রোববার ১৪ জুন ২০২৬
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবাসরীয়...
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ১২:৫২ এএম আপডেট: ১৪.০৬.২০২৬ ১:২৫ এএম |

রবিবাসরীয়...











নতুন ফল

রবিবাসরীয়...তে-পিং চেন ।।

এক আজব ফল এসেছিল শহরে: কমলা-লাল তাম্রবর্ণ খোসা, ভেতরের শাঁস ঘন, মখমলি, বিলাসবহুল। ডিম্বাকৃতি, ভেতরে ক্ষুদ্র হলুদ বিচি, গাঢ় সবুজ পাতা বিছানো কাঠের পেটিতে ভরে বিক্রি হতো। ফলের স্বাদ ছিল বিরল। মিষ্টির তলায় একটু টক। কিনতে আমরা কয়েক ব্লক লম্বা লাইন দিতাম। একে অপরকে একটু চেখে দিতাম, যদিও তাতে তৃপ্তি হতো না কখনো। কারণ প্রত্যেকের কাছে এর অনুভূতি ছিল আলাদা। এটার স্বাদ যদি আমার কাছে সবুজ ফুলদানিতে সদ্য সাজানো সূর্যমুখীর মতো লাগে, তবে তোমার কাছে হয়তো লাগবে করিডোরে মোজা পায়ে দৌড়ে চলা মেয়ের ছোট্ট পায়ের আওয়াজের মতো। লাও ঝৌয়ের কাছে এর স্বাদ ছিল নিজের বানানো বেঞ্চে বার্নিশ লাগানোর মুহূর্তের ঘ্রানের মতো। ঝু আয়ির মনে হতো সে বুঝি শৈশবে ফিরে গেছে। মায়ের ভাত রান্নার গন্ধ আর বাইরে বৃষ্টির শব্দের যুগল স্বাদে তার জিভ ভরে উঠতো। কেউ কেউ আবার এমন স্বাদও পেতো যেখানে ঈর্ষা এবং প্রশংসার চাহনি মিশে যেতো; অনেকটা এরকম যখন লোকে তরুণ ও সুন্দর থাকে, আর গায়ে থাকে মানানসই একটা নতুন পোশাক।
ফলটি একদিন শহরের পাইকারি বাজারে ট্রাকে এসে পৌঁছায়। পেটিতে লেখা ছিল- ‘উৎপাদক: সানশান গ্রুপ।’ শুরুতে শুধু ফেরিওয়ালারা বেচতো। কিন্তু শীঘ্রই মুদিখানাগুলোও বিক্রি শুরু করলো। ফলটির নাম দেওয়া হলো ‘অদ্ভুত ফল চিগুও।’
পাড়ায় প্রথম চিগুও চেখেছিল লাও ঝৌ, বিপত্নীক হাতুড়ে মিস্ত্রি। এপ্রিলের এক সকালে বারোটা ফল কিনে ফিরে যাকে সামনে পেলো হাতে গুঁজে দিলো। পাং আয়ি প্রথম কামড়েই গালে নরম গোলাপি আভা ছড়িয়ে বললো, ‘আহা, কী সুস্বাদু।’ মুহূর্তটায় একটা অন্তরঙ্গতা ছিল। যদিও পাং আয়ি ছিল পাড়ার চিরচেনা সেই গপ্পোবাজ মহিলা যে সামাজিক শৌচাগারে সাঁটিয়ে বসে আড্ডা মারতো।
সেই বসন্তে চিগুও আমাদের বদলে দিলো। শীতের হাড়কাঁপানো মাসগুলোর চিরাচরিত ফাটা ঠোঁট, বাঁধাকপির রান্না, কোটের কলার তুলে পরস্পরকে পাশ কাটানোর পর রোদ হঠাৎ উষ্ণ লাগতে শুরু করলো। আমরা রাস্তায় পরস্পরের চোখে চোখ মেলাতে লাগলাম। হাসতে লাগলাম প্রাণখুলে। মিস্টার ফেং চিগুও খেয়ে নিজে থেকে বাড়ির লোহার সদর দরজা ঠিক করতে গেলেন, কারণ প্রথম তলার বৃদ্ধা ভারী দরজাটা খুলতে না পেরে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন প্রায়ই, যতক্ষণ না অন্য কেউ এসে ভেতরে ঢুকতো। ঝু আয়ির ছেলে কারখানার চাকরি ছেড়ে চিত্রকর হতে দক্ষিণে চলে গেলো। চিগুও খেয়ে আর্দ্র রুপালি ও সোনালি সূর্যাস্তদেখেছিলো সে। এর পরপরই চিত্রকর হবার অবদমিত ইচ্ছাটা জেগে উঠলো তার, আর মনে হলো সুর্যাস্তটি ক্যানভাসে ধরে রাখা উচিত। লাও ঝৌ হাতুড়ি ঠোকার সময় গান গাইতে লাগলো। তার রক্তেও দীর্ঘকাল ঘুমিয়ে থাকা এক অস্থিরতা তাকে উত্তেজিত করে তুললো। প্রথমবারের মতো মনে হলো তার যে সে এখনো বুড়ো হয়নি। সে লক্ষ্য করলো পাং আয়ির কোমরের রেখা ঢোলা শার্টের ভেতরেও বোঝা যাচ্ছে। চেনা মুখে একটা তাজা ভাব। পাড়ায় শুধু একজনই ফল ছুঁলো না — পাং আয়ির স্বামী, অবসরপ্রাপ্তরেল পরিদর্শক মিস্টার সান। এই ফলকে তার স্বাভাবিক মনে হলো না। ‘বিশ্বাস নেই’ বলে ফলটি সে দূরে ঠেলে দিলো।
