মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬
২ আষাঢ় ১৪৩৩
বাঁচাতে-সাজাতে: প্রসঙ্গ কুমিল্লা শহর
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ১:০৯ এএম আপডেট: ১৬.০৬.২০২৬ ১:৫২ এএম |

 বাঁচাতে-সাজাতে: প্রসঙ্গ কুমিল্লা শহর কুমিল্লা শহরের (নগরের) মানুষ জেগে উঠেছে। সহজকথায় কুমিল্লা শহরবাসী আজ গণজাগরণে উদ্দীপ্ত। তারা কুমিল্লা শহরকে বাঁচাতে চায়, সাজাতে চায়। মনের মতো না হলেও বাসোপযোগী করে তুলতে চায়। কবি সুকান্তের সুরে বলেছি- এ কুমিল্লাকে বাসযোগ্য করে যাব’- এ প্রতিজ্ঞা। কুমিল্লা শহর এখন জনসংখ্যা বিবেচনায় ধারণ-ক্ষমতার অতি-অতিরিক্ত। এত লোক এতটুকু জায়গায় সংকুলান হচ্ছে না। অপরিকল্পিত আবাসনগুলোর দিকে তাকালেই দৃশ্যমান হয়। একটি অট্টালিকায় ৮০/১০০ পরিবার বাস করে, লোকসংখ্যা ৪০০/৫০০ জন। এই অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে ২০/২৫ শতক জমির উপর। এরূপ অগণন আবাসন, তারা যখন দিনের বেলায় রাস্তায় নেমে আসে, তখন দাঁড়ানোর স্থানটুকু থাকেনা। কেবল ঠেলাঠেলি, কোলাকুলি এবং যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা। তাই কুমিল্লা শহরবাসী অতিষ্ট হয়ে জেগে উঠেছে।
তারা কী চায়, তারা চায় বাসোপযোগী একটি সুন্দর পরিবেশ, আর প্রাকৃতিক পরশ। সমস্যা কি কুমিল্লা শহরের ?
১. যানজট। ২. জলাবদ্ধতা। ৩. স্বাভাবিক চলাফেরার প্রতিবন্ধকতা। ৪. চলাচলের রাস্তার উপর দোকানপাট। ৫. পয়:নিষ্কাশনের জন্য নর্দমা বা ড্রেন না থাকা। ৬. যত্রতত্র বর্জ্য পড়ে থাকা। ৭. ভাঙা রাস্তাঘাট। ৮. পানোপযোগী জলের সংকট। ৯. অবৈধ ভূমি দখল করে ক্ষমতার দাপটে শক্তি প্রদর্শন। ১০. সাধারণ নাগরিকদের প্রতি অবহেলা। ইত্যাদি।
সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন- আমরা যাব কোথায় ? আর যারা এই শহরে বসবাস করছেন, তাদের তো তাড়ানো যাবে না, আবার বাইর থেকে এসে যারা শহরবাসী হয়েছেন, তাদেরকে কীভাবে গ্রহণ করতে পারি- তাও তো ভাবতে হচ্ছে। এভাবে তো চলতে পারে না। তাই শহরবাসীর প্রথম দাবি হচ্ছে- কর্তারা আমাদের বাঁচাতে দিন আমাদের থাকতে দিন, আমাদের নি:শ^াসটুকু ফেলতে দিন, গাছের ছায়ায় বসতে দিন, পুকুর পাড়ে বিশ্রাম নিতে জায়গাটুকু দিন। কিন্তু পুকুর তো নেই, গাছও নেই। ছায়া পাবো কোথায় ? ছায়া পাবো গাছের নীচে। গাছ পাবো কই ? গাছ লাগান, পরিচর্যা করুন। ছায়া মায়া বাড়ায় মানুষের মিলনক্ষেত্র তৈরি করে। মান্না দে গেয়েছেন ‘আমায় বসতে একটু দাও তোমার চরণ তলে।’ কুমিল্লা শহরবাসীর নাগরিক হিসেবে ন্যূনতম সুবিধা আছে কি ? এ বিষয়ে বলতে হলে ইতিহাসকে টেনে আনতে হবে। পঞ্চাশ বছর আগেও কুমিল্লা শহর ছিল আধুনিক গ্রামের আদলে সাজানো-গুছানো জনপদ। অধিকাংশ মানুষ হেঁটে চলাফেরা করত, গাড়ি বা যানবাহনের আধিক্য ছিল না। মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যাই বেশি। একমাত্র কলেজ ভিক্টোরিয়া কলেজ যদি দুটি থাকত, গ্রামের ছেলেরা বাড়িতে চলে যেত, শহরটি ফাঁকা ফাঁকা। শহরের রাজধানী কান্দিরপাড় যেন জনশূন্য। বাজার বলতে পূর্বাংশে রাজগঞ্জ বাজার, পশ্চিমাংশে রানির বাজার, নিউমার্কেট তখন তেমনভাবে বসত না। শুধু সকাল বেলায় মাছ আর তরিতরকারি বরুড়া থেকে কিছু লোক সবজি নিয়ে আসত। কুমিল্লা শহরে মাছ আসত দাউদকান্দি ও হাজীগঞ্জ থেকে। কোম্পনিগঞ্জ থেকেও তাজা মাছ আসত। সারাদিনের জন্য বাজার ছিল না। ১০/১১টার মধ্যে কাঁচা বাজারে বিকিকিনি। অসময়ে অতিথি আগমন ঘটলে ইচ্ছেমতো জিনিস পাওয়া যেতো না। এটা স্বপ্ন নয়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ আস্তে আস্তে শহরমুখী হতে শুরু করল। