
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়কালে মব সন্ত্রাস সংক্রামক হয়ে উঠেছিল। জনজীবনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, রাজনৈতিক উত্তেজনা বিভিন্ন বিষয়কে সামনে এনে উত্তেজিত জনতা বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়। দেশে এমন দৃশ্য বারবার দেখতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাই হচ্ছে মব সন্ত্রাস। আমরা দেখেছি নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে গুজব সৃষ্টি করে। বাউল সম্প্রদায়, ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, মুক্তিযোদ্ধাকেও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। রাজবাড়ীতে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। দেশের বড় দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আমরা আরও লক্ষ্য করেছি, দাবিদাওয়া আদায়ে সব সময় একটি পক্ষ রাজপথ দখল করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের দাবিদাওয়া নিয়মতান্ত্রিক পথেই হওয়া উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। অর্থের বিনিময়ে হয়রানিমূলক মামলা বা গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের চর্চা আইনের শাসনকে ভূলুণ্ঠিত করে।
গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মব কালচার বরদাশত করা হবে না। মহাসড়ক অবরোধ বা সহিংসতার মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিন শেষ! বৈধ উপায়ে দাবি উপস্থাপন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিরীহ ও সাধারণ অনেক মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলতে কিছু সুবিধাবাদী গ্রুপ তাদের মামলায় জড়িয়েছে। পুলিশ বিভাগকে এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করি। তিনি গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। গঠনমূলক গণতান্ত্রিক চর্চা করা যাবে কিন্তু নৈরাজ্য করে নয়। দেশের জনসম্পদ ধ্বংস করা, জরুরি সেবা বন্ধ করে দেওয়া, অ্যাম্বুলেন্স আটকে রেখে রোগীকে ভোগান্তিতে ফেলা কখনোই কাম্য নয়।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত দুই বছরে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত ও আহতদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জন নিহত হন আর ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৯৭ জনে। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ঘটনাই গুজবনির্ভর।
দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় মানুষের আস্থাহীনতার কারণে মব সন্ত্রাস বেড়ে যায়। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেও মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়, নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইনে উঁচু-নিচু সবাই সমান। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। একশ্রেণির মানুষের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি যাতে আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, সে জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আনা জরুরি। বিচার হবে আদালতে, মব করে নয়। বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ যাতে সহিংসতায় না পৌঁছায় সে জন্য মানবাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা মব সন্ত্রাস নির্মূলে ভালো বার্তা দেবে।
