা নগণ্য নয়।
তবে একটা বিষয় খুবই
গুরুত্বপূর্ণ যে, অভ্যুত্থান পরবর্তী সংশয়ের অবসান ঘটেছে নির্বাচন অনুষ্ঠিত
হওয়ায়। নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না, নির্বাচন করবে না, শর্ত পূরণ না হলে
নির্বাচন হবে না, প্রশাসনের নানা বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত, সংঘাতের আশঙ্কা আর
নির্বাচন নিয়ে প্রায় ২০০০ প্রার্থীর মাসব্যাপী প্রচারণা, প্রতিশ্রুতির
বন্যা আর উত্তেজনার শেষে নির্বাচন এবং তার ফলাফল দেখে দেশের মানুষ একটা
স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ২০০৬ থেকে ২০০২৬। প্রায় ১৯ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায়
ফিরল। মাঝখানের সময়টা ছিল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির জন্য টিকে থাকার
লড়াই। আক্রমণ ছিল পুলিশ, প্রশাসন এবং প্রচারণার। নির্বাচনের পর যাকে
সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী ভাবা হচ্ছে তাকেও থাকতে হয়েছে দেশের বাইরে প্রায় ১৭
বছর। তার দলের সদস্যরা যারা মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে আদালতের বারান্দায়
ঘুরেছেন এবং কারাগারে থেকেছেন তারা তুলনামূলকভাবে ভাগ্যবান। কারণ হত্যা এবং
গুমের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেভাবে বেআইনি কাজে
ব্যবহার করা হয়েছে তাতে বেঁচে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়েছিল তাদের জন্য। ক্ষমতার
দাপট দেখানো আর প্রতিহিংসা এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এই সংস্কৃতি যেন
দেশের রাজনীতিতে আর কখনো ফিরে না আসে এটাই জনগণের এখন প্রধান চাওয়া।
ভোটের
ফল একটা নতুন প্রশ্ন উদ্রেক করেছে। যেমন হ্যাঁ ভোট বিজয়ী হলো কিন্তু এটা
প্রতিপালন করার বাধ্যবাধকতা কি নির্বাচিত সরকারের থাকবে? তারা বলতেই পারেন,
ঐকমত্য কমিশনে সব বিষয়ে তারা তো একমত হননি। তাদের নোট অব ডিসেন্ট বা
আপত্তি ছিল। তারা আপত্তি জানিয়েই স্বাক্ষর করেছেন। আবার যেহেতু সংসদে দুই
তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেছেন ফলে সংবিধান সংশোধনে তাদের কারও সহায়তা
প্রয়োজন হবে না। আইনগতভাবে তারা তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্মতি
পেয়েছেন জনগণের কাছ থেকে। ফলে সংসদে বিতর্ক করা গেলেও বাধ্য করা যাবে না
বিএনপিকে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপিকে যা বহন করতে হবে তা হলো, অতীতের
ছায়া আর রেখে যাওয়া বোঝার ভার। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সমস্যা সমাধান করেনি
বরং সমস্যার ঝাঁপি খুলে দিয়ে গেছেন। অভ্যুত্থানের পর সমাজের নানা অংশের
মানুষ তাদের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। এগুলোর যৌক্তিক কোনো সমাধান
করেননি তারা বরং জটিলতা বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। মব তৈরির যে সংস্কৃতি চালু করতে
তারা সহায়তা করেছেন তা তাদের যেমন বিব্রত করেছে তেমনি ভবিষ্যৎ সরকারকেও
বিরক্ত করবে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত করার মানসিকতা যেমন থাকবে
তেমনি বাড়বে দমন পীড়নের হার। যার ফলে রাস্তার অস্থিরতা কমবে না এবং অনেকেই
এর সুযোগ নেবেন আর সরকার বলতে থাকবেন সেই পুরোনো ষড়যন্ত্রের কথা।
আর
একটি বিষয় খুবই উদ্বেগজনক। অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির ফাঁদ আর পূরণের দায়
চাপিয়ে গেলেন সেখান থেকে নির্বাচিত সরকার রেহাই পাবেন কীভাবে? বন্দরের
টার্মিনাল পরিচালনা এবং নতুন টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি, তড়িঘড়ি করে
বিদায়ের আগে বাণিজ্য চুক্তি যা করা হলো আমেরিকা এবং জাপানের সঙ্গে তার
কিছুই তো জনগণকে জানানো হয় নাই। বিভিন্ন সূত্রে যা জানা গেছে তাতে নানা
শর্তের জালে আটকে পড়বে আমাদের দেশ। কৃষি পণ্য আমদানি, তুলা আমদানি,
জ্বালানি আমদানি, বিমান আমদানির ব্যয় কি শুধু সেলাই করা বস্ত্র রপ্তানির
মাধ্যমে শোধ করা যাবে? আর সামরিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি ও বিক্রির বাজার তৈরির
দায় কার ওপর বর্তাবে?
