
কবি কাজী
নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বহুমুখী বিচিত্র প্রতিভার এক অপূর্ব সমন্বয়। তাঁর
সৃষ্টিশীলতার মধ্যদিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে বাঙালি মনীষার মহত্তম বিকাশ। কবি
নজরুল জীবনে শৈশব থেকেই নানামুখী প্রবণতা। তাঁর পুরো জীবনেও এ বিচিত্র
ধারার প্রবণতা ও নিদর্শন তাঁর প্রতিভার মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে। কবির
জীবনে দেখা যায় একদিকে কবি অন্যদিকে কথাশিল্পী আবার সঙ্গীতশিল্পী,
আবৃত্তিকার, সুরকার, অভিনেতা, গীতিকার, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাংবাদিক। এরকম
বিচিত্র কাজের সাথে কবি জড়িয়ে ছিলেন। এই সব ক্ষেত্রেই কবির অবদান বিশেষ
উল্লেখযোগ্য। নজরুলের বহুমাত্রিক প্রতিভার অভূতপূর্ব সমাবেশ তাঁকে নানাভাবে
চিহ্নিত করেছে। বৈচিত্র্যমণ্ডিত করেছে, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করেছে। সাংবাদিকতা
নজরুল জীবনের অন্যতম একটি ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রটিকেও অত্যন্ত সফলতার সাথে
নিষ্ঠা ও কার্যকরভাবে উচ্চকণ্ঠে আলোড়িত করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন।
‘লাঙল’ নজরুলের সাংবাদিকতা জীবনের এক উজ্জ্বল সংযোজন। লাঙলের প্রকাশনার ১০০
বছর পেরিয়ে গেছে গত ডিসেম্বর মাসে। ১৯২৫ সনের ডিসেম্বর মাস থেকে ‘লাঙল’
প্রকাশিত হয়েছিলো। ‘লাঙ্গল’ কবি নজরুলের সাংবাদিকতা জীবনের যখন অনেক
অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তখনই লাঙলের লাঙল কবির মত ও পথের সন্ধান যেনে লাঙল
-এর সম্পাদক ছিলেন শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়, তবে প্রধান পরিচালক ছিলেন
কাজী নজরুল ইসলাম। কবি তখন তাঁর মত ও পথের সন্ধানে ব্যাপৃত। সংবাদপত্র
গুলোতে লেখার মধ্য দিয়ে সে অন্বেষার সোপান তৈরি করেছেন। নজরুল যেমন
আত্মআবিস্কারের মধ্য দিয়ে আত্মউন্মোচন ঘটিয়েছেন। জ¦লে ওঠেছেন আপন বৈভব ও
বিভায়।
কবি ব্রিটিশ ফৌজ থেকে ফিরে আসার পর সাংবাদিকতাই ছিলো তাঁর
পরবর্তী পেশা। যুদ্ধ ফেরত নজরুল দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ টগবগে যুবক। রাজনৈতিক
চেতনা তাঁর মধ্যে উদ্দীপ্ত। ফৌজে থাকাকালেই তিনি রাজনৈতিক চেতনায় ঋদ্ধ
হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীতে থাকা কালেই চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় মুজফ্ফর
আহমদের (১৮৮৯-১৯৭৩) সাথে। মুজফফর আহমদ তখন সাম্যবাদী ধারার রাজনীতিতে
নিবেদিত এবং কোলকাতায় সে ধারার রাজনৈতিক দল গঠনে সচেষ্ট। তিনি ছিলেন সেই
সময়ের কোলকাতার বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ও ম্যানেজার।
মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসের চতুর্থ
সপ্তাহে। তিনি তখন পল্টন হতে কয়েকদিনের ছুটি পেয়েছিলেন। তাকে পথ চিনিয়ে
৩২নং কলেজ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিতে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (পরে প্রখ্যাত সাহিত্যিক)। ৪৯নং বেঙ্গলি রেজিমেন্টে
থাকা কালেই নজরুলের লেখা প্রকাশিত হয় কোলকাতার পত্র পত্রিকায়। ঐ সময় তাঁর
‘ব্যথার দান’ গল্পটি ছাপা হয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়। ব্যথার দান
গল্পে নজরুলের বিপ্লবী চিন্তার প্রতিফলন লক্ষ করার মতো। ঐ সময় সোভিয়েত
