
কুমিল্লা শহরের পরিচিত গলি, ঠাসা যানজট, সরু ফুটপাত এসব দেখে কেউ ভাবতেই পারেন না যে এই শহর একদিন মেট্রোপলিটন অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। পৃথিবীর বড় বড় শহর একদিন ঠিক এরকমই ছিল, বিশৃঙ্খল, কেন্দ্রমুখী, পরিকল্পনাহীন। যেদিন থেকে তারা ভবিষ্যতের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে, সেদিন থেকেই তাদের রূপান্তর শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নতুন নগর ভবনের অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে, সেটি আপাতদৃষ্টিতে স্থানীয় একটি প্রশাসনিক প্রশ্ন মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে নগর পরিকল্পনার একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন: একটি শহরকে কি তার অতীতের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে, নাকি তার ভবিষ্যতের জন্য?
প্রশ্নটি ব্যক্তির নয়, প্রজন্মের
কুমিল্লার নগর ভবন কোথায় হবে এটি কোনো ব্যক্তি, পদ বা অহংকারের প্রশ্ন নয়। এটি কুমিল্লার আগামী ৩০, ৫০ বা ১০০ বছরের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দুঃখজনকভাবে, অনেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই বুঝেছে যে একটি শহরকে টেকসই, বাসযোগ্য ও কার্যকর রাখতে হলে প্রশাসনিক ও সেবামূলক কার্যক্রমকে পরিকল্পিতভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হয়।
কুমিল্লা-৬ সদর আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী নগর ভবনটি ভবিষ্যতের শহরের ভৌগোলিক পরিধি, জনসংখ্যার সেবা ঘনত্ব এবং সম্প্রসারণ সম্ভাবনা মাথায় রেখে আরও বৃহৎ আকারে ও উপযুক্ত স্থানে নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন, যাতে কুমিল্লার সকল এলাকার মানুষ সমান সেবা পায়। এই অবস্থান অনেকে সমর্থন করেছেন, কেউ বিরোধিতাও করেছেন। কিন্তু এটিকে শুধু ব্যক্তিগত অহংকার বলে উড়িয়ে দেওয়া বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে তিনি কুমিল্লার আগামী কয়েক দশকের কথা ভেবেই মতামত দিয়েছেন। এটাই অধিকতর যৌক্তিক ব্যাখ্যা।
কুমিল্লার বাস্তবতা: সংখ্যা যা বলছে
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী কুমিল্লার নগর জনসংখ্যা ৬ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার গড়ে ৩.৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ আগামী দুই দশকে কুমিল্লার নগর জনসংখ্যা কার্যত অনেক বেড়ে যেতে পারে। অথচ কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন মাত্র ৫৩.৮৪ বর্গকিলোমিটার।
বর্তমান শহরকেন্দ্র যানজট, সীমিত জায়গা এবং অবকাঠামোগত চাপের মুখে রয়েছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলে এই চাপ আরও বাড়বে। তাই পর্যাপ্ত জায়গা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক পার্কিং সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ বিবেচনা করে নগর ভবনের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। বরং এটি একটি দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী চিন্তা।
বিশ্বের পাঠ: যখন খোলা জমি হয়ে ওঠে মহানগরী
পৃথিবীজুড়ে একটি প্রবণতা স্পষ্ট। যে শহরগুলো ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রশাসনিক কেন্দ্রের বিকেন্দ্রীকরণ করেছে, তারাই আজ সবচেয়ে সফল ও বাসযোগ্য।
