
বিশ্বব্যাপী জলাতঙ্ক রোগে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশেও এ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। মারাত্মক এ ভাইরাসটি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং লক্ষণ দেখা দিলে ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দেশের উত্তরাঞ্চলে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টি- র্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) ও র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) বহুদিন ধরে সরবরাহ বন্ধ আছে বলে পত্রিকান্তরে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় গুদামে এসব ভ্যাকসিনের মজুত নেই বলে জানা গেছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এসব টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এমনিতেই দেশে হামের প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তার ওপর প্রতিদিনই সারা দেশ থেকে শিশু মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম সংকট সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক দশকে হৃদরোগ, ডায়াবেটিক, ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস এবং মানসিক অসুস্থতার মতো সমস্যা বেড়েছে। আক্রান্তরা ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় এবং সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না হওয়ায় সমস্যা প্রকট হয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে জলাতঙ্ক রোগ।
জলাতঙ্ক রোগটি ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট, যা মূলত সংক্রমিত প্রাণীর কামড় বা লালার মাধ্যমে সংক্রামিত হয়। সাধারণত কামড়, আঁচড় বা খোলা ক্ষতের সংস্পর্শের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। যদিও বিশ্বব্যাপী মানুষের ৯৯ শতাংশ জলাতঙ্কের জন্য কুকুর দায়ী, তবুও ঝুঁকির ধরন অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়, কিছু অঞ্চলে বাদুড়, বিড়াল, র্যাকুন বা শিয়াল জাতীয় অন্যান্য প্রাণীও এ রোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জলাতঙ্কের একটি ইনকিউবেশন পিরিয়ড থাকে, যার অর্থ হলো এবং লক্ষণগুলো প্রকাশের আগে কিছুদিন এটি ব্যক্তির শরীরে সুপ্ত থাকে। প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো মাথাব্যথা, গলাব্যথা, জ্বর এবং কামড়ের জায়গায় খিচুনি। অত্যাধিক লালা নিঃসরণ, গিলতে অসুবিধা, পানির ভয়, বাতাসের ভয়, উদ্বেগ, বিভ্রান্তি, অনিদ্রা এমনকি আংশিক পক্ষাঘাত এবং কখনো কখনো কোমার মতো লক্ষণগুলো জলাতঙ্কের ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্তদের শতভাগই মারা যান। আর তাদের মৃত্যু হয় খুব তাড়াতাড়ি। আক্রান্ত ব্যক্তির উন্নত কোনো চিকিৎসা নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী ওই দুটি ভ্যাকসিন বা টিকা না দিলে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু অবধারিত। চিকিৎসকদের মতে, হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শিকার মানুষের ক্ষতস্থান যত দ্রুত সম্ভব কাপড় পরিষ্কার করা সাবান দিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ক্ষত পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতস্থান টানা ১০ থেকে ১৫ মিনিট ট্যাপ বা টিউবওয়েল থেকে পানি দিতে হবে। প্রাণীর আক্রমণের শিকার হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব নিতে হবে চিকিৎসাকেন্দ্রে। তা না হলে রোগীকে জলাতঙ্ক থেকে রক্ষা করা যাবে না। ৪৮ ঘণ্টার বেশি দেরি করা যাবে না। তখন ওই র্যাবিস ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা কাজ নাও করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসেবে বলা হয়েছে, জলাতঙ্ক রোগ থেকে বাঁচতে বছরে ভ্যাকসিন নেন গড়ে অন্তত ৪ লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে এ রোগে মারা যান ৫৬ জন। গত বছর মারা গেছেন ৪০ জন, যদিও প্রায় ১০০ জনের মৃত্যুর দাবি করেছেন অনেকেই। ২০২০ সালে জলাতঙ্ক রোগের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পর এ রোগে মৃত্যুর হার অন্তত ৭০ শতাংশ কমেছে বলে এ রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল কালাম আজাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর ধরে এ জেলায় জলাতঙ্ক রোগের টিকার কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় স্থানীয়ভাবে কেনা হয়েছে এ রোগের সামান্য কিছু টিকা বা ভ্যাকসিন।
দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চিকিৎসাসংকটের ভয়াবহ অবস্থা নানা তথ্যে উঠে এসেছে। সামনে বর্ষা মৌসুম এ সময়টাতে সাপের উপদ্রব বাড়বে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক জায়গায় অ্যান্টিভেনম সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সাপে কাটা রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা করাতে গিয়ে অ্যান্টিভেনমের অভাবে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। শুধু জলাতঙ্ক রোগই নয়, দেশে সংক্রামক ও অসংক্রামক উভয় ধরনের রোগে সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু ঘটছে। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। দেশে জলাতঙ্ক রোগের টিকার সরবরাহ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। আশা করছি, সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জনস্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
