
একাত্তরের
যুদ্ধে ছাত্ররা একটা খুব বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তখনকার ছাত্রনেতাদের
একজন এক আলোচনাসভায় দুঃখ করে বলেছেন, কদিন আগে ফেরি পার হতে গিয়ে তিনি
দেখেন একাত্তরের এক অতিশয় চিহ্নিত রাজাকারের গাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা
উড়ছে। তিনি উল্লেখ করেননি যে, সরকারি লোকেরা ওই রাজাকারকেই তোয়াজ করছিল,
মুক্তিযুদ্ধের নেতাকে উপেক্ষা করে; তবে আমরা সেটা কল্পনা করতে পারি, এবং
কল্পনা করে মর্মাহত হই। তিনি বলেছেন, দৃশ্যটা দেখে তার কান্না পেয়েছিল;
শুনেছি যে, বিবরণটা শুনে সভায় উপস্থিত অনেকের চোখই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল।
হওয়ার কথা। ঘটনা খুবই মর্মান্তিক।
আসলে এও তো বিচ্ছিন্নতারই একটি
পরিষ্কার উদাহরণ। একদা যে নেতা জনগণের সঙ্গে ছিলেন, ছিলেন অত্যন্ত নিকটে,
মানুষ যাকে দেখলে উদ্দীপ্ত হতো, সম্ভ্রম করত। আজ তিনি তাদের কাছে নেই; ঘটনা
পরম্পরায় একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এখানে আরও যে প্রশ্নটা উঠে আসে সেটা
হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে রাজাকার কেন ক্ষমতায় থাকবে, এবং মুক্তিযোদ্ধা
উপেক্ষিত হবে? জবাব দিতে গেলে আবার ওই বিচ্ছিন্নতার কাছেই গিয়ে পৌঁছব। আসল
ঘটনা হলো এই যে, জনতার কাছ থেকে পতাকা ছিনতাই হয়ে গেছে। ওই পতাকা একদিন
মানুষের হাতে নয় কেবল, বুকের মধ্যেও ছিল। যুদ্ধজয়ের পরপরই দেখা গেল পতাকা
সেখানে নেই, চলে গেছে শাসকদের গাড়িতে। তার পর থেকে পতাকা গাড়িতেই বিশেষভাবে
শোভা পায়, এবং গাড়িগুলো শাসকদেরই, অন্য কারও নয়। এই শাসকদের মধ্যে
মুক্তিযোদ্ধা, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজাকার বহু ধরনের লোক আছে, জনগণের দৃষ্টিতে
কিন্তু এরা সবাই এক, সবাই শাসক, কোন গাড়িতে কে বসে আছেন এনিয়ে তাদের কোনো
মাথাব্যথা নেই, তাদের দৃষ্টিতে সবাই সমান। আর সরকারি কর্মচারী? তারা তো
ব্যক্তিকে সালাম জানান না, কর্তাদের সালাম জানান; কর্তা বদল হন, কিন্তু
সালাম জানানো অব্যাহত থাকে।
একাত্তরের রাজাকার আজ যে বাংলাদেশের
শাসকশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, এজন্য জনগণ মোটেই দায়ী নয়; জনগণ এমনটা
চায়নি, তারা চেয়েছিল নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা, যেখানে গাড়ি ও গাড়ির
পতাকা দিয়ে ব্যক্তির পরিচয় হবে না, পরিচয় হবে মনুষ্যত্ব দিয়ে। সবাই মানুষ
হিসেবে মর্যাদা পাবে, এবং দৃশ্য-অদৃশ্য জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়বে সবার
হাতে। অর্থাৎ সাম্য আসবে, এবং সেই সাম্য কতিপয়কে নয়, দেশের সব মানুষকেই
স্বাধীন করবে। সেটা ঘটেনি, আর সেই বড় দুঃখটাই নানা রকমের ও মাপের দুঃখের
জন্ম দিচ্ছে; দিতে থাকবেও। আমাদের শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা
নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা খুবই স্বাভাবিক, এবং মানুষ প্রশ্ন করছেও। মওলানা
ভাসানীর ভূমিকার দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বিচ্ছিন্নতা দূর করার ক্ষেত্রে
তার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন; উভয়েই নেতৃত্বের ভূমিকাতে ছিলেন,
শুরুতে তারা একসঙ্গেই কাজ করেছেন, পরে আলাদা হয়ে গেছেন। কেননা রাজনৈতিক
দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের ভেতর পার্থক্যটা খুব যে কম ছিল তা নয়। এরা উভয়েই
জাতীয়তাবাদী ছিলেন। কিন্তু মওলানা ভাসানী জাতীয়তাবাদী হয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন
না, তার স্বপ্ন ছিল সমাজকাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনা। ভাসানী যা পারেননি,
