
বাংলাদেশের
স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই।
১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে ডিপথেরিয়া, পোলিও, হাম,
যক্ষ্মা, ধনুষ্টঙ্কারসহ বহু প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একসময় যেসব
সংক্রামক রোগে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো, টিকার কারণে সেই চিত্র বদলে
যায়। এমনকি করোনা টিকায়ও বাংলাদেশ সারা বিশ্বে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন
করেছে। নিক্কেই-এর (ঘরশশবর) 'কোভিড-১৯ রিকভারি ইনডেক্স'-এ বাংলাদেশ ১২১টি
দেশের মধ্যে ৫ম স্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ স্থান দখল করেছিল। ইউনিসেফ
এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ বাংলাদেশের এই
টিকাদান প্রচেষ্টাকে ‘সাফল্যের গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশুদের টিকার সংকট নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত বহু অভিভাবক টিকা কেন্দ্রে গিয়েও ফিরছেন
বিফল মনোরথ হয়ে। নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা, আর
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন-দীর্ঘদিনের অর্জন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
দেশের
বিভিন্ন অঞ্চলে পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, আইপিভি, এমআর, বিসিজিসহ
গুরুত্বপূর্ণ টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও একাধিক টিকা একসঙ্গে নেই,
কোথাও আবার সীমিত মজুদের কারণে নির্ধারিত বয়সে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব
হচ্ছে না। রাজধানীর টিকাকেন্দ্রগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষার পর অনেক মা-বাবাকে
ফিরে যেতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা, হতাশা ও অনিশ্চয়তা
এখন নিত্যদিনের দৃশ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো
পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার সংকট। এই টিকা ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টঙ্কার,
হেপাটাইটিস-বি ও হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেয়।
জন্মের ছয় সপ্তাহ পর থেকে নির্দিষ্ট ব্যবধানে তিন ডোজ এই টিকা দেওয়া
অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো ডোজ না পেলে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে
পড়তে পারে।
টিকা সংকটের কারণে ইতোমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক
পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে চার
শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার শিশু হামে
আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত
হয়েছে সাত হাজারের মতো। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকার ঘাটতি
অব্যাহত থাকলে হাম, পোলিও বা ডিপথেরিয়ার মতো প্রায় নিয়ন্ত্রিত রোগও আবার
মহামারীর আকার নিতে পারে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ডিপথেরিয়ার
প্রাদুর্ভাব কিংবা চট্টগ্রামে হামের সংক্রমণ-আগের এসব অভিজ্ঞতা আমাদের
সতর্ক করে দেয় যে টিকাদানে সামান্য ব্যত্যয়ও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের
দেশ হওয়ায় আগের মতো অনেক টিকা বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারকে
নিজস্ব অর্থায়নে টিকা কিনতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, টিকা ক্রয়পদ্ধতিতে পরিবর্তন
আনার ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ বেড়েছে। আগে ইউনিসেফের মাধ্যমে
দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা হলেও পরে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালুর কারণে
সরবরাহে বিলম্ব হয়। ইউনিসেফ আগেই সতর্ক করেছিল যে এই পরিবর্তন টিকাদান
কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি
স্থগিত হওয়ায় কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মার্কিন সায়েন্স জার্নাল মাল্টি লেভেল বিশ্লেষণে ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনের
বরাত দিয়ে বলেছে যে, ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে টিকার
কেনাকাটায় অচলাবস্থার কারণে হামের প্রকোপ বেড়েছে। জার্নালটি উল্লেখ করেছে,
ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে টিকা ক্রয়ের ফলে
সরবরাহ দেরি হয়, যার ফলে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছেদ পড়ে। এই
পরিস্থিতির কারণে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৪০
লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। এই বিশাল কর্মসূচি সচল রাখতে প্রয়োজন
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত মজুত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা।
কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো জেলায় কয়েক মাসের মজুত থাকলেও কোথাও কোথাও টিকার
মজুত প্রায় শূন্য। এর ফলে শিশুদের টিকা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে
যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার সংকট শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়;
এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত। শিশুরা
সময়মতো টিকা না পেলে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অপুষ্টি,
দারিদ্র্য ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে সচেতনতার অভাব ও স্বাস্থ্যসেবা
সীমিত হওয়ায় ঝুঁকি বেশি।
তবে আশার কথা হলো, সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায়
কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইতোমধ্যে
১০ ধরনের প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। আরও
কয়েক কোটি ডলারের টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইউনিসেফের মাধ্যমে
পুনরায় টিকা কেনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ মাসের বাফার স্টক
বা অতিরিক্ত মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে
হঠাৎ সংকট দেখা না দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ধাপে ধাপে বিভিন্ন
জেলায় টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং সংকট দ্রুত কাটানোর চেষ্টা চলছে। হামের
টিকাদানে জরুরি ক্যাম্পেইনও শুরু হয়েছে। বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়তি
নজরদারি ও গণটিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। জলাতঙ্কের টিকার সংকট
কাটাতেও নতুন করে টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু টিকা আমদানি
করলেই হবে না; পুরো ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। টিকা পরিবহনের
জন্য কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা উন্নত করা, জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত
করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং
চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে টিকা সম্পর্কে গুজব ও ভুল ধারণা দূর করতে
জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাপী
প্রশংসা পেয়েছে। শিশু মৃত্যুহার কমানো এবং বহু রোগ নিয়ন্ত্রণে আনার পেছনে
ইপিআই কর্মসূচির অবদান অসামান্য। সেই অর্জন যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য সরকার,
আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুদের
স্বাস্থ্য সুরক্ষা কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি জাতির
ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
তাই তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
টিকার সংকট দ্রুত কাটিয়ে নিরবচ্ছিন্ন টিকাদান নিশ্চিত করতে না পারলে
ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপই
পারে সেই আশঙ্কা দূর করতে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও হাইপারবেরিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
