
আমি অন্তদর্শীর আত্মকথায় লিখেছি যে,
আমি আমার মার ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে পারিনি। আমি রক্ত গোলাপের উপর একটি
প্রজাপতিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার পেছনে ধাবমান হয়েছি। কিন্তু বিখ্যাত মানুষ
হতে ভয় পেয়েছি। আমি সাধারণ মানুষের একজন হয়ে তাদের সৌভাগ্যে এবং বিনয়ে
তাদের অসহায়তা এবং শ্রমে তাদেরই একজন হতে চেয়েছি। তবে হতে চাওয়া এক কথা আর
যথার্থ হওয়া অন্য কথা। সন্ত কবীর বলেছেন, রখাসুখা গমের রুটি তার স্বাদই বা
কি। সুতরাং তাতে লবণ আছে কি নেই সেটা ভেবে কি কোনো লাভ আছে। শিরোদেশ যখন
দান করেছি তখন রোদন করে তো লাভ নেই। কথাটির অর্থ হচ্ছে মানুষের প্রীতির
মধ্যে, মানুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে, মানুষের বেদনার মধ্যে, মানুষের অসহায়তার
মধ্যে মানুষের চিত্তের শুভবুদ্ধির মধ্যে জাগ্রত হতে পারাই সবচেয়ে বড় কথা।
যিনি কবি তিনি মানুষের বিভিন্ন অভিনিবেশের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করবার
চেষ্টা করেন। পৃথিবীতে জীবন ক্ষণকালীন এবং মৃত্যু অবধারিত। অকস্মাৎ একটি
বজ্রপাতে একটি বৃক্ষ যেমন নিঃশেষ হয়ে যায় মৃত্যুও তেমনি মানুষের
অপ্রস্তুতির মধ্যে তাকে নিঃশেষ করে। সুতরাং যতদিন আমরা জীবিত থাকি ততদিন
আমাদের কর্তব্য হচ্ছে কর্তব্যবোধে মানুষে মানুষে সম্পর্কের একটি সর্বস্ব
নির্মাণ করা। আমাদের মৃত্যু যদি কখনো না হতো আমরা তাহলে কি অনন্তকাল প্রেম ও
মমতার মধ্যে বাস করতাম? ঘৃণা ভুলে যেতাম এবং ঈর্ষার চিহ্ন থাকতো না?
ব্যর্থতায়
ভীত না হয়ে অনবরত নতুন করে জীবন আরম্ভ করবার চিন্তা করতাম? এসব প্রশ্নের
উত্তর কি জানি না, শুধু জানি এ পৃথিবীতে সময় নেই বলেই আমাদের এত ভয় বিদ্বেষ
ও ঘৃণী। জীবনে এবং মৃত্যুতে পরিত্যক্ত হবে বলেই আমরা সবসময় ঈর্ষার মধ্যে
বাস করি। জীবনের যাত্রা সুষম ও সুস্থ করতে হলে, সম্পূর্ণ করতে হলে আমাদের
সকলকে প্রেমে ও বৈরাগ্যে একত্রিত হয়ে পথ চলতে হবে। আমাদের মমতার প্রয়োজন।
মানুষের চরম অসহায়তা তখনই হয় যখন সে অনুভব করে যে কেউ তাকে ভালো বাসছে না।
যে নিঃশ্বাসে আমাদের জীবন সচেতন তা প্রেমের নিঃশ্বাস, যে অন্ন গ্রহণ করছি
তাও প্রেমে অভিষিক্ত। সর্বমূহুর্তের জন্য এ প্রেমকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
তখন শূন্যতায় ভীত না হয়ে মমতাবোধে অবসরকে সম্পূর্ণ করবো। সমৃদ্ধির
পৃথিবীতে, সমাজে নিয়মিত পথযাত্রার পরিমাপসহ বাক্যালাপের বন্ধ্যাত্বে এবং