মুজিব তা করেছেন। মুজিব একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু
রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। কেননা, তিনি
অন্তর্গত হয়ে গেলেন শাসকশ্রেণির। অন্যদিকে ভাসানীর ভরসা ছিল যে বামপন্থিদের
ওপর তারা বিভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার দরুন শেষ পর্যন্ত তিনিও একাই
হয়ে গেলেন। জনগণের ঐক্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে বামপন্থিদের দিক থেকে
অনেক কিছু করার ছিল, তারা তা করতে পারেনি। যে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি
জনগণের মধ্যে বিভক্তি আনে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বামপন্থিদের প্রয়োজন ছিল
একটি মূল ধারার প্রতিষ্ঠা করা; সে দায়িত্ব পালন তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এদিকে
উন্নয়ন হচ্ছে। সে উন্নয়ন যত ঘটছে তত বাড়ছে বৈষম্য, শক্তিশালী হচ্ছে
আত্মকেন্দ্রিকতা ও ভোগবাদিতা। মানুষ বন্দি হয়ে যাচ্ছে
আত্মস্বার্থসর্বস্বতার নিগড়ে। এনজিও তৎপরতা এই উন্নয়ন ধারারই অংশ। এনজিওরা
ক্ষমতায়নের কথা বলে, সে লক্ষ্যে কাজও করে, কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য
মানুষকে স্বাধীন করা নয়, বরঞ্চ তাকে কাজের দিক থেকে সেবক ও ক্রেতা এবং
আদর্শের দিক থেকে পুঁজিবাদী করে তোলা। এনজিওরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে,
যে দানবীয় রাষ্ট্রব্যস্থাপনা তাকে দেখেও দেখে না; ক্ষমতার খোঁজ করে
বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত এলাকাগুলোতে। এই কাজের একটি দার্শনিক
পটভূমিও রয়েছে, যেটা পাওয়া যাবে তথাকথিত উত্তর-আধুনিকতায়। উত্তর-আধুনিকতা
ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটেছে, যে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের মুরুব্বি বিশ্বব্যবস্থা
তাদের গুরুত্ব না দিয়ে ক্ষমতায়ন ঘটাতে চায় ছোট ছোট ক্ষেত্রে ‘বন্দি’
মানুষের। বন্দিত্ব দেখে, আপেক্ষিকতাও দেখে, যে আপেক্ষিকতা দেখিয়ে দেয় যে,
পরিবারের ভেতরে যে ব্যক্তি শাসক, পরিবারের বাইরে গিয়ে সেই পরিণত হয় শাসিতে।
যে জন্য সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় এই যে, অসংখ্য জায়গায় মানুষকে লড়তে হবে, নইলে
মুক্তি আসবে না। লড়াইয়ের এই ক্ষেত্রগুলো নিশ্চয়ই মিথ্যা নয়; কিন্তু ক্ষমতার
নিয়ন্ত্রণ ঘটে যে কেন্দ্র থেকে তাকে অপরিবর্তিত রেখে বিজয় অর্জিত হবে না,
সেটাও তো বড় সত্য। ছোট ছোট ক্ষেত্রগুলোতে যতই বিজয় আসুক, মূল জায়গাটা যদি
নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে তাহলে জয়ের সংখ্যা যতই হোক যথার্থ বিজয় আসবে না।
আসছেও না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিটি সেক্টরের অধীনে অসংখ্য খণ্ড খণ্ড
সংঘর্ষ ঘটেছে, সেসব সংঘর্ষ শত্রুকে দুর্বল করেছে, কিন্তু স্বাধীনতা আসেনি
যতক্ষণ না রাজধানী ঢাকা দখলে এসেছে; ঢাকা দখলের লক্ষ্য ভুলে কেবল প্রান্তে
লড়াই করলে তা আরও বহুকাল চলত, এবং দেশ স্বাধীন হতো না। স্বাধীনতা এল কিন্তু
মুক্তি যে এল না, তার কারণ সমাজের যে মূল কাঠামো সেটা বদলায়নি।
উত্তর-আধুনিকতা
এই কাঠামোটিকে বিবেচনায় আনতে চায় না, যেমন চায় না এনজিওরা। তারা বৃক্ষ
গণনা করে, অরণ্য দেখে না, দালানের কথা বলে, জমির খোঁজ নেয় না। এটা কেউ
অস্বীকার করবেন না যে, যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি বিস্ময় ঘটে গেছে।
স্থান এখন কোনো দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে না, দ্রুত যাওয়া যায়, ইন্টারনেট ও
মোবাইলে যুক্ত হওয়া চলে একে অপরের সঙ্গে। কিন্তু তাতে বিচ্ছিন্নতা কমছে কি?
