প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৩ এএম আপডেট: ০৫.০১.২০২৬ ১২:৪৪ এএম |

দাখিলকৃত হলফনামায় কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ কামরুল হুদার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, বাখরাবাদ গ্যাসের মিটারে কারসাজির কোটি কোটি টাকার দেনা এবং চলমান একাধিক মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। গ্যাসের মিটারে অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে তার বিরুদ্ধে প্রায় ১১কোটি ৮৩ লাখ টাকা পাওনার অভিযোগ রয়েছে।
শনিবার (৩জানুয়ারি) কুমিল্লা জেলা রিটানিং কর্মকর্তা কার্যালয়ে মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ মনির হোসেন এই অভিযোগ করেন।
দাখিলকৃত অভিযোগে তিনি বলেন, কামরুল হুদা তার যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেড-এর গ্যাস মিটারে একাধিকবার অবৈধ হস্তক্ষেপ (মিটার টেম্পারিং) করেন। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কাছে তার সর্বমোট ১১ কোটি ৮৩ লাখ ৫ হাজার ১০ টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া তিনি হলফনামায় ফৌজদারি মামলার তথ্যও গোপন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। এর মধ্যে চৌদ্দগ্রাম থানার মামলা নং-০৯ (তারিখ ০৭/০২/২০১৮), জিআর নং-৪৩/১৮ এবং স্পেশাল ট্রাইবুনাল মামলা নং-৫০/২০২০ সংক্রান্ত তথ্য মনোনয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। উক্ত মামলায় কামরুল হুদা ২০ নম্বর আসামি ছিলেন।
অভিযোগকারীর দাবি, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত পরিপত্র নং-০৭ এর ৩(খ) এবং পরিপত্র নং-০৬ এর প্যারা-২ অনুযায়ী সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের নিকট বকেয়া বিল সংক্রান্ত তথ্য হলফনামায় দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রার্থী তা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) সূত্রে জানা জানা গেছে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজারে অবস্থিত মেসার্স মিয়া বাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে চার দফায় গ্যাস মিটার টেম্পারিংয়ের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। এসব অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গ্যাস আত্মসাৎ করা হয়, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে বিপুল অঙ্কের বকেয়া নির্ধারণ করা হয়।
২০০৮ সালের ১৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটিকে সিএনজি ও ক্যাপটিভ উভয় খাতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয় যেখানে অনুমোদিত লোড ছিল সিএনজি খাতে ঘণ্টায় ৬২৫ ঘনমিটার ও ক্যাপটিভ খাতে ঘণ্টায় ৪৭ ঘনমিটার। কিন্তু সংযোগ পাওয়ার পর থেকেই চার দফায় মিটার টেম্পারিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ে। ২০০৯ সালের ১৫ জুন প্রথম দফায় সিএনজি ও ক্যাপটিভ উভয় মিটারে অবৈধ হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হলে ৯৫ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ টাকা বকেয়া নির্ধারণ করা হয়। ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় সিএনজি মিটার নষ্ট অবস্থায় পাওয়া গেলে ৭৬ লাখ ৭১ হাজার ৭২৩ টাকা বকেয়া নির্ধারণ হয় যা পরিশোধ করা হয়। আবার ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট তৃতীয় দফায় মিটার পরিবর্তনের সময় পুনরায় টেম্পারিং ধরা পড়ে এবং এতে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৪২ হাজার ২১৯ টাকা বকেয়া নিরূপণ করা হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর চতুর্থ দফায় আবারও মিটার টেম্পারিংয়ের প্রমাণ পাওয়ায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং এ বাবদ ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫ টাকা বকেয়া নির্ধারণ করা হয়। ফলে তৃতীয় ও চতুর্থ দফা মিলিয়ে বকেয়া দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৭ লাখ ৯১ হাজার ২৬৪ টাকা এবং সব মিলিয়ে বর্তমানে পাওনা ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি। বকেয়া পরিশোধ এড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক আইনি পদক্ষেপ নেয়। ২০১৬ সালে বিইআরসি-তে বিরোধ নিষ্পত্তি আবেদন নং-৪৪/২০১৬ দায়ের করা হলে ২০১৮ সালের ২৭ মে কমিশন মিটার টেম্পারিং প্রমাণিত উল্লেখ করে আবেদন খারিজ করে। পরে গ্রাহক হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১১১৫৮/২০১৮ দায়ের করলে ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর আংশিক বিল পরিশোধ সাপেক্ষে সংযোগ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে আপত্তি জানিয়ে বাখরাবাদ আপিল বিভাগে সিভিল আপিল নং-১১৪/২০২৩ দায়ের করে যা বর্তমানে বিচারাধীন। একই সঙ্গে গ্রাহক পরিশোধিত অর্থ ফেরতের দাবিতে বিইআরসি-তে নতুন করে বিরোধ নিষ্পত্তি আবেদন নং-১১/২০২৪ দায়ের করেছে।
সূত্রমতে,২০০৯ সালে প্রথম দফায় ৯৫ লাখ টাকা,২০১০ সালে দ্বিতীয় দফায় ৭৬ লাখ টাকা (পরিশোধিত),২০১৬ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে।৫ কোটি ৪০ লাখ এবং ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বকেয়া নির্ধারণ করা হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে সরকারি পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি।
বকেয়া পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক আইনি কৌশল অবলম্বন করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মিটার টেম্পারিং প্রমাণিত উল্লেখ করে আবেদন খারিজ করলেও বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। মামলার সুযোগে এখনো স্থায়ীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট বকেয়া বিল ও চলমান মামলার তথ্য মনোনয়ন হলফনামায় উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হলেও প্রার্থী কামরুল হুদা তা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। শুধু মিয়া বাজার সিএনজি নয়। তার যৌথ মালিকানাধীন বাংলা গ্যাস, স্বজন সিএনজি, সাবুরিয়া সিএনজির বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রীয় গ্যাস আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।