নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনে বিজয়ীদের মধ্যে ৬ জনই প্রথমবারের মত সংসদে যাচ্ছেন। এর মধ্যে জীবনের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন ৫ জন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের কৌশলী অবস্থান আর নানান জটিল সমিকরণ পাড় হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন তারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে ৮টিতে বিএনপি, ১টিতে জামায়াত, একটিতে এনসিপি ও একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এরমধ্যে জীবনের প্রথম ভোটের লড়াইয়েই জিতে গিয়ে সংসদে যাচ্ছেন কুমিল্লা-২ আসনে সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৪ আসনে হাসনাত আবদুল্লাহ, কুমিল্লা-৫ আসনে জসিম উদ্দিন, কুমিল্লা-৭ আসনে আতিকুল আলম শাওন এবং কুমিল্লা-৯ আসনে আবুল কালাম। কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া এবারই প্রথম বিজয়ী হলেও এর আগেও জাতিয় নির্বাচনে লড়েছেন।
কুমিল্লা-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলটির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মোঃ সেলিম ভূঁইয়া। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস এম এ মতিন। তালা প্রতীকের এম এ মতিনকে ১৪ হাজার ৮৮৩ ভোটে হারিয়ে সেলিম ভুঁইয়া যাচ্ছেন সংসদে। তার প্রাপ্ত ভোট ৭৬ হাজার ২৬৮। মতিন পেয়েছেন ৬১ হাজার ৩৮৫ ভোট।
কুমিল্লা-৪ আসনে ১ লাখ ১০ হাজার ২৩ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে অন্যতম তরুন সদস্য হয়ে সংসদে যাচ্ছেন জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আবদুল্লাহ। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরীক হয়ে এনসিপির এই প্রার্থী লড়েছেন শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে। আইনী জটিলতায় ধানের শীষের প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির প্রার্থীতা বাতিল হলে শেষ মুহুর্তে বিএনপি এই আসনে গণ অধিকারের জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দেয়। হাসনাতের প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৬০ হাজার ৮১। জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৪৫ ভোট।
কুমিল্লা-৫ আসনে বিএনপি'র প্রার্থী হয়ে প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে লড়েন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব জসিম উদ্দিন। তৃনমূলের জনপ্রিয় এই নেতার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আবির্ভুত হন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ড. মোবারক হোসাইন। তবে দাড়িপাল্লার প্রতীকের এই প্রার্থিকে হারিয়ে জয়ের মালা পড়েছেন ধানের শীষের জসিম। ৯ হাজার ৯৩৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে সংসদের যাওয়া নিশ্চিত করেছেন তিনি। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী ড. মোবারক হোসেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৪৭ ভোট।
কুমিল্লা-৭ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওন লড়েছেন কলস প্রতীক নিয়ে। বিএনপির বিদ্রোহী এই প্রার্থী নির্বাচনে লড়তে গিয়ে দল থেকে বহিষ্কারও হয়েছিলেন। প্রথমবার নির্বাচনে লড়েই সংসদ সদস্য হচ্ছেন তিনি। তবে এজন্য এলডিপির মহাসচিবের পদ ছেড়ে নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে বিএনপিতে আসা হেভিওয়েট প্রার্থী ড. রেদোয়ান আহমেদকে ৪২ হাজার ৮৯৪ ভোটের ব্যবধানে হারাতে হয়েছে তাকে। শাওনের প্রাপ্ত ভোট ৯০ হাজার ৮১৯। রেদোয়ান আহমেদ পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৯২৫ ভোট।
কুমিল্লা-৯ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম। প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ১০৮ ভোট। ৫৪ হাজার ৬৫৪ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন জামায়াত প্রার্থী লাকসাম উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান ড. সরওয়ার উদ্দিন সিদ্দিকীকে।
কুমিল্লা-১০ আসন থেকে বিজয়ী হওয়া মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। এখানে প্রথমে আবদুল গফুর ভুইয়া বিএনপির মনোনয়ন পেলেও আইনি জটিলতায় মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ায় ধানের শীষে প্রতীক নিয়েই লড়েছেন মোবাশ্বের। ৪৫ হাজার ৬৯৭ ভোটের ব্যবধানে দাড়িপাল্লাকে হারিয়েছেন তিনি। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৪৭ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ১৫০ ভোট।
শেষ পর্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই আর নানা সমীকরণ পেরিয়ে নতুন ৬ মুখকে সংসদে পাঠাল কুমিল্লার ভোটাররা। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই বাজিমাত করা এই নেতাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের দেয়া প্রতিশ্রুতি আর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর হয় সেটিই এখন দেখার অপেক্ষায় আছে কুমিল্লার মানুষ।