চিগুও উৎপাদক সানশান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফান শিয়িসেই মৌসুমে সর্বত্র সংবর্ধিত হলেন। ছোটখাটো, চামড়া কুঁচকানো বৃদ্ধ, পাশে ফাঁকওয়ালা দাঁতের হাসির স্ত্রী। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ঘোষণা করলো: ‘চিগুও তৃণমূলের উদ্ভাবনী প্রতিভার প্রতীক, আমাদের জাতির নতুন প্রতীক।’ আমরা সিংকের পাশে দাঁড়িয়ে চিগুও খেতাম। থুতনি বেয়ে রস গড়িয়ে পড়তো। ক্লাসে শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের হাতে চিগুও তুলে দিতেন। এমনকি চিগুও খেয়ে স্কুল গেটের রূঢ় দারোয়ানটিও একদিন হাসতে শুরু করলো।
মে মাসের শেষে চিগুও ফলের শেষ ট্রাক এলো। তারপরই ফলটি উধাও। গ্রীষ্মটা ছিল অস্বাভাবিক গরম। দম্পতিরা ঝগড়ায় মত্ত হলো। শিশুরা মায়ের বুকের দুধ নিলো না। কয়েক ব্লক দূরের কারখানায় ষোলো বছরের এক মেয়ে গরম আর অত্যধিক পরিশ্রমে মারা যাবার পর শুরু হলো ধর্মঘট। তবু পাং আয়ি ছিল ব্যতিক্রম। পার্ম করা চুল, উজ্জ্বল রঙের খাটো স্কার্ট, চুলে গোলাপ গুঁজে রাখা। প্রায়ই তাকে আর লাও ঝৌকে বাজারে দীর্ঘ সময় গল্প করতে দেখা যেতো। কখনো কখনো পার্কের জুঁই-ঢাকা পাহাড়ে ডাম্পলিং নিয়ে দুপুরের খাবারও খেতো তারা। সারাটা বছর পাং আয়ি বিশ্বাস রেখেছিলো যে স্বামীকে কিছু বলার দরকার নেই। শুধু বাজারে লাও ঝৌকে একটু দেখা, মাঝেমধ্যে তার জন্য ডাম্পলিং রেখে আসা, সন্ধ্যার ঠান্ডায় একসঙ্গে হাঁটা — এটুকুই যথেষ্ট মনে হয়েছিলো। একদিন অন্ধকারে সে তার কোমর জড়িয়ে ধরেছিলো। তারপর তারা সেইভাবেই হেঁটে বেড়ালো প্রায় আধ মাইল।
শরতে কারিনা ওয়েইয়ের হিট গান ‘মাই সুইট চিগুও’ বাজতে লাগলো শহরের সর্বত্র। গানটা বাজলে ভিড়ের উপর দিয়ে এক ধরনের অতীতচারী আকুলতা বয়ে যেতো। কেউ গুনগুন করে গানটা ধরলে সঙ্গে সঙ্গে আরো কণ্ঠ যোগ হয়ে যেতো। তারপরই গানটার চটুল প্রেমের কথাগুলো অনেক কণ্ঠ মিলে কেমন যেন মর্সিয়া কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো। শীত এলো আবার। সঙ্গে সেই চেনা রুক্ষ চামড়া, গুমোট পরিবেশ, বাঁধাকপির রান্না। ভীষণ এক ঠান্ডা রাতে চতুর্থ তলার বৃদ্ধা নিষ্কাশন যন্ত্র না খুলে কয়লা পোড়ালেন। কার্বন মনোক্সাইডে মারা গেলেন। আমরা বললাম- ‘দূর্ঘটনা।’
পরের বসন্তে চিগুও আবার এলো। এবার শুধু সুপারশপে, ফোমের কলারে মোড়া, দামি বাক্সে ভরা, দাম আগের চেয়ে বেশি। আমরা নাক সিঁটকালাম। কিন্তু সেদিন এক ঘণ্টারও বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে আমরা পরস্পরকে অভিবাদন জানালাম। স্মৃতি বিনিময় করলাম। ‘অবশেষেৃ’ বললাম একে অপরকে। মিস্টার ফেং বললেন, ‘প্রথমবার চিগুও খেয়ে মনে হয়েছিলো পঁচিশ বছর বয়সে ফিরে গেছি।’ ঝু আয়ি জানালো যে তার হুইলচেয়ারবাহী মা চিগুওর সুবাস পেয়ে প্রথমবার উঠানে বেরিয়েছিলেন; এখন প্রতিদিনই বের হন।
কিন্তু পরদিন সকাল থেকে আমরা এমনভাবে মাথা নিচু করে হাঁটতাম যেন কারো চোখে কারো চোখ না পড়ে।
নতুন চালানের চিগুওর স্বাদ একই ছিল প্রায়। সেই ঘন শাঁস, মিষ্টি আর টকের মিশেল। কিন্তু এবার অনুভূতিগুলো ছিল অন্ধকার আর বেসুরো। আবেগ উথলে এলো পেটের পীড়ার মতো। মিস্টার ফেং ফল খেয়ে বমির ঢেউয়ে মাথা বাহুতে ডুবিয়ে দশ মিনিট বসে রইলো। তার মনে পড়ে গেলো বহু বছর আগে বোকা টুপি পরানো এক বৃদ্ধকে সহপাঠীরা মিলে মাটিতে লুটিয়ে পড়বার আগ পর্যন্ত মেরেছিলো। পুরনো স্মৃতির তীব্রতায় ঝু আয়ি ডুবলো এমন তীব্র লজ্জায় যে দৃষ্টি তার ঝাপসা হয়ে গেলো। তার মনে পড়লো যে সে একবার তার ছেলেকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলো। মনে পড়লো যে সে নিজেকে একবার প্রায় রান্নার চুলায় পুড়িয়ে ফেলেছিলো। শাশুড়িকে মেঝেতে পড়া মাছ খাওয়ানোর কথাও মনে পড়লো। আর লাও ঝৌ বসে রইলো একেবারে স্তব্ধ হয়ে। চোখ বুজলেই সে দেখতে পাচ্ছে গলায় ‘বুর্জোয়া’ সাইনবোর্ড ঝোলানো তার বাবা জনতার সামনে হাঁটু গেড়ে বসা। তিনি ছিলেন একজন ক্যালিগ্রাফার। পাথর মেরে তাকে হত্যার কয়েকদিন পর কবরে শেষবার দেখার স্মৃতি তাজা হয়ে উঠলো। এই অবস্থায় লাও ঝৌ দু'দিন বাইরে গেলো না।
