
শুক্রবার
ছুটির দিনেও শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ ইনডোর স্টেডিয়ামে ব্যস্ততা। ৪০তম জাতীয়
টেবিল টেনিসের সমাপণী দিনে হাজির হয়েছিলেন সাবেক তারকা খেলোয়াড়রাও। সাত দিন
ব্যাপী প্রতিযোগিতায় সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়ে ১৪ ইভেন্টের মধ্যে বিকেএসপি নয়
ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন আর একক খেলোয়াড় হিসেবে বিকেএসপির শিক্ষার্থী খৈ খৈ
মারমা আট ইভেন্টে পদক পেয়েছেন। এর মধ্যে ছয়টিতেই চ্যাম্পিয়ন।
একক
ইভেন্টের ফাইনালেই থাকে বেশি আকর্ষণ। নারী ও পুরুষ দুই ইভেন্টেই অবশ্য তেমন
প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। বিগত জাতীয় নারী চ্যাম্পিয়ন সাদিয়া রহমান মৌকে
সরাসরি তিন সেটেই হারিয়েছেন খৈ খৈ। পুরুষ বিভাগে মোহতাসিন আহমেদ হৃদয় ৩-১
সেটে পরাজিত করেছে আরেক সাবেক চ্যাম্পিয়ন রামহিম লিয়ান বমকে। হৃদয়ের এটি
তৃতীয় জাতীয় শিরোপা হলেও খৈ খৈ’র প্রথম।
প্রথমবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন
হওয়ায় খৈ খৈ’র উচ্ছাস একটু বেশিই, ‘আগেরবারও টার্গেট ছিল সিনিয়র ও জুনিয়র
দুটোতেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, কিন্তু মৌ আপুর কাছেই হেরেছিলাম। এবার টিমসেও
উনার কাছে হেরেছি। সিঙ্গেলে যখন শুরুটা ভালো হয়েছিল, তখন থেকেই
আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।’ দ্বিতীয় সেট সহজে জিতলেও প্রথম ও তৃতীয় সেট ডিউজ
হয়েছিল। তাই প্রতিপক্ষ হিসেবে মৌকে বেশ সমাদর করলেন নতুন চ্যাম্পিয়ন, ‘উনার
সঙ্গে খেলা অনেক টাফ। সোমা (সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন) আপুর বিপক্ষে খেলাও
কঠিন, তবে তার বিরুদ্ধে বেশি। শুরু থেকে আক্রমণ করে তাকে চাপে রাখার চেষ্টা
করেছি।’
মাস দুয়েক আগে সৌদি আরবে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে খৈ খৈ ও
জাভেদ আহমেদ মিশ্র বিভাগে বাংলাদেশকে রৌপ্য পদক এনে দেন। যা বাংলাদেশের
টেবিল টেনিসের ইতিহাসে সেরা অর্জন। এমন সাফল্যের পর জাতীয় পর্যায়ে খৈ খৈ
নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন। আগামীতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান,
‘আমি চেষ্টা করব এই ফর্ম ধরে রাখতে। এজন্য অনেক কঠিন পরিশ্রম ও সবার
সহযোগিতা প্রয়োজন।’
রাঙামাটির মেয়ে হলেও পারিবারিক দারিদ্রতায় খৈ খৈ’র
বেড়ে ওঠা বান্দরবান কোয়ান্টামে। নিজের পেছনের গল্প তিনি বললেন এভাবে,
‘আমাদের দুই বোনকে ফ্যামিলি থেকে চালানো মা-বাবার পক্ষে টাফ ছিল।
কোয়ান্টামে ফ্রি পড়াশোনা ও সব সুবিধা থাকায় আমাকে সেখানে ভর্তি করে দেওয়া