দক্ষিণ কোরিয়া তার রাজধানী Seoul-এর অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও জনসংখ্যার চাপ কমাতে Sejong City গড়ে তুলেছে। ২০০৫ সালের বিশেষ আইনের ভিত্তিতে ২০০৭ সাল থেকে নির্মাণ শুরু হওয়া এই শহরে কেন্দ্রীয় সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রণালয় স্থানান্তরিত হয়েছে এবং এটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে সফল পরিকল্পিত শহরগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া, ব্রাজিলের ঐতিহাসিক শহর Rio de Janeiro-র পরিবর্তে পরিকল্পিত শহর Brasília-কে প্রশাসনিক কেন্দ্র করেছে। মালয়েশিয়া, কুয়ালালামপুরের বাইরে Putrajaya গড়ে তুলেছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার অতিরিক্ত জনঘনত্ব ও যানজটের চাপ কমাতে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী Nusantara নির্মাণ করছে। মিশর তার রাজধানী কায়রোর বাইরে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী গড়ে তুলছে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনা করে।
এমনকি ডেনমার্কের মতো বিশ্বের অন্যতম পরিকল্পিত দেশও রাজধানী কোপেনহাগেন কেন্দ্রিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও হাজার হাজার সরকারি কর্মসংস্থান দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দিয়েছে। ডেনমার্কের পাবলিক সেক্টর বিশ্বের সবচেয়ে বিকেন্দ্রীভূত পাবলিক সেক্টরগুলোর একটি। মোট সরকারি ব্যয়ের অন্যতম বৃহৎ অংশ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ব্যয় হয়। এই দর্শনের ভিত্তি হলো: যে কাজ স্থানীয়ভাবে করা সম্ভব, সেটি স্থানীয় পর্যায়েই হওয়া উচিত।
"তারা কি এসব সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির অহংকারের জন্য নিয়েছে? অবশ্যই না। তারা নিয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে এবং নাগরিক সেবাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে।"
Ballerup-এর গল্প: আমার চোখে দেখা রূপান্তর
আমি আগে ডেনমার্কের রাজধানী সেন্ট্রাল কোপেনহাগেনে থাকতাম। ২০২৪ সালে কর্মসূত্রের সুবিধার জন্য কোপেনহাগেনের বর্ধিত অংশ বেলারুপে চলে আসি। সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে অনেকে আমাকে বলেছিলেন, "বেলারুপ তো সেন্ট্রাল কোপেনহাগেনের বাইরে? সেখানে কী আছে?" আজ সেই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজের চোখে দেখেছি।
বেলারুপ কোপেনহাগেনের এক্সটেনশন হয়ে আজ বৃহত্তর কোপেনহাগেন অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিল্পকেন্দ্র। এখানে রয়েছে Microsoft, Ericsson, Novozymes এর মতো আরও বহুজাতিক কোম্পানির কার্যালয়, ওষুধ শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠান, পণ্য পরিবহন সংস্থা এবং বিস্তৃত শিল্প এলাকা। আছে ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় DTU এর একটি ক্যাম্পাস। কোপেনহাগেনের ঐতিহাসিক কেন্দ্রের বাইরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এটি আজ মহানগরীয় অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ।
কিন্তু সব সময় এমন ছিল না। কয়েক দশক আগে যেখানে মূলত আবাসিক এলাকা আর সাধারণ জমি ছিল, সেখানে আজ শহরতলির দ্রুত ট্রেন সংযোগ, প্রশস্ত সড়ক এবং হাজারো কর্মজীবী মানুষের ব্যস্ত উপস্থিতি। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় আজ সারাদিন গাড়ি রাখার সুবিধা, নির্মাণাধীন নতুন ভবন এবং সুপরিকল্পিত যানচলাচল ব্যবস্থাপনা। পৌর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা তৈরি করেছে যেখানে আগামী বহু বছরের বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সেবার চাহিদা আগেই হিসেব করা আছে।
নগর পরিকল্পনার শক্তি আমি নিজের চোখে দেখেছি। একটি বাইরের পৌরসভা কীভাবে কৌশলগত প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত হয়। কোপেনহাগেন যদি তার ঐতিহাসিক কেন্দ্রকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকত, তাহলে Ballerup, Glostrup বা Taastrup কখনো প্রধান বাণিজ্যিক শহরে পরিণত হত না। বরং কোপেনহাগেনের কেন্দ্র আরও বেশি যানজট, আবাসন সংকট ও সেবার চাপে ভুগত।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশের মাঝে নিয়মিতই প্রথম ও দ্বিতীয়তে থাকা ডেনমার্ক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে: জনসংখ্যা বাড়লে যানবাহন বাড়ে, সেবার চাহিদা বাড়ে, শহরের কেন্দ্র যানজটে আটকে যায়। তাই সমাধান হলো বিকেন্দ্রীকরণ, নতুন এলাকায় বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই একই যুক্তি কুমিল্লার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