রাশিয়ার বিপ্লব সংঘটিত হয়। ফলে নজরুলের মধ্যে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটে।
ব্যথার দান গল্পে সে ধারার প্রভাব দেখা যায়।
১৯২০ সালের মার্চ মাসে
পুরোপুরি বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হয়। নজরুল চলে আসেন কোলকাতায়। আর
তখন থেকে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি কার্যালয়ে থাকা শুরু করেন। এ ভাবেই
মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত হয়। নজরুলের মধ্যে তখন দেশপ্রেমের
প্রবল অনুভূতি। কিছুদিনের মধ্যেই এ অফিস থেকে প্রকাশনা শুরু হয় মাসিক
‘মুসলিম ভারত’। নজরুলের মধ্যে রাজনীতি করার প্রবণতা লক্ষ করার মতো। আর এ
প্রবণতা থেকেই তাঁর মাথায় একটি সংবাদপত্র প্রকাশনার চিন্তা। দেখা যায় এ সময়
ছোট একটি বাংলা দৈনিক করার কথা মুজফ্ফর আহমদ ও নজরুলের চিন্তা এবং
পরিকল্পনা চলতে থাকে। নজরুল বুঝে ছিলেন নিজের চিন্তাকে নিজের লেখনির
মাধ্যমে প্রকাশ করতে হলে একটি পত্রিকা প্রয়োজন। ফলে নজরুল, মুজফ্ফর আহমদ,
লেখক সাংবাদিক ওয়াজিদ আলী তাদের চিন্তার সাথে যুক্ত হন। এ পরামর্শে আরো
যুক্ত হন ফজলুল হক সেলবর্সী, পরে মঈনুদ্দীন হুসায়নও এ উদ্যোগ- পরামর্শ
আলোচনায় যুক্ত হন।
মুজফ্ফর আহমদ মনে করেন কাক্সিক্ষত এ কাগজের মধ্য দিয়ে
তাদের মত ও পথ নিরূপিত হয়ে যাবে। অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে তারা কোলকাতা
হাইকোর্টের প্রখ্যাত উকিল এ কে ফজলুল হক সাহেবের সাথে দেখা করেন (পরে
প্রখ্যাত রাজনীতিক শের এ বাংলা একে ফজলুল হক)। তিনি প্রস্তাবে রাজি হয়ে
যান। তাঁর প্রেস ও অর্থ দানের প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে। দৈনিক ‘নবযুগ’
প্রকাশের সার্বিক উদ্যোগে সম্পন্ন হয়। এভাবে বাংলা সংবাদপত্র সান্ধ্য দৈনিক
‘নবযুগের’ আত্ম প্রকাশ ঘটে। শুরুতেই যাঁরা যুক্ত ছিলেন তারা হলেন ফজলুল হক
সেলবর্সী, মুহম্মদ ওয়াজিদ আলী, কাজী নজরুল ইসলাম ও মুজফ্ফর আহমদ। কবি কাজী
নজরুল ইসলাম এভাবেই সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ করেন। পত্রিকাটির পৃষ্ঠপোষকতায়
ছিলেন ‘প্রধান পরিচালক’ এ.কে. ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২)। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই
সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ প্রকাশিত হয়। প্রথম বিশ^যুদ্ধের যুদ্ধোত্তর ভারতের
পরিস্থিতিই নবযুগের সৃষ্টির অন্যতম কারণ। প্রসঙ্গটি এ জন্য এখানে উত্থাপিত
হলো যেভাবে নজরুল সাংবাদিকতায় উৎসাহী হলেন। তাঁর তীব্র ইচ্ছা সংবাদপত্র
প্রকাশের ক্ষেত্রে তা এখানে প্রাসঙ্গিক। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নজরুলের এ
ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের পেছনে মুজফ্ফর আহমদের ভূমিকাটিও তাৎপর্যপূর্ণ।
মুজফ্ফর
আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী দেখা যায় প্রথমদিনেই নবযুগ বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ
করলো। হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায় কাগজটি টেনেছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ ধারণা
করেন নজরুলের লেখার কারণে পত্রিকাটি দিনদিনই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মুজফ্ফর আহমদ
ও অন্যরা অবাক হয়ে যেতেন বড় বড় দীর্ঘ সংবাদ কেটেছেটে নজরুল কীভাবে যথাযথ