আমরা একে অপরকে মিথ্যা বললাম। আমরা বুঝতে পারলাম যে এতসব যা কিছু ঘটছে সেগুলো আসলে নতুন চালানের চিগুও ফলের প্রভাব। তা সত্ত্বেও আমরা এই তথ্য একে অপরের কাছে লুকালাম। তবুও চিগুও খেতে থাকলাম — একটা ভালো টুকরোর আশায়, প্রথমবারের সেই দুর্দান্ত স্বাদের টানে।
শীঘ্রই সংবাদপত্রে শিরোনাম এলো। সারাদেশে অদ্ভুত ঘটনা ভেসে বেড়াচ্ছিলো। এক ছাত্র স্কুলের ছাদ থেকে লাফ দিলো। এক ব্যবসায়ী সম্পদের অর্ধেক দান করে দিলেন চোখ মুছতে মুছতে। টেলিভিশনে ফান শিয়ি বললেন অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে মাটিতে অম্লতা বেড়েছে, যদিও তার কথায় বিশেষ জোর ছিল না। তাঁর স্ত্রী আর ক্যামেরায় আসছেন না। সুপারমার্কেটে ছাড় পড়লো: অদ্ভুত ফল, অর্ধেক দামে।
আমাদের পাড়ায় সবচেয়ে বেশি বদলে গেলো পাং আয়ি। পার্ম করা চুল রুক্ষ হলো, মুখে কুঞ্চন, চোখে বিব্রত দূরত্ব। রান্নাঘরে চিগুও কাটতে কাটতে তার এমন লজ্জার ঢেউ উঠলো একদিন যে কোনোরকম টেবিলের পায়া ধরে সামলে নিলো। তারপর ছুরিটা ছুঁড়ে দিয়ে মেঝেতে বসে সে কী কান্না! স্বামী এসে জিজ্ঞেস করলে লাও ঝৌয়ের সঙ্গে মনের লেনাদেনার ব্যাপারে সে সব খুলে বললো।
কয়েক মিনিটের মধ্যে মিস্টার সান অন্ধের মতো উঠান পার হলো। গায়ে মৌসুমের সঙ্গে বেমানান পুরনো ফেল্টের টুপি। মুখে আচমকা ঘুষি খাওয়া মানুষের মতো বিভ্রান্তি। আমাদের শুভেচ্ছা উপেক্ষা করে কঠিন পায়ে লাল বাতির সিগন্যালেই রাস্তা পেরোতে গেলো সে। আর একটা বেগবান মোটরসাইকেল এসে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো তাকে। নর্দমায় পড়ে থাকা মিস্টার সানের আহত শরীরের দিকে চেয়ে বেড়ে উঠতে থাকলো আমাদের উদ্বিগ্ন কোলাহল।
এরপর থেকে আমরা ধীরে ধীরে একে অপরের দুঃখের ভূগোল চিনলাম। ঝু আয়ি জানালো তাঁর প্রথম সন্তান মৃত জন্মেছিলো এবং এই বিশ বছর পরেও তার শোক কাটেনি। স্কুলগেটের দারোয়ান স্বীকার করলো মাতাল হয়ে কাউকে রাস্তার পাশে রক্তাক্ত ফেলে চলে গিয়েছিলো সে একবার। লাও ঝৌ গভীর রাত পর্যন্ত বেসুরো গুঝেং বাজানো শুরু করলো। প্রায়ই উঠানে ঘুরঘুর করতো পাং আয়ির জন্যে অপেক্ষায়। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় স্বামী আহত হবার পর পাং আয়ি দিনের পর দিন হাসপাতালে তাঁর পাশে জেগে কাটিয়েছে। তাঁর ফুসফুসে আঘাত লেগেছিলো এবং পাঁজরের তিনটি হাড়ও ভেঙ্গে গিয়েছিলো; এখন তার পুরো শরীরে মোটা প্লাস্টার জড়ানো। তাঁর চোখেমুখে ছিল এক ধরণের বিভ্রান্তি;  মাঝে মাঝেই আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকাতো সে। আর স্ত্রী—যে স্বামীকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাবার সময় ফিসফিস করে ক্ষমা চেয়েছিল—সে এখন স্বামীর বিছানার উল্টোদিকে রাখা ধাতব ফোল্ডিং চেয়ারে চুপচাপ বসে বেশিরভাগ সময় জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এক বিকেলে একজন ধূসর চুলের অচেনা লোক উঠানে এসে অধ্যাপক লাও সংয়ের সামনে হাঁটু গাড়লো: ‘আপনার বাবার মৃত্যুর তিন দিন আগে আমি তাঁকে চাবুক মেরেছিলাম, থুতু দিয়েছিলাম, পুঁজিবাদী কুলাঙ্গার বলে গালি দিয়েছিলাম। তখন তরুণ ছিলাম, এখন বুড়ো। আমি দুঃখিত।’ এমন ঘটনা সারাদেশেই ঘটছিলো হর-হামেশা। দেখা গেলো সে সময়ের পুরনো নিষেধ ভেঙ্গে বৃদ্ধরা রাস্তায় চোখে জল নিয়ে স্মৃতি বিনিময় করছে; যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিণতি সুখকর হয়নি। অনেকেই ক্ষমা করতে পারেনি। স্মৃতিচারণের ফাঁকে চিগুওর টুকরো ভাগ করে খেতে দেখাটাও ছিল এক স্বাভাবিক ঘটনা। সেই মা, যার চুল এক রাতেই সাদা হয়ে গিয়েছিলো, আমাদের শিকারের উপর আমরা যেসব বেল্ট ব্যবহার করেছিলাম, কিংবা যেসব মন্দির আমরা অপবিত্র করেছিলাম—সবই উঠে আসছিল আমাদের স্মৃতিচারণে।
শহীদ দিবসে টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় মহাসমারোহ। নেতারা পালাক্রমে পরিচিত বক্তৃতা করলো: মহান জাতি গড়ার মূল্য, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, ইত্যাদি। কিন্তু সবশেষে যে বৃদ্ধ নেতা মঞ্চে উঠলেন, সিঁড়ি ভাঙ্গতে কষ্ট হলো তাঁর, শহীদ স্মারকের দিকে ফিরে তাকালেন — তারপর হঠাৎ মুখ কুঁচকে গেলো, অশ্রু গড়িয়ে পড়লো মুখের ভাঁজে। ‘আমি দুঃখিত,’ ঘোলাটে চোখে সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন। পুনরায় ‘আমি দুঃখিত’ বলার পরপরই সরাসরি সম্প্রচার অন্ধকার হয়ে গেলো।
পরদিনই সরকার চিগুও নিষিদ্ধ করলো। রাতারাতি ফল বিতানের তাক শূন্য। অদ্ভুত ফল, অর্ধেক দাম’ লেখা সাইনবোর্ডগুলোর জায়গায় বসল ‘পিচ: অত্যন্ত মিষ্টি’ এবং ভাজা বাদামের বিশেষ অফারের বিজ্ঞাপন। সানশান ফার্ম কাঁটাতারে ঘেরা হলো। পুরো বাগান আগুনে পোড়ানো হলো। ফান শিয়ি আর তাঁর স্ত্রী উধাও হয়ে গেলেন। কেউ জানলো না কী হয়েছে তাঁদের। আমরা যারা সুপারশপে ফল খুঁজতে গেলাম, গলিতে গলিতে ঘুরলাম — আমাদের মনে তখন একাধারে বিষাদ ও স্বস্তি।
গ্রীষ্ম এলো। তরমুজের মৌসুম। কিন্তু স্বাদ একদম যাচ্ছেতাই। মিঃ সান হাসপাতাল থেকে ফিরলো। পাং আয়ি আবার পুরনো চপ্পল আর ঢোলা শার্ট পরা শুরু করলো। তার গালগপ্পের মেজাজও বোধহয় ফিরলো কিছুটা। কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়া সেই বৃদ্ধার ফ্ল্যাটটিতে সংস্কারের কাজ চলছে; সম্ভবত পরিবারটি সেটি বিক্রি করার পরিকল্পনা করছিলো। লাও ঝৌ এখন অন্য বাজারে যায়। পাং আয়ির সঙ্গে দেখা হলে দুজন শুধু মাথা নাড়ে। রাতে গুঝেং বাজায়, তবে আগের চেয়ে ভালো।
ইতোমধ্যে শোনা গেছে যে সরকার নাকি চিগুওয়ের নতুন একটি জাত তৈরি করছে — উৎকৃষ্ট স্বাদের এবং যার প্রভাব হবে আরো কার্যকর। এর মিষ্টত্বও নাকি বৃদ্ধি পাবে আর পাওয়া যাবে সব মৌসুমেই। বিশেষত শীত যখন জেঁকে বসে, আমরা এটা চেখে দেখার জন্যে অধীর অপেক্ষায় থাকি।
অনুবাদঃ কায়সার হেলাল। 
ৎধংশড়ষহরশড়া.ুুঁ@মসধরষ.পড়স


গল্পকার সম্পর্কে:
চীনা অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী তে-পিং চেন ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে বড় হয়েছেন এবং ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন। ফুলব্রাইট ফেলো হিসেবে চীনে এক বছর কাটানোর পর ২০১২ সালে তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে যোগ দেন। বেইজিং ও হংকং প্রতিনিধি ছিলেন একসময়। বর্তমানে তিনি ফিলাডেলফিয়ায় শ্রম ও কর্মসংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিবেদক।