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা উন্নত জীবন উপভোগের জন্য শহরবাসী হওয়া। গ্রামের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আসত। শুধু শহরে আস্তানা এবং ক্রমান্বয়ে গ্রাম অবহেলিত হতে হতে এখন আর কেউ গ্রামে যেতে চায় না, থাকতে চায় না। আবাসনটুকুও ক্ষীণকায়, একসময় মুছে ফেলে শহরবাসী। চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটির কথা ভুলে গিয়েছে, গ্রামে বাড়ি ছিল, পুকুর/দিঘি ছিল বনজঙ্গল ছিল, ছোট ছোট ডোবা ছিল, ফলফলাদির গাছগুলো বাড়ির চারদিকে দাঁড়িয়ে থেকেছে। এখন তা উধাও। যা হারিয়ে গেছে তা তো আর পূর্বাবস্থায় আনা যাবে না। তবে সময়ের দাবিতে এখনও শহরটি সাজানো সম্ভব। আমি কুমিল্লা শহরে একজন ৬৫/৬৬ বছরের বাসকরা অধিবাসী। যা দেখেছি এবং যা দেখছি তার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান এবং সবই দৃশ্যমান। সবকিছুই যে এলোমেলো তা বলছি না, কিন্তু পরিবর্তনের ধারায় যতটুকু বদলানো যায়। এ নিয়ে আমার কিছু কথা।
শহরের মধ্যে জেলা প্রশাসনের অফিস, পুলিশ প্রশাসনের অফিস, নগরভবন, জেলা পরিষদ এবং বিচারিক কোর্ট বা আদালত অবশ্যই থাকবে। তা কোনো অবস্থায় স্থানান্তরিত করা যাবে না। বরং প্রয়োজনবোধে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। শহরের উপকন্ঠে রেজিষ্টার ও সাব রেজিস্টার অফিস স্থানান্তরিত করা যেতে পারে। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বৎসরে এলাকাভিত্তিক স্কুল ছুটির সময়ে স্কুলে বসে খাজনা আদায় করা যেতে পারে। এছাড়া আয়কর অফিস যথাস্থানে থাকতে পারে।
কিন্তু শহরের মধ্যে জেলখানা থাকবে না, স্টেডিয়াম থাকবে না। যে স্টেডিয়ামটি আছে তা ইনডোর খেলাধুলার জন্য নানাভাবে নান্দনিক ও আকর্ষণীয় করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম শহরের বাইরে নির্মাণ করতে হবে। যানজট কমানের জন্য কান্দিরপাড়ে মসজিদ সংশ্লিষ্ট দক্ষিণাংশের দোকান পাট যা মূল নক্সায় ছিল না তা ভেঙে দিতে হবে, টাউনহল মার্কেট থাকবে না, বাদুরতলায় রাস্তার উপর সিটি কর্পোরেশনের দোকানপাট রেস্তোরা থাকবে না। যাদের এখানে ব্যবসাপাতি আছে, লিবার্টি চত্বরে হাইরাইজিং পরিকল্পিত মার্কেট করে তাদেরকে পুনর্বাসিত করে দিতে হবে। মারোয়ারি উত্তমক্ষেত্রীর বাড়ির জায়গাটি ও তার মালিকানাধীন রূপকথা সিনেমাকেন্দ্রিক দোকানপাট ভেঙে সামনের রাস্তা প্রশস্ত করে স্থাপনা করে বর্তমানে যারা আছেন, তাদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুনদের সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে।
রাজগঞ্জ বাজার ভেঙ্গে মাটির নীচে অর্ধেক পার্কিং এবং অর্ধেক গোডাউন। ১ম তলা কাঁচা বাজার, দ্বিতীয় তলা মনোহারি ও সাধারণ জিনিসের দোকান, ৩য় ও চতুর্থ তলা ব্যাংক-বীমা-অফিস ইত্যাদি পঞ্চতলা কমিউনিটি সেন্টার, ছয় তলা থেকে দশতলা পর্যন্ত আবাসন, তদ্রুপ রানিরবাজারকে সাজানো যেতে পারে। নোনাবাদের স্থাপনা শহরের বাইরে সুবিধাজনক জায়গা স্থানান্তরিত হবে, চিস্তিয়া মিল এলাকা যদি বিভাগ হয়, তবে কমিশনারের আবাসনসহ অফিস হতে পারে, পুলিশ লাইনে থাকবে ডিআইজি অফিস।
পয়:নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনগুলো প্রশস্থ করতে হবে, তাদের দখলকৃত জায়গা অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মূল অংশটি যা শহরের রানির দিঘির পশ্চিমপাড়ে অবস্থিত, এখানেই পুরাতন ভবনগুলো ভেঙে পূর্ণাঙ্গ কলেজ করতে হবে। এ কলেজের সঙ্গে নিউ হোস্টেল ও চর্থার শেরে বাংলা ছাত্রাবাস থাকবে। দরকার বোধে রানির দিঘির পূর্বপাড়ের ফুলার হোস্টেলটি কলেজের ছাত্রাবাস হিসেবে বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে।
