
দেশে একের পর এক শিশু নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। কখনো ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর বীভৎস হত্যার বলি হচ্ছে তারা। সর্বশেষ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের পর গলা কাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সাত বছরের ইরার করুণ মৃত্যু আমাদের ব্যথিত ও মর্মাহত করেছে। গত মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যম জড়িত খুনি ধর্ষকের কঠিন শাস্তির দাবিতে সরগরম হয়ে ওঠে। শিশু ইরার ওপর বর্বরোচিত ঘটনা এবং সমাজের মানুষরূপী এই নরপশুকে ধিক্কার জানান অনেকে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গেন্ডারিয়া থানা এলাকায় প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর এক শিশুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তুচ্ছ কারণে শিশুটিকে খুন করে ড্রামে ভরে লাশ গোপন করার চেষ্টা করেন প্রতিবেশী। গত সপ্তাহে দিনাজপুরে সম্পত্তির লোভে হত্যা করা হয় শিশু শামসকে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বা পারিবারিক কোন্দল, বিকৃত বা ঘৃণ্য লালসাসহ নানা কারণে মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হচ্ছে শিশুরা। এসব ঘটনায় সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ ও সহিংসতা অনেকটা বেড়েছে। সংগঠনটি শিশু নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে বলা হয়েছে, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, নির্যাতন ও হত্যার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারী-শিশুর আত্মহত্যার উচ্চ হার সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার গভীর সংকট নির্দেশ করে।
এমএসএফ-এর তথ্যমতে, গত বছরের ডিসেম্বরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২৪৩টি ঘটনা ঘটে। পরের মাসে তথা গত জানুয়ারিতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ২৫৭টি, যা আগের মাসের তুলনায় ১৪টি বেশি। নারী ও শিশু সহিংসতার ঘটনা ঘটে জানুয়ারিতে ২৫৭টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ঘটেছে ২৫৩টি। জানুয়ারিতে ধর্ষণের ঘটনা ৩৪টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ঘটে ৩৩টি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ও কিশোরী।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বাড়ছে; যা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত নানা চর্চা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে বারবার নৃশংসতার শিকার হচ্ছে শিশুরা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে শিশুদের প্রতি আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি পরিবারগুলোকে হতে হবে আরও বেশি সচেতন।
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যাসহ এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার বা শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থা শিশুদের জন্য নিরাপদ বা শিশুবান্ধব নয়। আমাদের শিশুবান্ধব আইনি কাঠামো এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল আচরণের জায়গাগুলোতে যথেষ্ট ঘাটতি বা দায়িত্বহীনতা রয়েছে। এসব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকট দূর করে শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই ওই জাতীয় অপরাধ করার প্রবণতা কমে যাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর নির্যাতনের যে ঘটনা ঘটছে তা খুবই বেদনাদায়ক। এ ছাড়া এসব ঘটনায় জড়িত অপরাধীরা নানা ধরনের কৌশল করে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে। অপরাধীরা অপরাধ করে যেন পার না পায়, সে ব্যাপারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রীয় আইন কাঠামো হতে হবে শিশুবান্ধব। শিশুরা স্বভাবগতভাবে খুবই দুর্বল। এ কারণে অপরাধীরা তাদের টার্গেট করে থাকে। তাই পরিবারকেও শিশুদের বিষয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার- সবারই নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
