
দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উচ্চ মৃত্যুহার ও নতুন ভাইরাসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে মশা বংশবিস্তারে সহায়ক পরিবেশ পেয়েছে। এতে মশার প্রজনন মৌসুম ক্রমেই বাড়ছে। তাপ বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তন মশার আদর্শ পরিবেশ। বর্ষার সময় অতিবৃষ্টি এবং কম বৃষ্টি মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারসপেকটিভে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং আর্দ্রতার ওঠানামা মশার জীবনচক্র ও ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আমাদের দেশে মশার জন্য অনুকূল পরিবেশের কারণে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু নতুন করে ভীতির সঞ্চার তৈরি করছে। জেলা স্বাস্থ্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা গত ৯ বছরের পরিসংখ্যানের মধ্যে সর্বোচ্চ। সম্প্রতি দেখা গেছে, মানুষ ও গবাদিপশু মশাবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। নিত্যনতুন প্রজাতির মশার আগমন জনস্বাস্থ্যকে নতুন করে শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে মশাবাহিত রোগের যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা তার থেকে বেশি। শুধু রাজধানীজুড়েই নয়, বর্তমানে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত রোগ।
গবেষকদের মতে, মশার প্রজননের জন্য ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা মশা ও পরজীবী উভয়ের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মশক বিশেষজ্ঞরা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকেই এ অবস্থার জন্য দুষছেন। তারা মনে করেন, দেশে বেশ কিছুদিন ধরে বৃষ্টিতেমনটা লক্ষ করা যাচ্ছে না। এতে ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও জলাধারগুলোতে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়েছে। দেশের তাপমাত্রাও অনেকটা বেড়েছে। বিগত সময়গুলোতে লক্ষ করা গেছে, সিটি করপোরেশনগুলোও সঠিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। এ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় নির্দেশিকা কেউ মানছেও না। ওষুধের মান ঠিক থাকলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মশা।
সম্প্রতি মশাবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। মশার বিস্তার রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। সিটি করপোরেশনগুলো যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। মূলত অনেক দিন ধরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চলছে একেবারে ঢিমেতালে। রাজধানীর অলিগলিতে দেখা যাচ্ছে বর্জ্য অপসারণ কাজ ঠিকমতো না হওয়ায় মশার বংশবিস্তারের মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তাই জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মশক নিধন কার্যক্রমের তৎপরতা বাড়াতে হবে। যার যার বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত কীটনাশক সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ছাড়া প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করতে হবে। আশা করছি, সরকার মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকাতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