দীর্ঘ সাংবাদিকজীবনে চীনকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি উপলব্ধি করেন শিরোনামের ভাষা বহুক্ষেত্রে মানুষের গভীরতাকে ধারণ করতে পারে না। সেই অপূর্ণতাই তাঁকে কথাসাহিত্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাঁর ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে দ্য নিউ ইয়র্কার, গ্রান্টা ও টিন হাউসের মতো প্রথমসারির সাহিত্যপত্রিকায়।
২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পসংকলন ‘ল্যান্ড অব বিগ নাম্বার্স’ সাহিত্যজগতে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সংকলনটি আধুনিক চীনের একটি সাহিত্যিক প্রতিরূপ। প্রতিটি গল্প যেন জাতীয় বাস্তবতার আয়নায় প্রতিফলিত রুপক। বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার মধ্যে অনায়াসে যাতায়াতকারী এই গল্পগুলো এমন এক জনগোষ্ঠীর ছবি তৈরি করে যারা সীমাবদ্ধতার ভেতরে নিজেদের জন্যে একটুখানি মুক্তির পথ খুঁজছে। তাঁর পূর্বপুরুষের শিকড়ও সাহিত্যেই প্রোথিত- তাঁর প্রপিতামহ ছিলেন চীনের গুয়াংশি প্রদেশের একজন কবি ও সাংবাদিক।



স্বজন বিয়োগে রবীন্দ্রনাথ

রবিবাসরীয়...খলিলুর রাহমান শুভ্র ।।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে কোন গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন নেই। তবুও লেখার শুরুতে বুদ্ধদেব বসুকে দাঁড় করালাম। যিনি অকপটে বলেন, “রবীন্দ্রনাথের সম্মুখীন হবার দ্বিতীয় বিপদ তার সর্বমুখিতা।” সংস্কৃত শাস্ত্রের যে কথাটি “কবিনাং কবিতমঃ। রবীন্দ্রনাথের জন্য তা যোগ্য বয়ান। কোনো অভিধায়ই তাঁকে সমগ্র ধারণ করে না। ৮০ বছর ৩ মাস ০১ দিনের জীবনে রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিয়েছে উজাড় করে যা না পেলে আমাদের দীনতা ঘোচতনা কিছুতেই। কিন্তু ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের জীবন ছিল অবর্ণনীয় শোক ও স্বজন বিয়োগের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। এই স্বজন হারানোর যন্ত্রনা তাঁর সাহিত্য কর্মে ফেলেছে গভীর ছাপ-
১৮৭৫ সালে রবি ঠাকুরের বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর (কিছু সূত্রে ১৩ বছর ১০ মাস) তখন তার মা সারদাসুন্দরী দেবী মারা যান। ১৫ সন্তানের জননী সারদা দেবীর বয়স তখন ৪৯ বছর। মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হয়ে তিনি ঠাকুর পরিবারে প্রবেশ করেছিলেন মাত্র ছ' বছর বয়সে। সারদা দেবী পানিহাটির বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানেই ঘটল প্রাণনাশী চরম অঘটন। লোহার-বড় সিন্দুক থেকে বই বের করার সময় হাতের উপর পড়ে যায় সিন্দুকের বিশাল দরজা। আঙুল ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। এখান থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। প্রথমে হোমিওপ্যাথি তারপর ঠাকুরবাড়ির গৃহচিকিৎসক নীলমাধব হালদার ও মেডিকেল কলেজের সার্জারির অধ্যাপক উৎ. ঝই চধঃৎরফমব. সর্বশেষে মেডিক্যাল কলেজের পাঁচজন বিশিষ্ট সাহেব চিকিৎসক (প্রত্যেকের ভিজিট ৩২ টাকা করে) উৎ. ঘ ঈযবাবৎং, উৎ. ঔ ঊধিৎঃ, উৎ. ডঔ ঢ়ধষসধৎ, উৎ. ঝই চধষৎরফমব, উৎ. ঞঊ ঈযধৎষবং সবার চেষ্টা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে রাত তিনটা ৪০ মিনিট (২৮ শ্রাবণ, শুক্রবার)  তিনি ইহলীলা সাঙ্গ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতিতে বলেন, "যে রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কতো রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে আসিয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, "ওরে