
সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোয় মধ্যবিত্ত ও অবসরভোগীদের মাথায় হাত। এটি ছাড়া দেশে আর কোনো নিরাপদ বিনিয়োগ পণ্য নেই, এজন্য এটা তাদের জন্য দুঃসংবাদ। আমরা জানি সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক মূলত দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বিপদের সময় সঞ্চয়পত্র ভেঙে তা সামাল দেয়। আবার প্রতি মাসের সংসার খরচের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চমূল্যস্ফীতি চলমান। যদিও কয়েক মাস ধরে উচ্চমূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরেই বিদ্যমান। ফলে সামগ্রিকভাবে নতুন বছরের শুরু থেকে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরও বাড়ল। বিশেষ করে যাদের পারিবারিক খরচের একটি অংশ এখান থেকে আসে তারা আরও চাপে পড়বেন। এ ছাড়া ধনী ব্যক্তিরাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ খাত সঞ্চয়পত্রের মূল দর্শনে বিচ্যুতি ঘটেছে। তাই চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিক ও ধনী ব্যক্তিদের এ খাত থেকে বাদ দিয়ে বিশেষ বিবেচনায় স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সঞ্চয়পত্রের বাড়তি সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে। তারা মনে করেন, বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার অনেক বেশি। মধ্যবিত্ত চাইলে সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। এটিও সঞ্চয় পত্রের মতোই নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা। সেখানে সরকারের গ্যারান্টিও আছে।
আগামী ছয় মাসের জন্য সঞ্চয়পত্রের নতুন মুনাফার হার ঘোষণা করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (ইআরডি)। ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মুনাফার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। নতুন হার অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার হবে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার হবে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর ফলে বিদায়ি বছরের তুলনায় চলতি বছরে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে মুনাফা কমবে ১১০ টাকা। গত বছর পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগে পাওয়া যেত ৯৪৪ টাকা। চলতি মাসে বিনিয়োগ করলে পাওয়া যাবে ৮৩৪ টাকা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কম। ছয় মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমায় মধ্যবিত্ত বিশেষ করে যারা এ আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করেন তারা বড় ধরনের চাপে পড়লেন। বর্তমানে স্থিতিশীল উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে নতুন করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ কোনোটাই করার সামর্থ্য নেই। বরং আগে বিনিয়োগ করা সঞ্চয়পত্র ভেঙে খাচ্ছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবসরভোগী এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করে দেশের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সংসার চালায়। মুনাফার হার বারবার কমানোর ফলে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতির বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে বিনিয়োগ, মজুরি এবং শ্রমবাজার কোথাও খুব বেশি সুখবর নেই। শুধু রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় বাদে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কোনো খাতেই আয় বাড়ছে না। অন্যদিকে স্থিতিশীল রয়েছে উচ্চমূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন করে সঞ্চয় করার মতো সক্ষমতা অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অর্থাৎ মুনাফার হার বাড়ানোর পরও যেমন সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়েনি, এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর পরও সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ খুব বেশি কমবে না। সঞ্চয়পত্রে যে সংস্কার করা হয়েছে সেটি সুদহার বাজারভিত্তিক করার উদ্দেশ্যে। সুদহার কমানোর জন্য নয়। কারণ সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ না নিতে আইএমএফএরও পরামর্শ রয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমায় চাপে পড়লেন দেশের মধ্যবিত্ত এবং অবসরভোগী বিনিয়োগকারীরা। সরকারের উচিত বিশেষ বিবেচনায় এ শ্রেণির মানুষের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমরা দেখছি তাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন। সরকারকে নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আশা করছি, সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