হয়। সেখান থেকেই স্যার-ম্যামরা আমাকে টেবিল টেনিসে নিয়ে আসেন। শুরুতে
পড়াশোনার দিকেই ঝোঁক ছিল বেশি, কিন্তু মাঝে মাঝে শখের বসে খেলতাম। পরে
ফেডারেশনের স্যারদের পছন্দ হওয়ায় ২০১৯ সালে ডাক পাই। এরপর ২০২০ সালে করোনার
সময় ক্যাম্পে ডাক পাওয়ার পর সুমন স্যার আমাদের ৪ জনকে (আমি, রামিম ভাই,
ঐশী এবং রেশমি) ফেডারেশনে নিয়ে আসেন এবং সব দায়িত্ব নেন। ২০২১ সালের শেষের
দিকে বিকেএসপিতে ভর্তি হই যাতে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া
যায়।’
খৈ খৈ বালিকা, মহিলা একক, বালিকা দ্বৈত ও দলগত, মিশ্র দ্বৈত
(সিনিয়র ও জুনিয়র ) চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। মহিলা এককে মৌ হারলেও দ্বৈত ইভেন্টে
তার বোন সোমাকে নিয়ে অবশ্য জিতেছেন। ইসলামিক গেমসে খৈ খৈ’র পার্টনার জাভেদ
আহমেদ একক ইভেন্টে ফাইনালে উঠতে পারেননি। হৃদয়ের কাছে হেরেছেন সরাসরি ৩-০
সেটে। প্রথম সেটে ১০-৬ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে হৃদয় সেট জেতেন।
এরপর দুই সেট লড়াই করলেও জিততে পারেননি। ফাইনালও জিততে হৃদয়কে তেমন বেগ
পেতে হয়নি।
তৃতীয়বারের মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর
হৃদয় বলেন, ‘অনেক দিনের পরিশ্রমের সফল হয়েছি, এই জন্য আরও বেশি আনন্দিত।’
সিনিয়র-জুনিয়র মিলে এবার মোট ৮৩০ ম্যাচ হয়েছে। দুই বিভাগেই খেলেছেন বেশ
কয়েকজন খেলোয়াড়। এতে তেমন বিশ্রাম পাননি। এ নিয়ে হৃদয় বলেন, ‘আজকেও তিন
থেকে চারটা খেলছি। আমার মনে হয় যে এখানে একটু গুছানো হলে আমাদের জন্য অনেক
ইজি হতো। যেহেতু আমি এর আগের দিনও প্রায় সিঙ্গেলস চারটা ম্যাচ খেলেছি, আজকে
চারটা। এগুলো আমাদের জন্য একটু প্রেশার। তো এর আগে থেকে যদি গুছিয়ে নেওয়া
যায় একটু টাইম টেবিল, তারপর হচ্ছে রুটিন, শিডিউল করা যায় ঠিকমতো যাতে
আমাদের প্রেশার কম পড়ে, সেভাবে ফেডারেশনকে একটু গুছানো উচিত।’
জাতীয়
চ্যাম্পিয়নশিপ একটি খেলার বড় প্রতিযোগিতা। সেটা অন্য ফেডারেশনের মতো টেবিল
টেনিসেও অনিয়মিত। এ নিয়ে আক্ষেপের সুরে হৃদয় বলেন, ‘অনেক দিন পর প্রায় তিন
বছর পর ন্যাশনাল হলো। টেবিল টেনিসটা ঘন ঘন মানে ন্যাশনাল টুর্নামেন্টটা
প্রত্যেক বছর হওয়া উচিত এবং র্যাঙ্কিং যেভাবে ফেডারেশন আগায় নিয়ে যাচ্ছে
তাই আশা করি তারা সামনেও এরকম টুর্নামেন্ট দেবে।’
এবারের প্রতিযোগিতায়
বিকেএসপির খেলোয়াড়রা নিজ প্রতিষ্ঠানের হয়েই খেলেছেন। অন্য সময়ে অন্য দলের
হয়ে খেলতেন। এবার বিকেএসপির হয়ে খেলায় জুনিয়র বিভাগে সাত ইভেন্টেই
চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সিনিয়র বিভাগে মহিলা একক খৈ
এবং মিশ্র দ্বৈতে খৈ খৈ ও হাসিব আরও দুটি শিরোপা এনে দেন।
