মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২১ মাঘ ১৪৩২
মরণের পরে: মরণের পাড়ে
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৪ এএম আপডেট: ০৩.০২.২০২৬ ১:২৬ এএম |

 মরণের পরে: মরণের পাড়ে
শ্রদ্ধেয় জয়গোবিন্দ নাথ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি: রাত ৭-৩০মিনিটে পরলোক গমন করেছেন। তাঁর আত্মার সদগতি কামনা করি। তাঁকে ‘নাথবাবু’ হিসেবেই সম্বোধন করতাম। বিএসসি পাশ করেছেন পঞ্চাশের দশকে। লক্ষ্মীপুর (নোয়াখালী) ছিল জন্মভিটা। বর্তমানে বসন্তস্মৃতি পাঠাগারের এলাকায় বাড়ি করে বাস করছিলেন। ৪/৫ বছর আগে স্ত্রী-হারা হন। কর্মজীবন বর্ণাঢ্য। জেলা পরিষদ কর্তৃক টেকনিক্যাল স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর কুমিল্লা মডার্ণ স্কুলে অংক বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন বেশ কয়েক বছর।
অপর পরিচয় হলো- জয়গোবিন্দবাবু কুমিল্লা রামকৃষ্ণ আশ্রম কমিটির দীর্ঘদিন সদস্য ছিলেন, তিনি আশ্রমের দীক্ষিত শিষ্য। এ সূত্রে আমার সঙ্গে সক্ষতা। শিক্ষক হিসেবে সমগোত্রীয় হলেও আশ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় আমরা উভয়ে ছিলাম সমমনা ও সতীর্থ। ৯৩ বছরে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘায়ু পেয়েছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা যথাক্রমে শিক্ষক ও ডাক্তার। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সুস্থ ছিলেন, চলাফেরা করতে পারতেন, হেঁটে চলতেন।
কষ্টের বিষয় হলো- তাঁর মৃত্যু হলো রাত ৭-৩০ মি. নাথ অর্থাৎ যোগীসম্প্রদায়ের নিয়মানুযায়ী কেন ১০-৩০মি, মধ্যে সমাধিস্থ করা হলো, আমাদেরকে খবর জেনে তাঁকে শেষবারের মতো কেন দেখতে সুযোগ দেয়া হলো না, আশ্রমেও নেয়া হলো না। হয়ত পারিবারিকভাবে তাড়াহুড়ো ছিল, কিন্তু বাস্তবতার ক্ষেত্রে বেমানান হলো। কষ্ট পেলাম। তাই মনে প্রশ্ন রয়েই গলো। ১৫ বছর আগে নিজের মৃত্যু-পর্ব নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম তা আবার প্রকাশ করতে মন চাইল। শিরোনাম ‘মরণের পরে: মরণের পাড়ে’।
আমি যখন মারা যাবো, তখন কী কী হতে পারে, আমার মৃত্যুকে কীভাবে উদযাপন করা হবে- জানতে বড়ো ইচ্ছে করে। ধরে নিই, আমি আজ ২রা জানুয়ারি ২০১০, শনিবার দিবাগত রাত তিনটায় নীরবে মরে গেলাম। মৃত্যুকালে অন্য কক্ষে স্ত্রী ও নীচের কোনো কক্ষে ভ্রাতুষ্পুত্র ঘুমিয়ে ছিল। যেহেতু এখন ঘুম থেকে সকাল ৮টায় উঠি, কেউ খবর নিলো না। ৮-৩০ মি: স্ত্রী এসে ডেকে গেলো- ‘কী গো, উঠবে না?’ এ পর্যন্ত। ৯টায় এসে ডাকাডাকি এবং মশারি তুলে গায়ে হাত দিয়েই চীৎকার। কী হলো কী হলো- প্রথম ভাড়াটিয়ে, পরে পাড়ার একে একে জেনে গেলো, আমি মরে গেছি।
আস্তে আস্তে জানাজানি হতে চলল- অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক মারা গেছেন। কখন? রাত্রে। রাতে কখন? অনুমান সব। লোকজন আসতে শুরু করল। উৎসাহের কমতি নেই। বিদেশে মেয়েকে জানাও, ভাইদের জানাও- নানা সব পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত হয়- আগে মাইকিং হোক। মাইকিং এ কী প্রচার হবে?
আশ্রমের পক্ষের একজন লিখলেন- ‘একটি শোক সংবাদ, একটি শোক সংবাদ-কুমিল্লা রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রাক্তন সেক্রেটারি ও বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক........... ২রা জানুয়ারি ২০১১ শনিবার দিবাগত রাতে পরলোক গমন করেছেন।’
কলেজের পক্ষের একজন লিখলেন-
‘একটি শোক সংবাদ...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ............’
কুমিল্লার কাগজ সম্পাদক লিখলেন-
‘আমরা গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও দৈনিক কুমিল্লার কাগজের প্রধান কলামিস্ট............’