দীর্ঘদিন ধরে যে মানুষরা আন্দোলন করেছে, শ্রমিকরা
মজুরি, শ্রম আইন, কর্ম সংস্থানের দাবি করেছে এসব মানুষের প্রত্যাশা পূরণের
চাপ সহ্য করতে হবে সরকারকে। অভ্যুত্থানের পর নারী, সংখ্যালঘু এবং
আদিবাসীরা যে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছে, নারীদের পোশাক, কাজ এবং
স্বাধীন চলাফেরার ওপর যে আক্রমণ নেমে এসেছিল, ভবিষ্যতেও সেই আতঙ্ক তাড়া
করবে কি না। এই আতঙ্ক থেকে মানুষের স্বস্তি দিতে হবে সরকারকে।
সংসদে
যারা প্রকাশ্য বিরোধী দল এবং সমাজে যে শক্তিটা লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়ে আছে
তাদের বিরোধিতা মোকাবিলা করা একটা জটিল সংকট হয়ে উঠতে পারে। প্রধান বিরোধী
যে দলটা তাদের মুখের কথা এবং বাস্তব কার্যকলাপ নিয়ে নানা সন্দেহ আগে থেকেই
ছিল, এখন তারা চাপ দিয়ে তাদের ইচ্ছা পূরণ করতে বাধ্য করতে চাইবে। গোপন চাপ
এবং সুবিধা আদায়ের প্রবণতা বাড়বে। সরকার চালাতে এসব বিষয় মেনে নিতে বাধ্য
হলে তার প্রভাব পড়বে দলে এবং সমাজে যার পুরোটাই বহন করতে হবে ক্ষমতাসীন
দলকে।
অভ্যুত্থানের পর দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট যেমন মোকাবিলা করতে হয়েছে
তেমনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কিছু সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী ভারত
এবং মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চাইতে জটিল হয়েছে। বাংলাদেশের মতো
আমদানি নির্ভর এবং সীমিত সংখ্যক পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল দেশের জন্য
বন্ধুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের যে অবনতি
হয়েছে তা কাটানোর কূটনৈতিক দক্ষতা দরকার হবে।
সবচেয়ে বড় কথা বারবার
হোঁচট খাওয়া গণতন্ত্র আর আন্দোলনের দেশে গণতন্ত্র চর্চা আর নির্বাচনের
অব্যাহত ধারা বজায় রাখা সত্যিকার অর্থেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মৌলবাদী
উন্মাদনা আর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যে চর্চা চালু হয়েছে, ধর্মীয় আবেগ
ব্যবহার করে কাউকে ট্যাগ লাগিয়ে আক্রমণ ও হত্যা করার ফলে যে সবচেয়ে
ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, আক্রান্ত হয় নারী ও ধর্মীয়
সংখ্যালঘুরা সেই কথা এই দেশের মানুষকে বোঝানোর চাইতে সংকীর্ণ স্বার্থে এর
সুযোগ নেওয়ার শক্তির অভাব নেই। গণতন্ত্র ও আধুনিকতার স্বার্থে এসব মোকাবিলা
করতেই হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ট্র্যাজিডি হলো
ভোটাধিকারের মতো একটি মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়।
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো স্বীকৃত পথ অনুসরণ না করার ফলে যিনি
বা যারা ক্ষমতায় যান, তারা আইনকানুনের দোহাই দিয়ে এমন সব জটিলতা এবং
ফন্দিফিকির করেন যে শেষ পর্যন্ত তাদের নামাতে রক্ত দিতে হয় আর তারা জেলে বা
পালাতে বাধ্য হন। এর অবসান হোক এটাই জনগণের চাওয়া। জনগণ আন্দোলন করেছে,
নির্বাচনে ভোট দিয়েছে এখন তাদের প্রত্যাশা পূরণের অপেক্ষার পালা শুরু হলো।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