সম্পাদনা করতেন পাকা সংবাদিককের মতো। সাংবাদিকতায় অনভিজ্ঞ নজরুলের পক্ষে
এটা তাঁর প্রতিভারই উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তাঁর দেয়া হেডিং গুলোও ছিলো অত্যন্ত
চিত্তাকর্ষক। নজরুলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা সম্পাদকীয় কলামে প্রকাশিত হয়।
নজরুলের অনেক লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার ক্ষুব্ধ হয়। পরে একসময় পত্রিকার
জামানতের টাকাও বায়োপ্ত করা হয়, ফলে একসময় নবযুগ বন্ধ হয়ে যায।
১৯২২
সালের ১১ আগস্ট কবি নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘ধূমকেতু’। ধূমকেতু ছিলো
অর্ধসাপ্তাহিক। নবযুগে যেমন কবির দ্রোহের ইঙ্গিত ছিলো তেমনি ‘ধূমকেতু’ ছিলো
নজরুলের বিপ্লবী সত্তার সুস্পষ্ট ছাপ। সে সময় ধূমকেতু অবিশ^াস্য জনপ্রিয়তা
লাভ করে। এ পত্রিকার সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলো ছিলো অগ্নিবর্ষণের মতো। মানুষ
গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো ধূমকেতু’র সংখ্যার জন্য। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের আশীর্বাণী নিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি সে সময় জনসাধারণ ও
বিপ্লবীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর আগে নজরুল ‘সেবক’ ও দৈনিক
মোহাম্মদী পত্রিকায়। কিছুদিন কাজ করেন। ধূমকেতু পত্রিকাতেই কবি স্বাধীন
ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। নজরুলের লেখার ধরন ভিন্ন রকমের ছিলো
সংবাদে টিপ্পনী ও ব্যঙ্গ পাঠকমনে বিশেষ সাড়া জাগায়। ধূমকেতু অফিসে খানা
তল্লাসী হয়। এ পত্রিকায় লেখার জন্য কুমিল্লায় কবি গ্রেফতার হন। পরে এক
বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন। সাংবাদিকতায় নজরুল তখন বেশ পরিণত। ধূমকেতু’র
প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাবার পর। নতুন করে পত্রিকা প্রকাশের চিন্তা করেন। কবি এ
সময় রাজনীতির সাথে যুক্ত। এখানে উল্লেখ এর কিছুদিন আগেই কবি কুমিল্লাতে
বেশ কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং স্বল্প সময়ের জন্য
গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন। এ সময়
নজরুল, হেমন্তকুমার সরকার, কুতবুদ্দীন আহমদ ও শামসুদ্দিন হোসেন এক সাথে
যুক্ত হয়ে নতুন একটি পার্টি গঠন করেন, যার (কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত) নাম
রাখা হয় লেবার স্বরাজ পার্টি। এ পার্টির মুখপাত্র রূপেই ‘লাঙল’-এর প্রকাশ
শুরু হয়। লেবার স্বরাজ পার্টির কার্যালয় স্থাপন করা হয়, কোলকাতার হ্যারিসন
রোডের ভাড়া বাড়িতে। এখান থেকেই ‘লাঙল’-এর প্রকাশনা শুরু হয়। এর প্রধান
পরিচালক কাজী নজরুল ইসলাম এবং সম্পাদক হন মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়।
‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের মুখপত্র’ রূপে ছাপা হতো। প্রথম সংখ্যাতেই
নজরুলের মানুষ ও সাম্যবাদী সহ বেশ কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়। লাঙল-এর
প্রথম পৃষ্ঠার শীর্ষে মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি চন্ডীদাসের বিখ্যাত চরণ
প্রতিসংখ্যায় উৎকলিত থাকতো।
‘শুনহ মানুষ ভাই-
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।
লাঙল-এর