ঐতিহ্য মানে স্থবিরতা নয়
কেউ কেউ বলছেন "আদি কুমিল্লা"র কথা, যেন নস্টালজিয়াই নগর পরিকল্পনার প্রধান মানদণ্ড। কিন্তু নগর পরিকল্পনার একটি মৌলিক নীতি হলো: ঐতিহাসিক গুরুত্ব মানেই ভবিষ্যতের উপযোগিতা নয়।
ময়নামতি, শালবন বিহার, ধর্মসাগর, ভিক্টোরিয়া কলেজ এসব কুমিল্লার গর্বিত ঐতিহ্য। একটি প্রশাসনিক ভবনের বর্তমান অবস্থান কুমিল্লার পরিচয় নয়। শহরের পরিচয় তৈরি হয় তার সংস্কৃতিতে, তার মানুষে, তার ইতিহাসে। কোনো একটি ভবনের ঠিকানায় নয়।
সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা Lee Kuan Yew-এর অনেক দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও নগর পরিকল্পনা একসময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কিন্তু তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে ভবিষ্যৎকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আজ সেই সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম সফল, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত নগররাষ্ট্র। ইতিহাসের শিক্ষা হলো: বড় সিদ্ধান্তগুলো সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। অধিকাংশ মানুষ বর্তমানের বাস্তবতা দেখেন, দূরদর্শী নেতৃত্ব দেখে ভবিষ্যতের প্রয়োজন।
নগর ভবনের অবস্থান: যে প্রশ্নগুলো জরুরি
একটি ক্রমবর্ধমান শহরের প্রশাসনিক কেন্দ্র কোথায় হওয়া উচিত, এই প্রশ্নের উত্তর কেবল "আগে কোথায় ছিল" দিয়ে হয় না। বরং প্রশ্ন করতে হবে: ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ সম্ভব কিনা, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা থাকবে কিনা, সড়ক যোগাযোগ কতটা সহজলভ্য, যানজট এড়ানো সম্ভব কিনা, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের নাগরিক চাপ সামলানো যাবে কিনা এবং সর্বোপরি কুমিল্লার সব উপজেলার মানুষের কাছে সমান সেবা পৌঁছানো সম্ভব কিনা।
এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হলো দায়িত্বশীল নগর পরিকল্পনা। আজ যারা শুধু ধানক্ষেত দেখছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে পৃথিবীর অনেক আধুনিক শহর, প্রশাসনিক কেন্দ্র ও উন্নয়ন প্রকল্প একদিন ঠিক এমন খোলা জমির ওপরই গড়ে উঠেছিল। দূরদর্শী চিন্তার মূল্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। সময়ই শেষ পর্যন্ত তার মূল্যায়ন করে।
মতভেদ হোক যুক্তির ভিত্তিতে, আক্রমণের নয়
মতভেদ থাকতে পারে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই মতভেদ হোক তথ্য, যুক্তি এবং নগর পরিকল্পনার ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত আক্রমণের ভিত্তিতে নয়। যারা বিরোধিতা করছেন, তারাও বিকল্প প্রস্তাব রাখুন: কোন জায়গা আরও উপযুক্ত? কী কারণে? সেখানে কি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ আছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলে বিতর্ক হবে ফলপ্রসূ এবং কুমিল্লার মানুষ পাবে একটি সত্যিকারের জনমুখী সিদ্ধান্ত। সবাই আজকের কুমিল্লা দেখেন। দূরদর্শীরা ২০৫০ সালের কুমিল্লাও দেখতে পান। কুমিল্লা আমাদের সবার। তাই সিদ্ধান্তও হওয়া উচিত কুমিল্লার আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে, আজকের আবেগকে নয়।
লেখকঃ
চৌধুরী সাদেকা মুনীর
লিড শিক্ষিকা, মন্টেসরি ও ইনক্লুসিভ এডুকেশন
ইন্টারন্যাশনাল মন্টেসরি স্কুল
কোপেনহাগেন, ডেনমার্ক
ইমেইলঃ chowdhurysadekam@gmail.com