তোদের কী সর্বনাশ হলো রে।” তখনই বউঠাকুরানী তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। প্রভাতে উঠিয়া যখন মার মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না” কথাটার অর্থ রবীন্দ্রনাথ যখন ধীরে সম্পূর্ণ বুঝলেন তখন মা হারানো সন্তানের হাহাকার আমাদের শোকে আচ্ছন্ন করে। জীবনস্মৃতিতে তিনি বলেন, “ ইহার পরে বড় হইলে যখন বসন্ত প্রভাতে একমুঠো অনতিষ্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া খ্যাপার মত বেড়াইতাম- তখন সেই কমল  চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙ্গুলগুলি মনে পড়িত; আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম, যে স্পর্শ সেই সুন্দর আঙ্গুলের আগায় ছিল সেই স্পর্শ প্রতিদিন এই বেলফুলগুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে।” তখন তাঁর কবিতাও হয়ে ওঠে পৃথিবীর সকল মাতৃহীন সন্তানের  হাহাকারনামা-
“মাকে আমার পড়েনা মনে।
শুধ্ ুযখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানলা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে,
মনে হয় মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে
কোলের ’পরে ঘরে করে
দেখত আমার চেয়ে
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে,
(কাব্যগ্রন্থ -শিশু ভোলানাথ)
এ কাব্যেরই ‘অন্য মা’ কবিতায় কবির কী দারুণ অনুভূতি,
“আমার মা না হয়ে তুমি
আর কারো মা হলে
ভাবছ তোমায় চিনতেম না,
যেতাম না ঐ কোলে”
মায়ের মৃত্যুর পর স্ত্রীর মৃত্যু কবিকে শোকস্তব্ধ করেছে। মৃণালিনী দেবী বয়স যখন ১০ বছরের কম (মতান্তরে ৯ বা ১১ বছর) রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ২২ বছর তখন তারা  বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর ০৫ সন্তানের জননী মৃণালিনী দেবী পরলোকগমন করেন। কবি পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা স্মৃতিকথা ড়হ ঃযব বফমবং ড়ভ ঃরসব এর অনুবাদ গ্রন্থ “আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ” এ উঠে এসেছে মর্মস্পর্শী বর্ণনা, "শেষবার আমি যখন তার শয্যাপাশে গেলাম, তখন তিনি কথাও বলতে পারেন না। আমাকে দেখে তাঁর গাল বেয়ে নীরব অশ্রুধারা বইতে লাগল। আমার ভাই শমি তখন একেবারে শিশু। সে রাতে আমার তিন বোন- বেলা, রানী ও মীরা আর শমি ও আমাকে বাড়ির আলাদা একটা অংশে শুতে দেয়া হলো। কিন্তু বেলা ও আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। একটা প্রচ্ছন্ন ভয় আমাদের জাগিয়ে রেখেছিল। চিলেকোটা থেকে মায়ের ঘরটা দেখা যেত। খুব সকালে আমরা সেখানে গেলাম ও ভয়ে ভয়ে উকিঁ দিলাম। সারা ঘরে একটা অলক্ষণে নীরবতা। যেন মৃত্যুর ছায়া সে রাতে গোপনে বাড়িটির চারধার মাড়িয়ে গেছে। কেউ বলে না দিলেও আমরা বুঝতে পারলাম মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।"
কী সহজ বর্ণনা কিন্তু কী গভীরভাবে বেদনায় বিদ্ধ করে হৃদয়। স্ত্রী মৃত্যুতে রবী ঠাকুর বিচ্ছেদ ও একাকিত্বের যন্ত্রণায় কাতর হয়েছেন বাহিরে না যত ভেতর তার জন্ম নিয়েছে অনিরাময় যোগ্য কষ্টক্ষত, যার স্পষ্ট ছাপ পড়ল “স্মরণ”, কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায়-
“আমার ঘরেতে আর নাই সে, যে নাই-
যাই আর ফিরে আসি, খুঁজিয়া না পাই
আমার ঘরেতে নাথ, এইটুকু স্থান
সেথা হতে যা হারায় মেলে না সন্ধান।”
[স্মরণ- কবিতা নং ৫]