প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫ দ্বিতীয় সংখ্যা ২৩ ডিসেম্বর
১৯২৫ এভাবে মোট ১৬ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি স্বল্পায়ু হলেও সংবাদপত্র
ও রাজনীতির ক্ষেত্রে নতুন কিছু সংযোজন করে ফলে এর দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে
তুষ্ট করে। এর পেছনেও নজরুলের লেখা। এ পত্রিকায় সহজ সরল ভাষায় সংবাদ
পরিবেশনের সাথে সাথে রাজনীতিরও সংযোগ ঘটে। পত্রিকাটির উদ্দেশ্য ও সেরকম
ছিলো। নজরুলের পরিণত চিন্তার প্রকাশ ঘটে লাগলে। সমাজ তান্ত্রিক চিন্তার
সরাসরি প্রভাব লক্ষণীয়। ২৬ সালের ১৫ এপ্রিলের পর থেকে আর প্রকাশিত হয়নি।
লাঙলের প্রতিসংখ্যার মূল্য ১ আনা বার্ষিক ৩ টাকা। লাঙল-এর প্রতিসংখ্যায়
ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতো ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস। এর অনুবাদক
ছিলেন শ্রী ণৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। আরেকটি আর্টিকেল প্রায় নিয়মিত
প্রকাশিত হতো তাহলো ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া’ এটি লিখতেন শ্রী দেবব্রত বসু।
পত্রিকাটিতে কার্লমার্ক্স, লেনিন, সোশ্যালিজম, সুভাষ চন্দ্রের পত্রাবলী
নিয়ে লেখা ছাড়াও কার্লমার্ক্সের লেখা প্রকাশিত হতো। যারা প্রায় লিখতেন তারা
হলেন মুজফ্ফর আহমদ, শ্রী সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মিসেস এম রহমান, হেমন্ত
কুমার সরকার, কুতুব উদ্দীন আহমদ, শ্রী হৃষীকেশ সেন। নজরুলের অনেক বিখ্যাত
কবিতা লাঙল-এ প্রকাশিত হয়। সাম্যবাদী, মানুষ ছাড়াও সব্যসাচী, বারাঙ্গনা,
রাজা-প্রজা, নারী, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, জেলের গান, কুলি-মুজুর,
চোর-ডাকাত, উল্লেখযোগ্য। প্রথম সংখ্যা থেকে অন্যান্য সংখ্যাতেও
শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের গঠনতন্ত্র, উদ্দেশ্য ও নিয়মাবলী প্রকাশিত
হতো। আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই ‘লাঙল’ শোষণমুক্ত সমাজ প্রগতিশীল চিন্তার
প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়্ সুশীল শিক্ষিত সমাজে লাঙল প্রশংসিত হয়। তখন বহু
বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ লাঙলকে অভিনন্দন জানায়। কোলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের
স্বর্ণপদক প্রাপ্ত মেধাবী ছাত্র হেমন্ত কুমার সরকার (১৮৯৫-১৯৫২) ও এ
পত্রিকার সাথে যুক্ত থাকায় সুধীমহলে এর বিশেষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। বিখ্যাত
শিল্পী চারুরায় এ পত্রিকার প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। ক্ষোভ, দ্রোহ ও
অন্ধকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিকাশমান আলোর মশালচি রূপে এগিয়ে নিয়ে যাবার
দায়িত্ব নিজেই কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন নজরুল।
প্রথম আত্মপ্রকাশ বিশেষ সংখ্যায় লাঙল জানান দেয় এইভাবে
“যেখানে
দিন দুপুরে ফেরীওয়ালী মাথায় করে মাটি বিক্রী করে, সেই আজব শহর কলিকাতায়
‘লাঙল’ চালাবার দুঃসাহস যারা করে তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন।
কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা ‘লাঙল’ নিয়ে বেরুলাম। এই পাষাণের বুকচিরে আমরা
সোনা ফলাতে চাই।
... ... ... ... ... ... ... ...