একজন সংস্কৃতিকর্মী লিখলেন-
‘আমরা অতীব ভারাক্রান্ত মনে জানাচ্ছি যে কুমিল্লার অতিপরিচিত সাহিত্যিক, বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, 'অরণিকা পত্রিকার সম্পাদক, জনপ্রিয় কলামিষ্ট, সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বহুগ্রন্থে’র প্রণেতা অধ্যাপক........’
মাইক আনা হলো। কোন ঘোষণাকে এখন প্রচার হবে এ নিয়ে আলোচনায় বসা হলো, দু ঘন্টা অতিবাহিত হলো, সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত পৌঁছা যাচ্ছে না। এর মধ্যে অনেকে এসে গেছেন, অনেকে চলে গেছেন, কেউ জানতে চাইছেন কখন শ্মশানে নেওয়া হবে, কাজ না থাকলে উপস্থিত থাকা যাবে। কেউ বলল কোথায় কোথায় নেওয়া যাওয়া দরকার- কলেজে, পত্রিকার অফিসে, কিছুক্ষণের জন্য আশ্রমে নানা প্রস্তাবনায় মুখর থাকল দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তারপরও অনেক পরিকল্পনা।
আমি তো মরে আছি, তাই কিছুই বলতে পারছিলাম না। বলাও উচিত নয়। কারণ, মতামত দিবার অধিকার হারিয়ে ফেলছি। ভাবলাম- এ ব্যাপারে আগেই সিদ্ধান্তটা যদি লিখে রাখতাম তবে অনেক সুবিধে হতো। যদি লিখতাম-
ক.আমি যখন জন্ম গ্রহণ করি, তখন পরিবারের গণ্ডির লোকজন ছাড়া যেমন কেউ জানে নাই, মৃত্যুর খবরটা না জানালে ক্ষতি কী। আমাকে না দেখলে আস্তে আস্তে জেনে যাবে আমি নেই। মাইকিং এর সংস্কৃতিটা এখন ততটা আকর্ষণ করে না। বিষয়টি আমার কাছে হাস্যস্পদ বলেই মনে হয়।
খ.কেউ হয়ত আমার মৃত্যুর পর লিখতে চাইবে। সময় অভাবে হয়ত লেখা হয়ে উঠবে না। কুমিল্লার কাগজের এক ধরনের দায় আছে, সেজন্য রক্ষিত ছবি দিয়ে মৃত্যু সংবাদটি ছাপতে পারে হয়ত। তখনই জানাজানির ক্ষেত্রটি প্রচারিত হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু আমাকে নিয়ে কোনো লেখা- ভাবতে কেন জানি স্বাচ্ছদ্য বোধ করি না।
কারণ লিখলেই অনেক মিথ্যা বানানো কল্পকাহিনী সৃষ্টি হয়ে যাবে। আমার আসল অকৃত্রিম পরিচয়টি ঢেকে যাবে, যা আমি কখনো কামনা করি না, কারণ মিথ্যাকে ভয় পাই, মিথ্যাকে ঘৃণা করি, মিথ্যাকে সহ্য করতে পারি না।
আমি হিসেব করে দেখেছি-
* আমাকে ভালোও বলা যাবে না, মন্দও হয়ত নয়।
* রুচিবানও বলা যাবে না, রুচি যে নেই তাও নয়।
* বৃদ্ধ বলা যাবে না, যুবক তো নই-ই, প্রৌঢ় বললে দুঃখ পাবো।
*আশ্রমের সাথে জড়িত বলে কেউ বলবে ধর্মপ্রাণ, কেউ বলবে সাম্প্রদায়িক-আসলে সর্বপ্রকার বিশ্বাসেই আমার ঘাটতি অনেক।
* কেউ বলতে চাইবেন- পণ্ডিত বা গবেষক বা অন্যকিছু। এরূপ অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা পরস্পরের সম্পর্ককে নিম্নগামী করবে।
*এভাবেই চলবে নানা ব্যাখ্যা।
কিন্তু সত্য হলো- ছিলাম, এখন নেই। তারপর খুঁজতে যাওয়াই নিজেকে অস্বীকার করা। অবশ্যই আমরা কেউ বোকা হতে চাই না।
তারপর ভাবছি- পরিবার কী করবে। তারা ২/১ দিন কান্নাকাটি করবে, কোথায় কী কাগজ আছে, টাকা পয়সা আছে কী না ইত্যাদি সব বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে আর মুখে বলবে লোকটা অসময়ে কোন কিছু ঠিক না করেই চলে গেলো। একদিনের জন্যও সুখ পেলো না। মনে মনে বলবে একদিনের জন্যও সুখও দিল না। আগে থেকে বিষয়আশয়গুলো জানিয়ে রাখলে ক্ষতি কী ছিল। তারপরও লোকলজ্জায় পারলৌকিক কাজের ব্যবস্থা করতে চাইবে, কিছু লোক খাওয়ানোর আয়োজন করবে। এভাবে ১৩ দিন কাটানোর আয়োজনে টানপোড়নের মধ্যে ব্যতিব্যস্ত হতে গিয়ে ক্লান্ত হবে। প্রশ্ন- এটার কী খুবই প্রয়োজন?