সহনশীলতার অভাবের নিঃসতায় আমরা হৃদয়কে হারিয়ে ফেলেছি। অভিমানের মূল্য নেই
শোকের তাৎপর্য নেই শুধু প্রতিদিন অপরিসীম শূন্যতায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।
এভাবে সময় হারিয়ে কোনো কিছুই দেখতে পাই না। কখন যে চড়ুইগুলি এসে কলরব করে
চলে যায় জানি না আমগাছের নতুন পাতাগুলি দেখতে চেয়েও দেখা হয় না। শুধু যখন
শুকনো পাতায় শব্দ করে কাঠবিড়ালী গাছ বেয়ে ওঠে এবং একটি কাক হঠাৎ আর্তনাদ
করে তখন মনে হয় আনন্দের সঞ্চয়গুলি বুঝি হারিয়ে গেল। তখন ভাবি দুপুরের রোদে
চাঁপাফুল হয়তো মমতা ছড়িয়েছে, বটগাছ ছায়া বিছিয়েছে কিন্তু আমি সে মমতা এবং
কোনোটাতেই নেই। আমি এ মুহূর্তে একটি বিরাট কর্মব্যস্ততার উচ্চকণ্ঠ মাত্র।
শিল্পী
মার্ক শাগাল তার মত্যুর কিছুদিন পূর্বে এক বান্ধবীকে একটি পত্র লিখেছিলেন
আমি জানি আমি আর দীর্ঘদিন বাঁচবো না। ভাববার চেষ্টা করছি এটা কি কোনো
দুঃখের কথা না অসহায়তার কথা? জীবন তো একটি উৎসব। যারা তাদের কর্মের উৎসাহের
মধ্যে এ উৎসবকে উদযাপন করে তাদের দুঃখ কিসের। আমি তো পৃথিবীর সৌন্দর্যকে
আমার দৃষ্টির ক্ষমতা যতটুকু সে ক্ষমতা দিয়ে দেখবার চেষ্টা করেছি, কখনো হলুদ
রঙ দেখেছি কখনো নীল, কখনোবা একগুচ্ছ ফুলের তরঙ্গ। যা কিছুই আমি দেখেছি
আমার নয়নকে উন্মুক্ত করে আমি দেখেছি। সুতরাং আমার দুঃখ নেই। আমি ক্লান্ত
এটা সত্য, আমি বসে একাকী ফুলের মালা গাঁথতে চাই। মেঘঢাকা আকাশের নীচে
তরুণ-তরুণীদের নৃত্য দেখতে চাই। এই উৎসবের জীবনযাত্রায় আমার জীবন
অনন্তকালীন হবে। সুতরাং মৃত্যুর জন্য আমার কোনো দুঃখ নাই।
পৃথিবীতে
কোনটা বিপাক এবং কোনটাইবা অকুশল জানি না। বাবা-মা উভয়ের কাছেই শুনেছি জ্ঞান
এবং প্রজ্ঞাই হচ্ছে যথার্থ কুশল। মানুষের চিত্ত ও কুশলগুলোকে সংগ্রহ করে।
কখনো কখনো চক্ষুর দ্বারা সংগ্রহ করে কখনো শ্রতির দ্বারা সংগ্রহ করে, কখনো
ঘ্রাণের দ্বারা সংগ্রহ করে, কখনো রসনার দ্বারা সংগ্রহ করে, কখনো কায়া
দ্বারা এবং কখনো হৃদয় দ্বারা সংগ্রহ করে। অনবরত পৃথিবীর পথে জ্ঞানকে আশ্রয়
করতে গিয়ে মানুষ তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে। প্রেমের প্রশান্তি উন্মুক্ত
হৃদয়ের সাহায্যেই গড়ে উঠে। আমার সৌভাগ্য যে আমি আমার মাকে চিরদিন আশ্রয়
করেছিলাম, কখনো অসম্ভবকে অনুভব করিনি। অভাব তো দু'রকম-বস্তুর অভাব এবং
হৃদয়ের অভাব। কখনো কখনো বস্তুর অভাব হলেও আমার মা হৃদয় দিয়ে তা সম্পূর্ণ
করতেন।
ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছেন, এক সময় রশ্মি বিকিরণ খুব
