
সকাল
১০টার পরপর বাংলাদেশ দলের অনুশীলন শুরু হলো ঠিকমতোই। কিন্তু ঘণ্টাখানেক
হওয়ার আগেই বিপত্তি। তুমুল বৃষ্টিতে থেমে গেল ব্যাট-বলের তুকতাক। পরের
সময়টায় এই বৃষ্টি থামে তো এই নামে। এর ফাঁকেই কখনও সুযোগ বুঝে একটু অনুশীলন
হলো, কখনও ছুটতে হলো ড্রেসিং রুমে। মাঠকর্মীদেরও ছুটোছুটি করতে হলো একটু
পরপরই। দুপুরে পাকিস্তান দলের অনুশীলন তো আটকে রইল মূলত ইনডোরেই।
সিলেটে
পরবর্তী পাঁচ দিন ধরে কী হতে পারে, সেটির পোশাকি মহড়াই যেন হয়ে গেল টেস্ট
শুরুর আগের দিন। প্রকৃতির বৈরিতায় ব্যাহত হলো অনুশীলন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস
বলছে, টেস্ট ম্যাচেও বারবার বাগড়া দিতে পারে বৃষ্টি।
বাংলাদেশের তাতে
খুব একটা আপত্তি থাকার কথা নয়। মিরপুরে দারুণ জয়ে সিরিজে এগিয়ে থাকা দল
সিলেটে ড্র করতে পারলেই তো জিতে যাবে সিরিজ। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা
তিনটি টেস্ট জয়ের পর স্রেফ ড্রয়ে তৃপ্ত থাকার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
বৃষ্টি হলেও পাকিস্তানের সিরিজ জয়ের আশা ভেসে যাবে, তবে নাজমুল হোসেন
শান্তর দল চাইবে ২২ গজেই পাকিস্তানকে আরেকবার ডোবাতে।
সিলেট আন্তর্জাতিক
স্টেডিয়ামে সেই অভিযান শুরু শনিবার সকাল ১০টায়। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে
২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে আসার পর এবার মিরপুরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে
ধরা দিয়েছে ১০৪ রানের জয়। শান্তদের সামনে এখন পাকিস্তানকে টানা দুবার
হোয়াইটওয়াশ করার হাতছানি।
ম্যাচপূর্ব আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি
বৃষ্টির শঙ্কা আর দোলাচল নিয়েই। একটা আশার কথা যে, পূর্বাভাস বলছে, বৃষ্টি
বেশি হতে পারে রাতে। কিছুদিন আগে এই মাঠে বিসিএলের একটি ম্যাচ খেলার
অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন মুশফিকুর রহিম। টেস্ট শুরুর আগের দিন দলে প্রতিনিধি
হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান বললেন, মাঠের পানি নিষ্কাশন
ব্যবস্থা দারুণ হওয়ায় ফলাফল বের করার আশা করছেন তারা।
“আসলে যে সময়ে
খেলাটা হচ্ছে, আমাদের এখানে তো বৃষ্টির সময়ই। আমাদের সৌভাগ্য যে, মিরপুরে
বৃষ্টি হওয়ার পরও ফলাফল হয়েছে, আমাদের জন্য খুবই ভালো ও ইতিবাচক দিক ছিল।
মিরপুরের মতো এখানেও ড্রেনেজ সিস্টেম বিশ্বমানের। সম্প্রতি বিসিএলের যে
ম্যাচটা খেলেছি, প্রতিদিনই রাতে অনেক বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু পরদিন সকাল সাড়ে
৯টা থেকে খেলা শুরু হয়েছে।”
“এখানেও থেমে থেমে হলেও হতে পারে (বৃষ্টি)। যেহেতু ড্রেনেজ সিস্টেম ভালো, আবহাওয়া একটু ভালো থাকলেও ফলাফল বের করা সম্ভব।”
মুশফিকের
কথা থেকেই পরিষ্কার, প্রকৃতির উপহারে নয়, খেলেই সিরিজ জিততে চান তারা।
বারবার বৃষ্টি হানা দিলে অবশ্য মনোযোগে বাধা পড়ে, ক্রিকেটে মন দেওয়া হয়ে
ওঠে কঠিন। তবে পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে এসবকে অজুহাত দেওয়ার সুযোগ দেখেন
না মুশফিক।
“পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে এসব আমাদের জন্য নিয়মিত ব্যাপার।
আমি মনে করি, এগুলো নিয়ে অতি ভাবনার কিছু নেই। বরং এটা নিশ্চিত করতে হবে
যেন, সুইচ অন-সুইচ অফ করতে পারি। যখন আমাদের কাজ শুরু হবে, তখন যেন আমরা
সুইচ অন থাকি, আর যখন হবে না, তখন যেন আমরা পুরোপুরি অফ থাকি এবং অন্য কিছু
নিয়ে ফোকাস করতে পারি।”
বৃষ্টিমুক্ত ম্যাচের প্রার্থনা করবে
পাকিস্তানও। সিরিজ বাঁচাতে হলে জয়ের বিকল্প নেই তাদের। তবে সিলেটের আকাশে
যেমন শঙ্কা নিয়ে তাকাচ্ছে তারা, তেমনি মাথা নিচু করে সিলেটের উইকেটেও চোখ
রাখতে হচ্ছে তাদের সতর্কভাবে। টেস্ট শুরুর দুই দিন আগে মাঠ থেকে উইকেট
আলাদা করা ছিল কঠিন। সেই ঘাস কিছুটা ছাঁটা হয়েছ বটে। তবে এখনও তা মিরপুরের
চেয়ে সবুজ।
বৃষ্টির কারণে টেস্ট শুরুর আগের দিন বেশির বাগ সময়ই উইকেট