যাতায়াতের পথে বহু রকমের বাধা, সন্দেহ ও তল্লাশি কমবে কী, বেড়েই যাচ্ছে।
আর ওই যে মানুষের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, বাংলাদেশের মতো অতি দরিদ্র দেশে
যে যন্ত্রের ব্যবহারকারীর সংখ্যা অচিরেই তিন-চার কোটিতে দাঁড়াবে, তার
দ্বারা কেবল যে যোগাযোগ বাড়ছে তা-ই নয়, বিচ্ছিন্নতাও বাড়ছে। টেলিভিশন
বিনোদনকে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে তাকে অসামাজিক করে তুলেছে; লোকে এখন সিনেমা
হলে যায় না, ঘরে বসে সিনেমা দেখে; তাতে বড় পর্দায় বহু মানুষের সঙ্গে একত্রে
বসে ছবি দেখার যে সামাজিকতা ছিল তা নষ্ট হয়েছে। এখন স্মার্ট ফোন এসে সেই
বিচ্ছিন্নতাকে আরও এক ডিগ্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ফোন অবশ্যই উপকারী, কিন্তু
এর মাত্রাতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার জানান দিচ্ছে যে, ব্যবহারকারীর
নিজের সময় আর তার নিজের হাতে নেই; যখন তখন যেখানে সেখানে কারণে অকারণে ফোন
আসে, ব্যবহারকারী নিজেও অন্যকে ফোন করে, যেন সে নিঃসঙ্গতায় হাবুডুবু
খাচ্ছে, ওই যোগাযোগটি না থাকলে রক্ষা থাকবে না, নিমজ্জিত হবে। চারদিকে
অসংখ্য মানুষের ভিড়, কিন্তু তাদের অধিকাংশই উদাসীন, অনেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী,
কেউ কেউ শত্রু; তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় নেই; ব্যক্তি তাই
নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি খোঁজে, মোবাইল সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই যোগাযোগে সামাজিকতা
নেই, প্রাণ নেই, অনেক কথাই অপ্রয়োজনীয়, অর্থহীন, উত্ত্যক্ত করার কাজও চলতে
থাকে, সমানে। একদিকে যোগাযোগব্যবস্থায় অত্যাশ্চর্য উন্নতি এবং অপরদিকে
ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির দূরত্ব বৃদ্ধির এমন বৈপরীত্য সভ্যতার ইতিহাসে এর
আগে কখনো ঘটা সম্ভব ছিল না, এবং ঘটেনি। বুদ্ধি বেড়েছে, বেড়েছে হৃদয়ের ওপর
অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা। ব্যক্তিটি আমি নিজে, কিন্তু এই আমি আবার প্রতিনিধিও, সে
জন্যই হয়তো বা বিবেচ্য। একটি কিশোর কীভাবে বড় হচ্ছিল, এবং নিঃশব্দ চাপের
মুখে পড়েছিল, সময়, সমাজ ও রাষ্ট্রের, অভ্যন্তরে ঘটে চলা ঘটনাগুলো
অনিবার্যরূপে বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধিরই বটে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
