বিদ্যুৎ
ও জ্বালানি খাতের জন্য ২০২৬–২০৫০ মেয়াদের মহাপরিকল্পনা প্রধান উপদেষ্টা
মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তুলে ধরেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
দেশি
সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষতা
বাড়ানো ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মাধ্যমে দেশের সব মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য,
সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এ
পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
এর মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত ‘ফার্স্ট
ট্র্যাক প্রায়োরিটি’ প্রকল্প হিসেবে অফশোর অনুসন্ধান রাউন্ড, গ্যাস উৎপাদন
বাড়ানো, এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিশোধন সক্ষমতা সম্প্রসারণ
এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী
কৌশলগত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে
রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া
অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূ-তাপীয় (জিওথার্মাল) শক্তি এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র
তরঙ্গভিত্তিক শক্তি উন্নয়ন।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান
উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বুধবার দুপুরে ২৫ বছরের এই মহাপরিকল্পনা সংক্রান্ত
সভা হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার
বিস্তারিত তুলে ধরেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায়
প্রধান উপদেষ্টা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত গবেষণার জন্য একটি পৃথক ও
স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউশন গঠনের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, ‘রিসার্চ অ্যান্ড
ডেভেলপমেন্টের আলাদা ইনস্টিটিউট হতে হবে। এটা মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলে চলবে
না। এটি একটি আলাদা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হবে, যা পৃথিবীতে এ সম্পর্কিত যত
সংস্থা আছে সবকটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এবং পলিসি তৈরিতে সরকারকে সাহায্য
করবে।
অতীতে ‘যা হয়েছে’ সবই ‘খাপছাড়া’ বলে মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা
বলেন, “একদম শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে। একরকমভাবে হয়ে আসছে সেজন্য সেই
পথেই যেতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
“অনেককিছু ভুল লোকেশনে, ভুল
স্ট্রাকচারে হয়েছে। এমনটা যেন আর না ঘটতে পারে। একটা কাঠামো, নিয়মের মধ্যে
যেন থাকে সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য গবেষণাকেন্দ্র জরুরি।”
সভায়
আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার ‘নীতিগত ঘাটতি’ (পলিসি গ্যাপ) চিহ্নিত করে তা
সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হয়। নতুন মহাপরিকল্পনা তিন ধাপে বাস্তবায়নের
প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপ ২০২৬–২০৩০, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০–২০৪০ এবং তৃতীয়
ধাপ ২০৪০-২০৫০ সালকে ধরা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের খুঁটিনাটি
বিস্তারিত উপস্থাপনের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বাংলাদেশের
অর্থনীতির প্রাণ এখানে। এটা সবল হলে অর্থনীতি দাঁড়াবে। দেশের প্রতিটি
মানুষের জীবনকে এই খাত প্রভাবিত করে।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,
“মহাপরিকল্পনায় দেখানো হয়েছে, দ্রুত প্রবৃদ্ধির মধ্যেও কীভাবে দক্ষতা
বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করে জলবায়ু প্রভাব কমানো
সম্ভব এবং একইসঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। প্রক্ষেপণ
অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদা ১৭ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৫৯
গিগাওয়াটে পৌঁছাবে, যা পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
“তবে
পরিচ্ছন্ন ও অধিক দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ
উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ ০.৬২ টন থেকে কমে ০.৩৫ টন ঈঙ₂/মেগাওয়াট-ঘণ্টায়
নামবে। জলবায়ু সংক্রান্ত উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৬৪
দশমিক ৫ মিলিয়ন টন এবং মোট ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড
নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব হবে।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “মহাপরিকল্পনার অংশ
হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকটি সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘বিদ্যুৎ
ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ বাতিল,
মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫, রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসি ২০২৫, রুফটপ সোলার
প্রোগ্রাম ২০২৫ এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ গ্রহণ।
“সভায় বিদ্যুৎ
উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক টেকসই অবস্থা এবং
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। লক্ষ্য
নির্ধারণ করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে আরও নিরাপদ,
দক্ষ, কম আমদানিনির্ভর এবং আর্থিকভাবে টেকসই করা। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী
২০২৬-২০৫০ মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০–৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদ্যুৎ
খাতে ১০৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।”
বিদ্যুৎ,
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অর্থ
উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, শিল্প
উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী
চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক,
টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
