
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায় গত সোমবার ভোরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নয়জন দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে চারজনই মারা গেছেন, কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মুহূর্তের মধ্যেই ওই ভবনের সিসিটিভি ফুটেজের ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরপরই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ মর্মান্তিক ঘটনাটিতে দেখা যায় একজন নারীর শরীরে জ্বলছে আগুন, তিনি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছেন। পরিবারের অন্য দগ্ধ সদস্যরাও সিঁড়ি দিয়ে দৌড়াচ্ছেন। এই রোমহর্ষক ঘটনায় দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, সম্ভবত চুলা থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে রান্নাঘরে জমেছিল, সেই জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত। একই দিন সোমবার রাজধানীর হাজারীবাগের রায়ের বাজার এলাকায় গ্যাস-লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ডে চারজন দগ্ধ হন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ঘরে আগে থেকেই গ্যাস লিকেজ হয়েছিল। এ ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
চট্টগ্রাম বিভাগে গত ছয় বছরে গ্যাস লাইন লিকেজে ৮ শতাধিক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে এসব দুর্ঘটনায় কতজন প্রাণ হারিয়েছেন, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। এসব দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ দেয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। ২০১৯ সালেও কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। সুপারিশগুলোর মধ্যে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আওতাধীন গ্যাসলাইন ও রাইজারগুলো নিয়মিত পরীক্ষা, গ্যাস নিঃসরণ চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলা হয়। এসব সুপারিশের কোনোটিই বাস্তবায়ন করেনি কোম্পানি। ফলে এ ধরনের গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয়টি কারণে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এগুলোর মধ্যে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস লাইন পরিবর্তন না করা, পাইপলাইন নিয়মিত মনিটর না করা, গ্যাস চুরির উদ্দেশ্যে অননুমোদিত সংযোগ নেওয়া, ডিফেক্ট পাইপ মেরামতে অপেশাদার শ্রমিক ব্যবহার, আবদ্ধ ঘরে গ্যাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে নগরবাসীকে অবহিত না করা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতার কোনো বিকল্পনেই। সিলিন্ডার বা রেগুলেটরে লিক আছে কি না, তা নিয়মিত সাবান পানি দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কখনোই আগুন জ্বালিয়ে লিক পরীক্ষা করা যাবে না। সরকার অনুমোদিত কোম্পানির সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ বা মরিচা ধরা সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ। গ্যাসের পাইপ পুরোনো বা ফাটা হলে দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে এবং মানসম্মত রেগুলেটর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষকে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যথাযথ তদারকি, কঠোর জবাবদিহি এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে নিরাপদ গ্যাস ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি। গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষকে সঠিক ব্যবহারবিধি, ঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে। লাইনে লিকেজ আছে কি না নির্দিষ্ট সময় পর পর তা পরীক্ষা করতে হবে। সর্বোপরি জনসাধারণের সতর্কতা এবং উপযুক্ত কার্যকর পদক্ষেপই এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রেহাই দিতে পারে।
