
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুধু ইরান ক্ষত-বিক্ষত হয়নি, গোটা মধ্যপ্রাচ্য আক্রান্ত হচ্ছে। এতে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানি-রপ্তানি এবং শ্রমবাজারে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় এখনই সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ জ্বালানির জন্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় নিশ্চিতভাবে জাহাজে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতায় ঢাকা থেকে তিন দিনে ৭৪ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ৭০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ায় প্রবাসী কর্মীরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরতে পারছেন না, আবার কেউ কর্মস্থল পরিবর্তন বা ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কোথাও কোথাও নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাসস্থান ও কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিকদের পরিবারগুলোও দেশে গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক শ্রমিকের বেকার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যারা দৈনিক শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন, যুদ্ধের কারণে তাদের অনেকেই বাসা থেকে বের হতে পারছেন না। তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পড়বে ঈদে। কারণ অনেক প্রবাসী ঈদের আগে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারবেন না। তাতে ম্লান হবে স্বজনদের ঈদের আনন্দ।
এ যুদ্ধ বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য একটা ভয়াবহ উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা, রিজার্ভ স্বল্পতা, অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বাংলাদেশি নাগরিকের অবস্থানের কারণে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, গতকাল সোমবার বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের তারেক নামে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
এ সংঘাত অচিরেই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন তাদের লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত ইরানে হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরানও জানিয়েছে তাদের পাল্টা হামলা চলবে। তাদের এ পাল্টাপাল্টি অবস্থান পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুই পক্ষই আগের সব সীমা অতিক্রম করেছে। পরিস্থিতি এখন সরাসরি ও বিস্তৃত সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি। অন্যদিকে ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল এক যুদ্ধে প্রবেশ করেছে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতেও। এ জন্য বিকল্প সাপ্লাই চেইন প্রস্তুত রাখতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, যদি সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি হয়, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। ইতোমধ্যে তুরস্ক মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুতে ইরানকে রাজি করানো এবং দেশটিতে সরকার পরিবর্তন করা। যুক্তরাষ্ট্রের এটা যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে এবং ইরানের জনগণ যদি তাদের প্রস্তাবে রাজি না হয়, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের আমদানি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজারে যাতে এর প্রভাব না পড়ে, সে ব্যাপারে সরকারকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ লাইনের বিকল্প রুট খুঁজে বের করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। এতে রেমিট্যান্সও কমে যেতে পারে। অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জোর তৎপরতা চালাবে।