আমি স্পষ্টই বলি- চারদিন পর ভুলে গেলে আমিহীন আমি তৃপ্তি পাবো। পারলৌকিক ব্যাপারটি না করলেই ভালো। কারণ এটা সামাজিকভাবে ধর্মীয় আভরণে এক ধরনের অত্যাচার। কেন লোক খাওয়ানো? পাপের ভাগ বন্টন করা? আমি তো পরকাল মানি না, বিশ্বাস করি না। বরং যে টাকাটা খরচ করার আয়োজন, তা যদি খরচই করতে হয়, তবে অবশ্যই কোনো দরিদ্র পরিবারের জন্যঅর্থাৎ দশহাজার টাকা করে পাঁচটি পরিবারকে এমনভাবে দেয়া, যাতে একটা মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে পরিবারের ভরনপোষণের ব্যবস্থা করে নেয়। আমি থাকব না, তবুও কেন জানি ভালো লাগবে।
শেষ কথা- আমি ছিলাম, আমি থাকব না, এসত্য মেনে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি ভোলা যায় এর চেয়ে বড়ো আনন্দ কীই বা থাকতে পারে। সকলকেই বলছি- ভুলে যাবে।
এ লেখাটি লিখেছিলাম গত বছর। কিন্তু বিগত ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ শুক্রবার আমার প্রিয়তম স্ত্রী জানান না দিয়ে মৃত্যু বরণ করায় বুঝতে পারলাম, এমন কিছু কাজ আছে যা সংসারের সঙ্গে আষ্টেপিষ্ঠে আটকে গেছে। আমি জীবিত থেকেও যা বিশ্বাস করি না, তা করতে পারি নি। সংস্কারগুলো মানতে হলো, ধারাবাহিক কাজগুলো করতে হলো, তৃপ্তি পেলাম কী না জানি না। তবে না করতে পারলে মৃতের আত্মার শান্তি পেতো কীনা তাও জানার অপেক্ষা না করে সংস্কারবদ্ধ বিধান মেনে দায়মুক্ত হয়ে এক ধরনের স্বস্তি পেলাম। এবং এ স্বস্তি পাওয়ার প্রধান কারণ হলো আমার স্ত্রী তার মৃত্যুর পর করণীয় বিষয়ে কিছুই বলে যান নি। তাই ধরে নিয়েছি চিরাচরিত বিষয়টি যাপিত হোক- এটাই হয়ত তার ইচ্ছে বা আকাক্সক্ষার মধ্যে ছিল। কিন্তু আমি যখন আমার সিদ্ধান্তগুলো জানিয়ে যাচ্ছি, তখন তা করার কোনো যুক্তি বা প্রয়োজন আছে কি?
পরিপ্রেক্ষিত অনেক সময় কঠিন বাস্তবতা বা পরীক্ষার সম্মুখে নিয়ে যায়। তাই যত বড় ব্যক্তিত্বধারী হউন না কেন, তখন অসহায়ের মতো আত্মসমপর্ণ করা ছাড়া গত্যান্তর থাকে না। তারপরও যিনি নিজের সিদ্ধান্তটি জানিয়ে যান অন্তত নির্মোহভাবে, তার মর্যাদাটুকু রাখলে ক্ষতি কি? লোক ভয়, সংস্কার, প্রথা- এসব তো দুর্বলের প্রতিপক্ষ। তবে মৃত্যুর পর একটি প্রত্যাশা হয়ত থেকে যায়।
রুদ্ধকণ্ঠ, গীতহারা, কহিয়ো না কোনো কথা,
কিছু শুধাব না।
নীরবে লইব প্রাণে তোমার হৃদয় হতে
নীরব বেদনা।
প্রদীপ নিবায়ে দিব, বক্ষে মাথা তুলি নিব,
স্নিগ্ধ করে পরশিব সজল কপোল,
বেণীমুক্ত কেশজাল স্পর্শিবে তাপিত ভাল,
কোমল বক্ষের তাল মৃদুমন্দ দোল।
নিঃশ্বাসবীজনে মোর কাঁপিবে কুন্তল তব, 
মুদিবে নয়ন-
অর্ধরাতে শান্তবায়ে নিদ্রিত ললাটে দিব
একটি চুম্বন।














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
হাসনাতের আসনে আলোচনায় গণঅধিকারের জসিম
বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই : মুফতি রেজাউল করিম
কুমিল্লাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই
দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকরলেন কাজী দ্বীন মোহাম্মাদ
কুমিল্লা-১০ আসনে একই ছাতার নিচে বিএনপির তিন ভূঁইয়া
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
প্রার্থী না থাকায় হতাশ দেবিদ্বার বিএনপি
নির্বাচন করা হলো না মুন্সীর
আপিলেও বিফল গফুর ভুইয়া
দেবিদ্বারে হাসনাত আবদুল্লাহর পক্ষে বিশাল গণমিছিল
ঝাউতলায় ৩ তলা অবৈধ ভবন অপসারণে কুসিকের ২য় নোটিশ
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২