স্ত্রীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুশোকের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম হলো। স্ত্রীর মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই নয় মাস পর তিনি হারান-তার মেজো মেয়ে রেণুকা দেবী (রানী) কে। ১৯০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রেনুকার চিকিৎসার জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিয়ে হিমালয় (আলমোড়া) যান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মৃত্যুর আগে রেণুকা তার বাবা রবীন্দ্রনাথকে “পিতা নোহসি” শুক্লযজুর্বেদের বিখ্যাত বৈদিক মন্ত্রটি 
“ওঁ পিতা নোহসি, পিতা নো বোধি,
নমস্তেহস্ত্ত, মা মা হিংসীঃ।
বিশ্বানি দেব সবিতর্দুরিতানি
পরাসুব যদ্ভদ্রং তন্ন আসুব।।”
পড়ে শোনাতে বলে। 
কবিপুত্র শমীন্দ্রনাথ ছিল অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ বালক। সব কিছুতেই তার তাক লাগানো প্রশ্ন, কবি তার এ পুত্রকে হৃদস্পন্দনের মত বুকে আগলে রাখেন। সবার আশা বড় হয়ে সে বাবার মত মস্ত কবি হবে। কিন্তু নিয়তীর লিখন ছিল নির্মম কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সে ঠিক পাঁচ বছর আগে তার মা মৃণালিনী দেবী যে তারিখে মারা যান তিনিও ৭ অগ্রহায়ণ পরলোকগমন করেন। শমীন্দ্র নাথের একটি গানের খাতা ছিল তার ওপরে লেখা ছিল “বন্দেমাতরম” তার ভেতর ভর্তি ছিল বাবার গানে। মজার ব্যাপার হল সব গানের শেষে রবি ঠাকুরের অনুকরণে স্বাক্ষর “শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর ” যেন গানগুলো তার নিজের লেখা। রবীন্দ্রনাথ শমীর শেষকৃত্যে গেলেন না নিশ্চল পাথর হয়ে বসে রইলেন। দমবন্ধ করা শোকে রবীন্দ্রনাথ অবলা বসুকে লিখলেন,  “ঈশ্বর আমাকে যাহা দিয়াছে, তাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন। তবে শিরোধার্য করিয়া লইবে। আমি পরাভূত হইব না।”
১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি (৬ মাঘ ১৩১১ বঙ্গাব্দ) ৮৭ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন- রবীন্দ্রনাথের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পিতার স্মরণে “ মহর্ষির আদ্যকৃত্য উপলক্ষে প্রার্থনা” নামক বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন। মহর্ষির মৃত্যুর পর ঠাকুর পরিবার ভেঙ্গে গেল। হিন্দু যৌথ পরিবার হিসেবে একত্রে থাকতে শরিকেরা আর রাজি হল না।  মহর্ষির মৃত্যুতে ঠাকুর পরিবারের উপর থেকে বিশাল ছায়াটা সরে গেল। সংক্ষেপে, বাবার প্রস্থান রবীন্দ্রনাথের কাঁধে শোকের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল এক পরমাত্মীয়ের মহাপ্রয়াণ  হিসেবে, যাঁকে তিনি পরম শ্রদ্ধায় ও শান্ত দর্শনে গ্রহণ করেছিল। 
১৯১৮ সালে ১৬ মে (মতান্তরে ১৭ মে) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতা দেবী (বেলা) ছোট বোন রেনুকা দেবীর মতো যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামী শরৎচন্দ্র চক্রবতীর সাথে সর্ম্পকের টানাপোড়েন বেলাকে যতনা কষ্ট দিয়েছে বাবা রবীন্দ্রনাথকে কষ্ট দিয়েছে শতগুণ। কন্যাকে বাঁচাতে চিকিৎসার সমস্ত ভার কবি গ্রহণ করেছিলেন। মাধুরীলতার মৃত্যু কবিকে শোকে এতোই মুহ্যমান করেছিল যে, মাধুরীলতার জীবনাবসানের অন্তিম মুহূর্তে তিনি মেয়েকে দেখতে যাচ্ছিলেন, পথেই তাঁর মৃত্যুর খবর পান। তিনি বেলার মৃত মুখ না দেখে জোড়াসাঁকোয় ফিরে এসেছিলেন। কবি তার স্মরণে শান্তিনিকেতনে "মাধুরীলতা বৃত্তি”, চালু করেছিলেন। “পতালকা” কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতা তিনি বেলাকে উৎসর্গ করেছেন। 
রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনে ৭১ বছর বয়সে মৃত্যু আবার তীব্র আঘাত দিয়েছিল কবিকন্যা মীরা দেবী আর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র কবির প্রাণাধিক প্রিয় নীতীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় জামার্নিতে পড়াশুনাকালীন মারা যান ১৯৩২ সালের ৭ আগস্ট। শোনা যায়। নাতি নীতীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে কবি এতটাই আঘাত পেয়েছিলেন যে এর পর তিনি আর নামের আগে 'শ্রী' লিখতেন না। 
কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী দম্পতি ছিলেন-নিঃসন্তান। তিনি নন্দিনী (পুপে) নামের কন্যাকে দত্তক নিয়েছিলেন। সে কন্যাও ছিল নিঃসন্তান।। মীরা আর নগেন্দ্রনাথ দম্পতির মেয়ে নন্দিতা। যার বিয়ে হায়ছিল কৃষ্ণা কৃপালনীর সঙ্গে। এ দম্পতিও ছিল নিঃসন্তান। ফলে ১৯৬১ সালে রথীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ সালে নন্দিতা আর শেষে ১৯৬৯ সালে মীরা দেবীর-পরলোক গমনের মাধ্যমে পৃথিবীতে কবির ঔরসজাত আর কোন বংশধর থাকল না। 
ভাগ্যের উত্থান-পতনে, শোকে-ক্লেশে কোন কিছুই কবির সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ব্যাত্যয় ঘটাতে পারেনি। বাবার কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন সর্বাবস্থায় অবিচল থাকার গোপন কৌশল। তাঁর কাছে এসে দুঃখ হয়েছে এসরাজের তারে স্থায়ী প্রশান্তি । রবীন্দ্রনাথ প্রেমে যেমন “মরিতে চাহি না আমি" তেমনি বিরহে তিনি আরো অতিমানবীর শক্তি, “বিপদে মোরে রক্ষা করে এ নহে মোর প্রার্থনা।”
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক





এক আকাশে দুই রূপ
আবরু আবেদীন  ।।

ঢাকায় পুড়ছে তপ্ত তামা, ঘামছে নগরী রোদে,
এ কেমন ওলটপালট হাওয়া, বিধাতা কী যে বোঝে!
ক্লান্ত কাকের শুষ্ক গলা, পিচগলা এই পথ,
তীব্র গরমে থমকে গেছে যেন জীবনের রথ।
এসি-ফ্যানের লড়াই চলে, জুড়ায় না কো প্রাণ,
চোখ বুজলেই খাঁ খাঁ রোদ, শুধু বৃষ্টির আহ্বান।
অথচ ওদিকে শান্ত কুমিল্লায় নামল শ্রাবণ ধারা,
মেঘের ডানায় চড়েছে মন, মেঘেরা পাগলপারা।
শালবন বিহারে ছুঁয়েছে আকাশ, ঝরছে রিনিঝিনি,
ভেজা মাটির সুবাস যেন বড় চেনা, বড় ঋণী।
একই আকাশে এত খেলা, একপাশে রোদের খাঁ খাঁ,
অন্য পাশে বৃষ্টির নূপুর, মেঘের ডানায় আঁকা।
অদ্ভুত এই দেশের আবহাওয়া, অদ্ভুত তার রীতি—
কেউ খোঁজে একটু শীতল ছায়া, কেউ গায় বৃষ্টির গীতি!












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করে দেশের ভাগ্য বদলাতে চাই : প্রধানমন্ত্রী
‘নিখোঁজ নয়; ছিলেন আত্মগোপনে’ ধর্ষণ ও ভ্রুণ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সেই শিবির নেতা
শিবির নেতা জিসানকে বহিষ্কার
কুমিল্লার শিবের বাজার সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১৯ কেজি গাঁজা জব্দ, আটক ১
কুমিল্লায় পলো দিয়ে মাছ ধরা উৎসব
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পর কুমিল্লার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো
কুমিল্লায় ১১ দলীয় ঐক্যের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
বরুড়ায় রাকিব হত্যা প্রধান আসামি ছোটন ঢাকায় গ্রেপ্তার
কুমিল্লা সীমান্তে আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনা
২৬ ঘণ্টা পর নিখোঁজ ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা লাকসাম থেকে উদ্ধার
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২