শহরের বাইরে ডিগ্রি কলেজটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ^বিদ্যালয় হিসেবে স্থাপন করতে হবে। আমি ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র ও শিক্ষক ছিলাম। রানির দিঘির পাড়ের কলেজটিকে ভিক্টোরিয়া কলেজ বলে, আর ধর্মপুরের ডিগ্রি শাখাকে ডিগ্রি কলেজ বলে। বিষয়টি সরকার অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভেবে দেখতে পারেন। যানজট কমানোর জন্য ফুটপাত মুক্ত রাখা এবং বাসস্ট্যান্ডগুলো শহরের বাইরে রাখা, ভারি যানচলাচল শহরে দিনের বেলায় চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা দেয়া, পুরাতন গোমতী নদীকে পর্যটনের আদলের সাজানো, দক্ষিণে ডাকাতিয়া নদীকে প্রশস্ত করে শহরের জলাবদ্ধতা দূর করা, ইপিজেটের জন্য বিমানবন্দরকে চালু করা,একমাত্র সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি মানবিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে আধুনিককরণ করা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহে রাজনৈতিকের অংশগ্রহণ থাকলে তৎসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করা জরুরি। মা-বাবাই সন্তানের দু:খকষ্ট বুঝে এবং সমাধান করতে পারে। তদ্রুপ শুধুমাত্র নিজের অবস্থানকে রং পাল্টিয়ে সকলকাজে সংশ্লিষ্ট থেকে শহরবাসীকে প্রতারিত করার সুযোগ দেয়া যাবে না। আমি বা আমরা সবই বুঝি, দেখি এবং তাদেরকে চিনি।
ছোট্ট একটি ঘটনার কথা বলেই মনের ক্ষোভটা শেষ করতে চাইছি। আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় হাজী ইয়াছিন সাহবেকে অনুরোধ করে কুমিল্লা ক্লাবে চা খেতে বসলাম। প্রস্তাবনাটি ছিল আমার, কবি নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীর সমাপনী অধিবেশনে। দু:খের সাথে বলতে হয় কতিপয় অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি আগেও এবং এখনও অথবা সবসময় পেছনে পেছনে এসে এমনভাবে কথা বলতে থাকেন, চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। এমনটি ঘটছে ২৫ মে ২০২৬ সালের সন্ধ্যায়। যে কথাগুলো মন্ত্রীমহোদয়কে বলতে চেয়েছিলাম, একটি আলুরচপ খেয়েই চলে এলাম। এখন প্রশ্ন- তারা কারা ? তারা হলো সর্বক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত স্বঘোষিত মাতাব্বর। অবস্থাটা হলো- লুঙ্গীতে আগুন লাগলে খুললেও বিপদ, পরা থাকলেও বিপদ। সমাজে এমন সব লোক রয়েছে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও বিপদ, না রাখলেও বিপদ। এক্ষেত্রে শুধু বলতে পারি- সাধু সাবধান।
এ লেখায় কোনো কিছু পরিবর্তন হবে কীনা জানি না, বদ্ধজলাশয়টি মনের ডোবা থেকে স্বাভাবিক স্রোতে মিশিয়ে দিলাম। এতে কষ্ট থাকলে স্বস্তি পেলাম। শেষকথা মাননীয় মন্ত্রী, শচীনকর্তার বাড়ির আঙিনা থেকে কি হাঁসমুরগীর অফিস স্থানান্তরিত করা যায় না ? আপনি তো পশুসম্পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক। আরও কিছুকথা রলো। সুযোগ পেলে একান্তে বলতে চাই। সে সুযোগ কি পাবো ? বলে রাখি- কথাগুলো শুধুমাত্র কুমিল্লা শহরকে বাঁচাতে ও সাজাতে। এতটুকু।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
অভিষেকেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখল কেপ ভার্দে
দেশজুড়ে দুই হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের ঘোষণা কৃষিমন্ত্রীর
এক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে ডুবল কুমিল্লা নগরী
দেবিদ্বারে নতুন ইউএনও অশোক বিক্রম চাকমা’র যোগদান
কুমিল্লায় শ্রেষ্ঠ মাদক উদ্ধারকারী ওসি ফারুক হোসেন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
চান্দিনায় অন্তত চার হাজার মানুষ বেকার হওয়ার সম্ভাবনা
কুমিল্লায় দুই মাসে ২৭ খুন, ১০৫ জনের অপমৃত্যু
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিলেন উদবাতুল বারী আবু
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর
“আমরা জুলাই যোদ্ধা” কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২