মাত্র
এক ঘণ্টার অতিভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে কুমিল্লা নগরীর বিস্তীর্ণ
এলাকা। সোমবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে ৬টা ২০ মিনিট পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া
প্রায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি,
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয় ব্যাপক
জলাবদ্ধতা। হাঁটু সমান পানি জমে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। আকস্মিক
এই বৃষ্টিতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নগরীর স্বাভাবিক জনজীবন
কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
জেলা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিকেল থেকে
সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মাত্র এক ঘণ্টায় ৯১ দশমিক ৪ মিলিমিটার
বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটিকে অতিভারী বৃষ্টিপাত বলছে আবহাওয়া
কর্মকর্তা। চলতি মৌসুমে কুমিল্লায় এটি সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড।
বিশেষ করে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা ছিল অনেক বেশি।
শহরের বাইরে বৃষ্টি হলেও এমন মাত্রার অতিভারী বর্ষণ দেখা যায়নি।
বৃষ্টির
পরপরই নগরীর কান্দিরপাড়, মনোহরপুর, কান্দিরপাড় থেকে ঈদগাঁও সড়ক, টমছম
ব্রিজ থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়ক, টমছম ব্রিজ থেকে
কান্দিরপাড় সড়ক, সালাউদ্দিন থেকে মহিলা কলেজ সড়ক, মহিলা কলেজ থেকে
রাণীরদীঘি সড়ক, রাজগঞ্জ থেকে চকবাজার, ধর্মসাগরপাড়, রানীরবাজার, ভিক্টোরিয়া
কলেজ ডিগ্রি শাখা, জাঙ্গালিয়া, শাসনগাছা, ঝাউতলা, বাগিচাগাঁও, ঠাকুরপাড়া,
ফৌজদারী থেকে আদালত সড়ক, পুলিশ লাইনস, হাউজিং এস্টেটসহ শহর ও শহরতলীর
বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক স্থানে সড়কের ওপর হাঁটু
সমান পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও
ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনেকগুলো পানির মধ্যে বিকল হয়ে যায়। অফিস শেষে ঘরে
ফেরা মানুষকে দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে দেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি
দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়।
হাসপাতালের বিভিন্ন সড়ক, ওয়ার্ডের সামনের অংশ এবং বহির্বিভাগের আশপাশে পানি
জমে রোগী ও স্বজনদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের
অনেককে পানি মাড়িয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতে হয়েছে। হাসপাতালের নিচতলার
বিভিন্ন অংশেও পানি প্রবেশ করে দুর্ভোগের সৃষ্টি করে।
রোগী ও স্বজনরা অভিযোগ করেন, সামান্য বৃষ্টিতেই হাসপাতাল এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান হচ্ছে না।
জলাবদ্ধতা
থেকে রেহাই পায়নি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড এলাকাও। শিক্ষা বোর্ড চত্বর ও
সড়কে পানি জমে জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে কুমিল্লা জিলা স্কুল,
ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি শাখা, কুমিল্লার ধর্মপুর খাদ্য গুদাম,
সরকারি মহিলা কলেজসডহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ এবং
প্রবেশপথ পানিতে তলিয়ে যায়।
নগরীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি
প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। বহু বাসাবাড়ির নিচতলা,
গ্যারেজ ও রান্নাঘরে পানি প্রবেশ করে। বাসিন্দারা ঘরের আসবাবপত্র ও
প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিচু
এলাকাগুলোর অনেক পরিবারের সদস্যদেরকে বালতি ও পাম্প দিয়ে পানি অপসারণ করতে
দেখা যায়। বেশ কয়েকটি দোকানপাট, শোরুম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও পানি
ঢুকে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, আকস্মিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি।
একই
সঙ্গে নগরবাসীর অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার দখল,
অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান নালা-নর্দমার নিয়মিত পরিষ্কার না
হওয়ার কারণেই সামান্য সময়ের ভারী বর্ষণেও কুমিল্লা শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ছে।
অনেক স্থানে ড্রেনের পানি উপচে সড়কে উঠে আসে এবং পানি নামার পথ না থাকায়
দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা ছৈয়দ
আরিফুর রহমান জানান, বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে ৬টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মাত্র
এক ঘণ্টায় ৯১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী
বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে পড়ে। এই বৃষ্টিপাত মূলত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন
এলাকাকেন্দ্রিক ছিল। তিনি বলেন, রাতভর বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, তবে তা
মাঝারি থেকে ভারী মাত্রার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপাতত আর কোনো অতিভারী
বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নেই।