ব্রাহ্মণ
পাদরির রাজত্ব গিয়েছে, গুরু, পুরোহিত, - পোপ নির্ব্বংশ প্রায়। ক্ষাত্র
সম্রাট ও সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়েছে। রাজা আছেন নামে মাত্র। আমেরিকা ইংল্যান্ড
প্রভৃতি দেশে এখন বৈশ্যের রাজত্ব, এবার শুদ্রের পালা। সমাজের প্রয়োজনে
শুদ্র নয়, শুদ্রের প্রয়োজনে সমাজ চলবে। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা,
ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সমস্যা সব লাঙলের ফালের মুখে লোপ পাবে। তাই আমরা লাঙলের
জয়গান আরম্ভ করলাম। লাঙল-নবযুগের নবদেবতা।”
১৩তম সংখ্যা থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর্শীবচন প্রচারিত হয়। আশীর্বাণী ছিলো এরকম-
“জাগো জাগো বলরাম
ধরো তব মরুভাঙ্গা হল
বল দাও ফল দাও
স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল”
মুখপত্র
হিসেবে একটি বিষয় লক্ষ করা যায় প্রথম বিশেষ সংখ্যা ছাপা হয়
‘শ্রমিক-প্রজা-সম্প্রদায়ের সাপ্তাহিক মুখপত্র’ আবার দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে
ছাপা হয় “শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলের সাপ্তাহিক মুখপাত্র’ কিন্তু অষ্টম
সংখ্যা থেকে ছাপা হয় “বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র” আরেকটি
লক্ষণীয় বিষয় হলো সম্পাদক পরিবর্তন। ১৩তম সংখ্যা থেকে সম্পাদক শ্রী
মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিবর্তে যার নাম ছাপা হয় তিনি হলেন শ্রী গঙ্গাধর
বিশ^াস। যদিও সকল সংখ্যাতেই প্রধান পরিচালক হিসেবে নজরুল ইসলাম নাম যথারীতি
ছাপা হতো। ১৬ সংখ্যা পর ‘লাঙল’ নামটি পাল্টে যায়্ তার নাম হয় ‘গণ-বাণী’।
কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব, দায়িত্ব ও বদলে যায়। নতুন নামে এবং নতুন ব্যবস্থাপনায়
প্রকাশিত হতে শুরু করে।
১৯২৬ সালের ১৫ এপ্রিলের পর ‘লাঙল’ আর
প্রকাশিত হয়নি। ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট থেকে ‘গণ-বাণী’ নামে সাপ্তাহিক
প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। তার প্রথম সংখ্যা থেকেই বড় হরফে পত্রিকার নামের
নিচে ব্র্যাকেটে লেখা থাকে ‘এর সাথে ‘লাঙল’ একীভূত হয়েছে’। এটিও বঙ্গীয়
কৃষক ও শ্রমিক দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশ পায়। পরিচালক বা
সম্পাদক হিসেবে নজরুল না থাকলেও তিনি এ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন লেখক
হিসেবে। এর সম্পাদক ছিলেন মুজফ্ফর আহমদ ও শ্রী প্যারীমোহন দাস। গণ-বাণীতে ও
নজরুলের অনেক কবিতা ও সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। দেখা যায় ১৬টি
সংখ্যা ‘লাঙল’ প্রকাশিত হয় কিন্তু এর মধ্য দিয়ে পাঠক মহলে ব্যাপক আলোড়ন
সৃষ্টি করে। বিষয় বৈচিত্র্য লেখার স্টাইল, আকর্ষণীয় বিষয়ের সংযোজন,
প্রকাশনার অভিনবত্ম পাঠক মহলে দারুণভাবে সমাদৃত হয়। এখানেই নজরুলের
সার্থকতা। তিনি যা করছেন তাতে নতুন কিছু উপস্থাপন হয়েছে তিনি যা লিখেছেন
তাতেও নব ভাব নব উদ্দীপনা নব জাগরণ হয়ে ওঠেছে। স্বজাতি স্বভাবনা স্বদেশ
নজরুলের কাছে প্রধান হয়ে ওঠেছিলো। ‘লাঙল’ পত্রিকায় দেখি নবযুগের উন্মোচন