উজ্জ্বল ছিল, কিন্তু এখন তা আমার দৃষ্টির সম্মুখ থেকে সরে গেছে। সে সময়টি
আর ফিরিয়ে আনা যাবে না যখন সবুজ ঘাসেও সমারোহ ছিলো এবং পুষ্পপল্লবে মহিমা
ছিলো। তিনি তার শৈশবের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা কোনও মুহূর্ত
থেকেই নির্বাসিত নই। বিপুল মহিমান্বিত পৃথিবীতে প্রতিদিন সকাল বেলা যখন
সূর্যের আশ্চর্য আলোকের অভ্যুদ্বয়ের মধ্যে জাগরিত হই তখন জন্ম থেকে মৃত্যু
পর্যন্ত একটি মাত্র অস্তিত্বের সাড়া অনুভব করি। বিশ্বজগতে কোনও কিছুই হারায়
না, কোনও কিছুই যথার্থভাবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় না। প্রতিদিন নানা
কর্ম এবং প্রবৃত্তির মধ্যে আমরা বাস করি বলে অনেক মহিমা হয়তো স্মরণে আসে
না। কিন্তু তাই বলে কোনও কর্মের আবেষ্টনে আমরা কখনো হারিয়ে যাই না। এটা
অবশ্য সত্যি যে প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড চিত্তের বিশ্রাম থেকে আমাদের দূরে
রেখেছে, আমাদের চেতনাকে আড়াল করেছে, হয়তো আমরা অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয়িত
হচ্ছি, কিন্তু অজস্র বিচ্ছিন্নতার মধ্যে স্মৃতি কিন্তু কখনো কখনো নির্মল
উদার শান্তির মধ্যে আমাদের টেনে নিয়ে আসে।
আমার মার ত্যাগের কথা
বলছিলাম। তিনি স্বার্থের বন্ধন ছেড়েছিলেন অহংকারে নয় কুহেলিকা থেকে মুক্তি
পাবার জন্য। তিনি যে বিত্তকে ত্যাগ করেছিলেন অত্যন্ত সহজেই তা ত্যাগ
করেছিলেন। বিত্তের অহংকার তার ছিলো না প্রয়োজনের তাগিদ ছিলো। অত্যাচার থেকে
তাঁর সন্তানদের তিনি সরিয়ে আনতে পেরেছিলেন এখানেই তার জয়। তার চরম লক্ষ্য
ছিলো স্বাধীন পরিচর্যার নিজস্ব ক্ষমতার আবরণে আমাদের জড়িয়ে রাখা।
রবীন্দ্রনাথ
বলেছেন যে মানুষের কর্তব্য হচ্ছে অনবরত শুভ কর্মের মধ্যে আপনাকে বিকশিত
করা এবং আপনাকে সমর্পণ করা এবং অনির্বচনীয়র প্রতি আপনাকে একেবারে উন্মুক্ত
করে ধরা। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটি অনন্ত জীবন রয়েছে। সে অনন্তের পরিমাপ
কে করবে অর্থাৎ সে অনন্তের পরিমাপ কে করতে পারে? একটি পুষ্পের সম্পূর্ণতা
ক্ষণকালীন কিন্তু তার শোভা সম্পদ আমার দৃষ্টিতে চিরকালীন। নদী যেমন তার বহু
দীর্ঘ ধারাবাহিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে স্রোত বহন করে কত পর্বত প্রান্তর
মর নগর গ্রামকে স্পর্শ করে। আপন সুদীর্ঘ যাত্রার বিপুল সঞ্চয়কে প্রতি
মুহূর্তে নিঃশেষে মহাসমুদ্রের নিকট উৎসর্গ করতে থাকে যখন তার অবিশ্রাম
