
সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি আর সম্প্রীতির গ্রাম ‘রাধানগর’। কুমিল্লা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তরে এবং দেবিদ্বার উপজেলা সদর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার পশ্চিমে রাধানগর গ্রামের অবস্থান। সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাসের এই গ্রামের আয়তন মাত্র তিন বর্গকিলোমিটার। ছোট্ট এই গ্রামের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ ও দৃঢ় একতা। আর এর মূলে রয়েছে ‘বিউটিফুল রাধানগর’ ও ‘রাধানগর অগ্রণী সংঘ’ নামে দুটি সামাজিক সংগঠন। তাঁরা গত পাঁচ বছর ধরে গ্রামের মানুষের মধ্যে গড়ে তুলেছেন ‘সামাজিক একতা’। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা, বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা করা এ গ্রামের মানুষের মধ্যে এখন একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আযহাকে ঘিরে এই গ্রামের যেসব পরিবার কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য রাখেননা তাদের জন্য এগিয়ে আসেন গ্রামের সকল বিত্তবান। গ্রামের বিত্তবানরা স্বেচ্ছায় নিজেদের কোরবানির গোসতের একটি অংশ ‘রাধানগর অগ্রণী সংঘ’-এর অফিসে জমা করেন। এভাবে সবার গোসত একত্র করে সংগঠনের সদস্যরা গ্রামের দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারে সমানভাবে ভাগ করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। ফলে গরিবরা বিত্তবানদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গোসত সংগ্রহ করতে হয় না। এই গ্রামের ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই ঈদের আনন্দে অংশ নেয়। গত পাঁচ বছর ধরে একইভাবে একই নিয়ম চলছে এই গ্রামে। শুধু কোরবানির ঈদ-ই নয়, অন্যান্য উৎসবেও বিত্তবানরা সামর্থ অনুযায়ী গ্রামের গরীবদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। 
রাধানগরের বাসিন্দা ও দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আরিফুল ইসলাম মুন্সী কালেরকন্ঠকে বলেন, এই গ্রামে ধনী-গরীব কারও মধ্যে কোন ভেদভেদ নেই, আমরা সবাই এক পরিবার। কোরবানির দিন গোসতের জন্য কেউ কারও বাড়ি যেতে হয় না। গ্রামের বিত্তবানদের একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়, তাঁরা ওই সময়ের মধ্যে ‘রাধানগর অগ্রণী সংঘ’ অফিসের সামনে গোসত নিয়ে হাজির হয়। পরে তা একত্র করে সমান বন্টন করে গ্রামের দরিদ্রদের বাড়ি বাড়ি পৌছে দেওয়া হয়। এভাবে আমরা সবাই একে অপরের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেই। গ্রামের বাসিন্দা মো.আলমগীর হোসেন বলেন, “কোরবানি আমাদের আত্মত্যাগ শিক্ষা দেয়। আজকের এই বিশেষ দিনে কেউ যেন না খেয়ে থাকে, সেজন্য আমরা কোরবানি বঞ্চিত পরিবারের মাঝে গোসত বিতরণ করি। শুধু কোরবানির গোসতই নয়, একে অপরের বিপদ-আপদে গ্রামের সবাই একত্র হয়ে যায়। আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধন অত্যান্ত শক্তিশালী।
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রাকিবুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এমন গ্রাম খোঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। দেশে যখন সামাজিক বিভাজন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহিংসতা বাড়ছে, তখন রাধানগরের মতো একটি ছোট্টগ্রাম সম্প্রীতি সৃষ্টিতে উদাহরণ হয়ে থাকবে। দেশে এমন গ্রামের সংখ্যা বাড়লে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।
