শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সন্তানের সাফল্যের কফিনে মায়ের পচা লাশ
কাজল কানন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১:১৪ এএম আপডেট: ০৪.০৬.২০২৬ ১:৪৯ এএম |

 সন্তানের সাফল্যের কফিনে মায়ের পচা লাশ
আকাশছোঁয়া ভবন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে একটি সমাজ বোঝা যায় না। দেখতে হয়-সেই সমাজ শিশুদের কতটা আগলে রাখে, প্রবীণদের কতটা সম্মান দেয়। কারণ জীবনের শুরু এবং শেষ-দুই প্রান্তেই মানুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল এবং অসহায়।
ঢাকার মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সামনে একটি ওজনদার প্রশ্ন হয়ে এসেছে—মানুষের কি আর মা দরকার নেই? গত ৩১ মে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া এই মায়ের পচা-গলা এবং পোকায় ধরা লাশটি যেন সভ্যতার মুখে এক চরম চপেটাঘাত। একই ফ্ল্যাটের পাশের রুমে থেকেও স্কুলশিক্ষিকা মেয়ে মায়ের মৃত্যুর খবর টের পাননি, অন্যদিকে সুপ্রতিষ্ঠিত ছেলেরাও দীর্ঘদিন মায়ের কোনো খোঁজ নেননি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে একাকীত্বের অন্ধকারে বিছানায় পড়ে ছিল তার নিথর দেহ।
মায়ের হাত ধরে একটি শিশু হাঁটতে শেখে। মা নিজের ঘুম, স্বপ্ন, আরাম বাদ দিয়ে সন্তানের জীবন আরামদায়ক করে গড়ে তোলে। সেই মা কি একসময় সন্তানের জীবনে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারে? মানুষের প্রয়োজন কি শুধু মায়ের দুধ পর্যন্ত? সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি মায়ের টান ফুরিয়ে যায়?
প্রযুক্তির এই হুলস্থুল যুগে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিস্মিত। রোবট কাজ করছে, অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যন্ত্র মানুষের ভাষা পড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এআই কি কখনও মায়ের বুকের দুধের স্নেহ দিতে পারবে? একটি সফটওয়্যার কি কখনও সন্তানের জ্বরের রাতে মায়ের নির্ঘুম উদ্বেগের বিকল্প হতে পারবে?
অফিসে বের হওয়ার আগে অনেকের স্ত্রী শার্টের কলার ঠিক করে দেন, বোতাম লাগিয়ে দেন। কিন্তু আমরা কি ভুলে গেছি, একদিন মা পুরো শার্টটা গায়ে পরিয়ে দিতেন? স্কুলে যাওয়ার আগে চুল আঁচড়ে দিতেন, টিফিন গুছিয়ে দিতেন, জুতোর ফিতা বেঁধে দিতেন। সন্তানের সামান্য কাশি হলে রাতভর অশ্রুপাত করতেন। সেই মা যখন বৃদ্ধ হয়, তখন কেন তার ওষুধ খাওয়া, খাবার খাওয়া কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার দায়িত্বনেওয়ার কেউ থাকে না? যে মায়ের সন্তানরা আজ সমাজের চোখে সফল-যার বড় ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, মেজো ছেলে বুয়েটের শিক্ষক এবং মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা; অথচ সেই জন্মদাত্রী মায়ের থাকার ঘরটি ছিল নোংরা, ডাস্টবিনের মতো অস্বাস্থ্যকর এবং চরম অবহেলিত!
নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; আমাদের বর্তমান সময়ের সামাজিক আয়না। এত সব দেখা যায়। গুগল চ্যাটজিপিটি লাগে না। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে শিক্ষাগত সনদ বেড়েছে, পদমর্যাদা বেড়েছে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে; কিন্তু মানবিক পরিসর কমেছে। একজন যুগ্ম সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা একজন শিক্ষকের সন্তান হওয়া মানুষের মানবিক দায়িত্বকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করে না-এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
অবশ্যই কোনো ঘটনার পূর্ণ সত্য আদালত ও তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। ইতোমধ্যেই এই চরম অবহেলা ও নির্মমতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর সঠিক কারণ অনুসন্ধান এবং তার সন্তানদের বিরুদ্ধে কেন মা-বাবার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। এই রিটটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ যখন দায়িত্ব এড়ায়, তখন বিচার বিভাগকেই শেষ ভরসা হতে হয়। কিন্তু যে দৃশ্য জনগণ দেখেছে-একজন প্রবীণ নারী নোংরা পরিবেশে মরে পচে আছেন, তার মৃত্যুর খবরও সময়মতো কেউ জানেনি- এমন দৃশ্য আমাদের বিবেককে ধাক্কা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশে ২০১৩ সালের মা-বাবার ভরণপোষণ আইন আছে। সেখানে সন্তানের দায়িত্বস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন বলছে, মা-বাবার ভরণপোষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। এই ঘটনার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সেই আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত যুগ্ম সচিব সন্তানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া নতুন এই রিট আবেদনটি অপরাধী সন্তানদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভালোবাসা কি কখনও আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়? আদালত কি সন্তানের হৃদয়ে মায়ের জন্য মমতা সৃষ্টি করতে পারে?
আইন প্রয়োজন, শাস্তিও প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সামাজিক বিবেকের পুনর্জাগরণ।
অনেকেই বলেন, বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাস্তবতার নিরিখে এ কথার যৌক্তিকতা থাকতে পারে, মানবিকতা নয়। কোনো পরিবার বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রবীণদের সেবা দিতে অক্ষম হতে পারে। এই অক্ষমতা সামাজিকতা হতে পারে না। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মা-বাবার শেষ ঠিকানা হবে প্রতিষ্ঠান, পরিবার নয়? বৃদ্ধাশ্রম কখনও সন্তানের মমতার বিকল্প হতে পারে না। এটি হতে পারে সহায়ক, কিন্তু আদর্শ নয়।
আমাদের সংস্কৃতিতে মা শুধু একজন ব্যক্তি নয়। একটি অনুভূতি, একটি আশ্রয়, একটি ইতিহাস। পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে মায়ের কোলকেই মনে রাখে। অথচ সেই মানুষই যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের ঘরে, নিজের সন্তানদের কাছাকাছি থেকেও অবহেলার শিকার হয়, তাহলে উন্নয়নের ভাষণগুলো নিষ্ফলা হয়ে পড়ে।
এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। আমরা সন্তান হিসেবে কেমন? আমরা কি নিয়মিত মা-বাবার খোঁজ নিই? আমরা কি তাদের সঙ্গে সময় কাটাই? নাকি টাকা পাঠিয়ে কিংবা একজন পরিচর্যাকারী রেখে দায়িত্বশেষ হয়েছে বলে মনে করি?
সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড প্রযুক্তির উৎকর্ষ নয়, মানুষের হৃদয়ের বিস্তার। যে সমাজ তার মাকে সম্মান করতে শেখে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের মানবিক ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে।
নূর জাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের কাছে জন্য সতর্কবার্তা। কেবল একটি সংবাদ নয়। বিরামহীন প্রশ্নপত্র, যার উত্তর প্রত্যেক সন্তানের কাছে চাওয়া যায়-যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, মা পাশে ছিলেন। এখন তার প্রয়োজনের সময়ে আমরা কোথায়?
লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী।













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
প্রথমার্ধে কানাডার জালে বসনিয়ার এক গোল
কুমিল্লায় ১১ দলীয় ঐক্যের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পর কুমিল্লার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো
কুমিল্লা সীমান্তে আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনা
বরুড়ায় রাকিব হত্যা প্রধান আসামি ছোটন ঢাকায় গ্রেপ্তার
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
পলাতক বাহারকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার দাবি
ঢাকা-কুমিল্লা রেল কর্ডলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: অর্থমন্ত্রী
চৌদ্দগ্রামে পিতার ২০ বছর পর পুত্রকেও ছুরিকাঘাতে হত্যা
মালয়েশিয়া থেকে ফেরার রাতেই ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলা-লুটপাট, আহত ৩
দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পর কুমিল্লার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২