
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শেষ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন উপলক্ষে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। যার যার অবস্থান থেকে নির্বাচনি ইশতেহার জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। এখন ইশতেহারগুলো বিবেচনায় নিয়ে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কাকে ভোট দিলে দেশ ভালো থাকবে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহারে জানিয়েছেন, তারা অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান, যেখানে ব্যক্তি বা দলের চেয়ে রাষ্ট্র বড় হবে। অতীতের ভুল ও ভালো কাজ উভয় থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি একটি জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বুনিয়াদ গড়তে চায়। তারা ক্ষমতায় গেলে আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে দেশজুড়ে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিটি সেক্টর এবং প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিএনপির সব পরিকল্পনা, বিশেষ করে দেশের সব তরুণ-তরুণী, বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এবার প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। তারেক রহমান আরও জানান, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে, দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জেন জি ও তরুণদের প্রত্যাশা এবং নারীসমাজের জন্য নিরাপদ ও সম্মানের একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য দাঁড়িপাল্লা ও ১১-দলীয় জোট প্রার্থীদের মার্কায় ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য পাঁচটি বিষয়ে হ্যাঁ এবং পাঁচটি বিষয়ে না বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা হ্যাঁ বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজিকে স্পষ্ট না করতে বলেছি। তিনি আরও জানান, আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষা, বিচার ও অর্থনীতি- তিনটি জায়গায় আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ন্যায়বিচার সমাজে প্রতিষ্ঠা হলেই কেবল আমরা আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে পারব। অন্যথায় দুঃশাসন এবং দুর্নীতির কণ্ঠ রোধ করা মোটেই সম্ভব হবে না।
নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দেওয়া ইশতেহারকে অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটি বলেছে, বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুত ১ কোটি কর্মসংস্থান, ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কৃষক কার্ডের আওতায় প্রতিশ্রুত ভর্তুকির পরিমাণ স্পষ্ট নয়। ধনীদের করের জালে আবদ্ধ করতে বিএনপির পরিকল্পনা বিত্তশালীদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। অপরদিকে জামায়াতের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। করের আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি, সরকারি নিয়োগ, বিনিয়োগ ক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে মেধাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রয়াত্ত খাতে লোকসান কমিয়ে আনা গেলে ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, দলগুলোর ইশতেহারে অনেক ভালো ও আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তার স্পষ্ট পথনকশা নেই।
গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এ জন্য নতুন সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশারও কমতি নেই। এ ছাড়া রাজনীতিতে নতুন যুক্ত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষা। এসব মাথায় নিয়েই আগামীর সরকারকে নতুন বাংলাদেশ গড়তে বেশ কৌশলী ভূমিকা নিতে হবে। এ ছাড়া দেশের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার উচ্চাভিলাষী না হয়ে জনসম্পৃক্ত হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। একটি সুষ্ঠু, উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারা ফিরে আসুক, এটাই প্রত্যাশা।