সমাজতান্ত্রিক বিশে^র প্রতি নজরুলের দৃষ্টি, নজরুলের অনুগমন। নিরণ্ন খেটে
খাওয়া সাধারণ মানুষ। শ্রমিক কৃষকের বেদনা, অভিযোগ, নিচু তলার মানুষের
কান্না তার পত্রিকায় প্রাধ্যান্য পেয়েছে, অবলীলায় সমাজতন্ত্রের ধারণা
নজরুলকে প্রভাবিত করেছে ‘লাঙল’ ও সেই প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কবি নজরুল
তাঁর কবি সত্ত্বাকে পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন সাংবাদিকতায়। এ ভাবে সংবাদে
কাব্যিক ব্যবহার খুব সহজ ব্যাপার ছিলোনা। তাঁকে সবসময় পাঠকের কথা মনে রাখতে
হয়েছে। সম্পাদক হিসেবেও নজরুল একজন সফল সম্পাদক। তাঁর উদ্ভাবনী মনোবৃত্তি
সাংবাদিকতা জগতে ব্যতিক্রম চমক সৃষ্টি করে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে
নজরুলের ক্রম পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। নবযুগে নানা অসংগতি সরকারের নানাবিধ
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বিক্ষুব্ধ নজরুল। ‘ধূমকেতু’তে এসে নজরুল
পুরোপুরি বিদ্রোহী। উপনিবেশিক অধিপত্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে নজরুল যুদ্ধ
করেন। তিনিই সর্বপ্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। ‘লাঙল’ এ এসে
নজরুল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তথা সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। শোষন শাসন এর
বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সামাজিক ন্যায়, শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের
পক্ষে প্রবলভাবে উপস্থিত করেন। বিপ্লবী চেতনায় হৃষ্ট নজরুল সোভিয়েত
বিপ্লবকে আত্মচেতনায় স্থাপন করেন। তাই দেখা যায় সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় কবি
তখন উদ্দীপিত। ‘লাঙল’ বেশিদিন প্রকাশিত না হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠির কাছে
নজরুল যে বার্তা দিতে চেয়েছেন তাতে তিনি সফল। নজরুলের লক্ষ মানুষের
স্বার্থ, মানুষের উত্থান, মানবতা, মানুষের জয়গান। সেদিক থেকে নজরুল ও লাঙল ও
তার আদর্শিক মত ও পথ আজো প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। নজরুল এখানেও অবিস্মরণীয়
তাঁর অবদানের জন্য।
সহায়ক গ্রন্থ
১. রফিকুল ইসলাম - কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃষ্টি, কে পি বাগচি অ্যান্ড কোং কলকাতা ১৯৯৭।
২. মুজফ্ফর আহমদ - কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুক্তধারা, ঢাকা ১৯৯৯।
৩. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর - কবি নজরুলের সাংবাদিক জীবন, বাংলাদেশ বুকস্ ইন্টারন্যাশনাল লিঃ, ঢাকা ১৯৮২।
৪. আলী হোসেন চৌধুরী - নজরুলের সৃষ্টিতে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০১০।
৫. মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্পাদিত - লাঙল ও গণবাণী (প্রকাশিত সংখ্যার ছায়ালিপি), নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা ২০০১।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, নজরুল গবেষক। ডিন লিবারেল আর্টস্ অনুষদ, সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, কুমিল্লা।