ছিল ঢেকে রাখা। দুপুরের পরপর বৃষ্টি একটু ছুট দিলে কিছু সময়ের জন্য তোলা হয়
কাভার। গোটা পাকিস্তান দল যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে উইকেট দেখার জন্য। উইকেটের
পাশে ছোটখাটো একটা সম্মেলনও হয়ে যায় তাদের।
দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের কোচ সারফারাজ আহমেদ ছোট্ট করে শোনালেন সিরিজে ফিরে আসার প্রত্যয়।
“প্রথম
ম্যাচের পর দল হিসেবে আমরা অবশ্যই হতাশ ছিলাম। তবে অতীত তো অতীতই। পরের
ম্যাচ নিয়ে আমরা আশাবাদী। দল হিসেবে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব বলে আশা করি।”
প্রথম
ম্যাচের পর পাকিস্তানের ক্রিকেট মহলে ও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে
গেছে। অধিনায়ক শান মাসুদসহ গোটা দলকে শূলে চড়িয়েছেন সাবেক ক্রিকেটাররা।
সারফারাজ অবশ্য সেসবকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না।
“সাবেক ক্রিকেটারদের
সমালোচনার কথা বলছেন, এটা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। অবশ্যই আমরা সবাই
জানি যে, ভালো ক্রিকেট না খেললে সমালোচনা হবেই। সামাজিক মাধ্যমের বিষয়গুলো
নিয়ে চিন্তা করছি না, আমাদের মনোযোগ পরবর্তী ম্যাচ খেলার দিকে। আশা করি,
আমাদের অধিনায়ক এবং পুরো দল পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ভালো ক্রিকেট খেলবে।”
চোটের
কারণে মিরপুরে খেলতে না পারা বাবর আজম ফিরছেন সিলেটে। একাদশে তাই পরিবর্তন
আসছে নিশ্চিতভাবেই। মিরপুরে অভিষেকে দারুণ পারফর্ম করা দুই তরুণ আজান
আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফাজালও নিশ্চিতভাবেই টিকে থাকবেন। সেক্ষেত্রে বাইরে
যেতে হতে পারে ইমাম-উল-হাক বা সাউদ শাকিলের কাউকে।
পেস আক্রমণে দেখা
যেতে পারে খুররাম শাহজাজদকে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০২৪ সালের সিরিজে এক
ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ২০২১ সালে মিরপুরে এক ইনিংসে ৮টিসহ ম্যাচে
১২ উইকেট শিকার করা অফ স্পিনার সাজিদ খানও ফিরতে পারেন একাদশে।
বাংলাদেশের
একাদশেও একটি পরিবর্তন নিশ্চিতই। চোটের কারণে ছিটকে পড়েছেন সাদমান ইসলাম।
তার জায়গায় অভিষেক হচ্ছে তানজিদ হাসানের। আঙুলে চোট আছে মাহমুদুল হাসান
জয়েরও। তবে শেষ পর্যন্ত তার খেলার সম্ভাবনা বেশি। পেস আক্রমণে ইবাদত হোসেন
চৌধুরির জায়গায় শরিফুল ইসলামের খেলাও অনেকটা নিশ্চিত।
পাকিস্তান যে
প্রবল চাপে আছে, তা বুঝতে পারছে বাংলাদেশ দলও। তবে মুশফিক বললেন, নিজেদের
পারফরম্যান্স দিয়েই শ্রেয়তর দল হিসেবে আরেকটি জয়ের দিকে এগিয়ে যেতে চান
তারা।
“পাকিস্তান দল বেশ স্ট্রাগল করছে। ওয়ানডে বলেন বা টেস্ট সব
ফরম্যাটেই তারা অনেকদিন ধরে ধুঁকছে। তবে এমন নয় যে তারা খারাপ খেলছে দেখেই
আমরা জিতছি। আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছি তাদের বিপক্ষে, এজন্যই আমরা
জিতছি। এই ম্যাচেও কোনো ব্যতিক্রম থাকবে না।”
আপাতত লক্ষ্য সিলেট টেস্ট
জিতে সিরিজ জয়, তবে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বড় লক্ষ্যও আছে
বাংলাদেশের। মুশফিক বললেন, ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ করে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়
পৌঁছতে চান তারা।
“আমাদের ইচ্ছা যে, গতবার যেটা আমরা অর্জন করেছি
(সপ্তম), এবার যেন তা উতরে যেতে পারি। সেটা পারলে অবশ্যই বড় অর্জন হবে। তবে
এর আগে ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করেছি আমরা। ঘরের মাঠে যত ম্যাচ আছে, সেখান
থেকে যেন সর্বোচ্চ পয়েন্ট আমরা নিতে পারি।”
“দেশের বাইরে যে খেলাগুলি
আছে… দুটি বড় সফর আছে (অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা)… কোনোটিই সহজ নয়। তবে
আমাদের টেস্ট দলের বোলিংয়ে যে ভারসাম্য আছে, ধারাবাহিকভাবে রান যদি আমরা
এনে দিতে পারি, যে কোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি।”
