
১২ ফেব্রুয়ারি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফেব্রুয়ারির এ দিনটি কেবল একটি ভোটের তারিখ
নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি বড় পরীক্ষা ও সম্ভাবনার মোড়।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশ নানা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছে-
স্বৈরশাসনের চাপ, গণ-আন্দোলনের জাগরণ, ভাঙন ও পুনর্গঠনের অধ্যায়, আর
গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। এ নির্বাচনে প্রতিটি ভোটার শুধু
নিজের পছন্দ জানাবেন না; তিনি দেশের পরবর্তী কয়েক বছরের নীতি, শাসনের ধরন
এবং নাগরিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে- তারও একটি অংশ ঠিক করবেন। তাই
ভোটাধিকার শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়, এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি
গুরুতর নাগরিক দায়িত্ব।
ভোটের গুরুত্বকে শুধু আইনি কাঠামোর মধ্যে আটকে
রাখলে বাস্তব চিত্র ধরা পড়ে না। একটি নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য ও
বিশ্বাসযোগ্য হয়, তা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে, মানুষের আস্থা বাড়ায় এবং
প্রশাসনকে জনগণের কাছে জবাবদিহির জায়গায় দাঁড় করায়। উল্টোভাবে, ভোটারদের
অনাগ্রহ, অসচেতনতা কিংবা বিভ্রান্তি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করতে
পারে। কারণ ভোট শুধু কাগজে-কলমে একটি ‘অধিকার প্রয়োগ’ নয়; ভোট হলো জনগণের
ক্ষমতা প্রয়োগের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি। এ ক্ষমতা যত তথ্যভিত্তিক ও
দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত হবে, ততই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বুঝবেন- জনগণের
কাছে জবাব না দিয়ে টিকে থাকা সহজ নয়।
সচেতন ভোটার হতে হলে আগে জানতে হয়-
কাকে ভোট দিচ্ছি এবং কেন দিচ্ছি। প্রার্থীর বক্তব্য বা প্রচারণা যত
আকর্ষণীয়ই হোক, মূল প্রশ্ন হলো তিনি কী করতে পারবেন, কীভাবে করবেন এবং তার
আগে কী করেছেন- তাদের অতীত ইতিহাসই বা কী। শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে সিদ্ধান্ত
নিলে পরে হতাশা বাড়ে, কারণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও ইচ্ছা- দুটি
আলাদা বিষয়। তাই প্রার্থীর অতীত কাজ, জনসম্পৃক্ততা, এলাকার সমস্যা নিয়ে
তার অবস্থান, দুর্নীতি-অনিয়ম সম্পর্কে তার রেকর্ড এবং সংসদে বা জনপরিসরে
তার ভূমিকা- এসব দেখা জরুরি। একই সঙ্গে দলীয় অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ
একজন প্রতিনিধি অনেক সময় দলের নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেন না। ভোটার
যখন তথ্যভিত্তিকভাবে বিচার করেন, তখন রাজনীতিতে জবাবদিহির চাপও বাড়ে।
গণতন্ত্রে
আবেগ থাকবে, মতভেদ থাকবে- কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি গুজবভিত্তিক হয়, তবে ভোটার
নিজের ক্ষমতাকেই দুর্বল করেন। কারণ গুজবের ওপর দাঁড়ানো সিদ্ধান্ত পরে
দেশকেই মূল্য দিতে বাধ্য করে।
একটি ভোট কেন্দ্রে কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত
অনেক বছরের প্রভাব তৈরি করতে পারে- এ কথা শুধু বক্তৃতার কথা নয়, বাস্তব
সত্য। দেশের মৌলিক বিষয়, যেমন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, নারীর নিরাপত্তা,
আদিবাসীসহ সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রশ্ন, দুর্নীতি ও বৈষম্যদূরীকরণ,
ইত্যাদি বিষয়ে তাদের অবস্থান কী। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়বে কি
না, বাজার তদারকিতে কেমন কঠোরতা থাকবে, সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা ও মেধার
মূল্যায়ন হবে কি না, নারীর নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে কী উদ্যোগ থাকবে- এসব
প্রশ্নের উত্তর একদিনে লেখা হয় না, কিন্তু তার দিকনির্দেশ নির্ধারিত হয়
নির্বাচন থেকে। একইভাবে পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি বাংলাদেশে দিন দিন বড়
হচ্ছে। নদী দখল, বায়ুদূষণ, নগরের জলাবদ্ধতা, উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা-
এসব মোকাবিলায় যে নীতি দরকার, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে
ভোটের ফলাফল রাজনৈতিক মানচিত্রের চেয়ে বেশি কিছু; এটি সমাজ ও অর্থনীতির
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সূচনা।
ভোটের দিনকে সামনে রেখে অনেকের মনে হতাশা বা
অনিশ্চয়তাও কাজ করতে পারে। কেউ ভাবেন, ‘আমার এক ভোটে কী হবে?’ কিন্তু
গণতন্ত্রের বাস্তবতা হলো- একটি ভোট একা নয়; লাখ লাখ মানুষের সিদ্ধান্ত
মিলেই ফল তৈরি হয়। আর সেই ফলই দেশের পথে দিকনির্দেশ দেয়।
সবশেষে বলা
যায়, ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল ভোটের দিন নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব পালনের দিন।
সচেতন ভোট মানে তথ্য দেখে, যুক্তি দিয়ে, ভবিষ্যৎ ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
সচেতন ভোট মানে গুজব নয়, যাচাই; ব্যক্তিগত আবেগ নয়, জনকল্যাণ; মুহূর্তের
উত্তেজনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। গণতন্ত্র কোনো এক দিনের উৎসব নয়;
এটি প্রতিদিনের শৃঙ্খলা, আস্থা এবং জবাবদিহির নাম। সেই গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত
রাখতে সবচেয়ে কার্যকর ও শান্তিপূর্ণ হাতিয়ার হলো ভোটারদের বিচক্ষণ
সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের সামনে যে পথ- উন্নয়ন, ন্যায়, মানবিকতা ও
স্থিতিশীলতার- সেই পথকে শক্ত করতে সচেতন ভোটই হতে পারে সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
