
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে দেশের পোশাকশিল্প। এতে অনেক মালিক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতিকে নতুনভাবে বেগবান করতে উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রেতৈরি পোশাকশিল্পগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা, প্রচলিত বাজারে মন্দা ও নানামুখী বাণিজ্যিক বাধার কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন নতুন বাজারের দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র-এই দুই বাজারেই রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নানা ধরনের শর্ত আরোপের কারণে সংকটে পড়েছে পোশাকশিল্প খাত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, গড়ে প্রতি অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ এই খাত থেকে এসেছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অতিরিক্ত বাজার নির্ভরতার ঝুঁকি। এই বাস্তবতায় নতুন ও অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশের উদ্যোগকে পোশাক খাতের জন্য সময়োপযোগী ও কৌশলগত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিলিয়ে নতুন বাজারে রপ্তানির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ১৪ শতাংশের কিছু বেশি। খাত সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ছিল এই অংশকে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, নতুন বা অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী।
বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলারসংকট এবং ভোক্তা ব্যয়ের চাপের কারণে এসব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্যোক্তাদের মতে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে যেখানে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, সেখানে নতুন বাজারে বাংলাদেশকে দামে কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, নতুন বাজারে পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে বিপণন দুর্বলতা এবং বাজার গবেষণার অভাব। বিজিএমইএর তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাক কারখানা এখনো ক্রেতানির্ভর অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি কিংবা সরাসরি বিদেশি খুচরা বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে নতুন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দৃশ্যমানতা তৈরি হতে সময় লাগছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন বাজারের সন্ধান এখন শুধু কৌশলগত লক্ষ্য নয় বরং সময়ের দাবি। পরিসংখ্যান বলছে, উদ্যোগ থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো নয়। কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া নতুন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা কঠিন হবে। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে না পারলে বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে দেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে নতুন বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
দেশের পোশাকশিল্পের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে বন্ধ কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পোশাক রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টিতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। পোশাক খাতকে আরও টেকসই এবং নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ দিতে হবে। শুধু শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে পোশাক খাতের ইতিবাচক দিক ও সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বাজারের খোঁজে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