ধারার প্রবাহেরও অন্ত থাকে না এবং সঙ্গে সঙ্গে তার চরম বিরামেরও সীমা থাকে
না-মানুষকেও তেমনি একইভাবে বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে বিপুলভাবে মহৎ সার্থকতা
লাভ করতে হয়। তার সফলতা সহজ নয়। নদীর মত প্রতি পদে সে নিজের পথ আপন কর্মবেগ
রচনা করে চলে। কখনো ভাঙ্গে কখনো গড়ে, কখনো বিভক্ত হয় কখনো সংযুক্ত হয়, যখন
বাধা উপস্থিত হয় তখন সে বাধাকে অতিক্রম করে সে আপনার সীমাহীন পরিণামে এসে
উপস্থিত। যখন সত্যি সে পরিণাম সে পায় তখন বহু বিচিত্রকে অতিক্রম করে এসেছে
বলেই মহান একের সঙ্গে তার মিলন সম্পূর্ণ হয়। যদি কোথাও কোনো বাধা না থাকতো
তবে মানুষ মহৎ হতে পারতো না। বাধাই তো মানুষকে সম্পূর্ণ করে বিরাটের মধ্যে
তাকে বিকশিত করে।
পৃথিবীতে দুঃখ আছে এবং সে দুঃখের পরিসীমা নেই আমরা
বলি। কিন্তু বিস্ময়ের কথা এই যে বিশ্বব্যাপী দুঃখ সেই দুঃখের আঘাতেই সংসারে
ভাঙ্গাগড়া চলছে। এই ভাঙ্গাগড়া কি আর্তনাদের? আমার তো মনে হয় এই ভাঙ্গাগড়ার
জন্যই পৃথিবীতে অহরহ বিচিত্র তরঙ্গ আমরা লক্ষ্য করি। সে তরঙ্গ ধ্বনি
বিভঙ্গের বর্ণবিভার এবং উন্মুক্ত যাত্রার। মানুষ তো ক্ষুদ্র নয়, তাই
ক্ষুদ্রুতাতে মানুষের শেষ নয়। ক্ষুদ্রুতা নিয়ে জীবন নিঃশেষ করলে আমরা
অসঙ্গত হতাম। দুঃখের মহিমায় মানুষ মহীয়ান হয়েছে। দুঃখের অভিষেকে মানুষ
অনির্বচনীয়কে পেয়েছে। সুতরাং যিনি বেদনার সীমা অতিক্রম করে চলেন তিনিই
আনন্দলোককে আবিষ্কার করেন।
২
আমার মার জীবনকে আমি এভাবেই বিবেচনা
করি। তিনি ঐশ্বর্যের প্রতাপকে ছেড়ে ক্ষুদ্র সংসারের দুঃখকে গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু সেই দুঃখ তাকে পীড়িত করেনি বরঞ্চ দীপ্তিময়ী করেছিল। শৈশবে এ সমস্ত
আমি বুঝিনি। বড় হয়ে বিভিন্ন সংকটের সম্মুখীন হয়ে আমার মাতার কথা আমার মনে
পড়েছে। মনীষী কবীর চৌধুরী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তুমি, কখনো কোনো ব্যাপারে
হতাশ হওনি? আমি উত্তরে বলেছিলাম, না আমি কখনো হতাশ হইনি, তার কারণ জীবন
যাত্রায় উত্থান পতন তো থাকবেই। সেই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েই তো
আমাদের যাত্রা। এই যাত্রা পথে যে সমস্ত বিঘ্ন উপস্থিত হয় সে বিদ্যাকে
অতিক্রম করতে না পারলে আমি কি করে জীবনে সফলকাম হবো। প্রতিউত্তরে তিনি
বলেছিলেন মনে রাখবে পৃথিবীতে কোনো কিছুই অনায়াসে পাওয়া যায় না, নিবিড়ভাবে
অথবা সমগ্রভাবে পাওয়া যায় না যদিনা দুঃখের মধ্যে দিয়ে আমরা কঠিনভাবে না
পাই। দুঃখের কারণেই জীবন দুর্লভ হয়েছে। গৌতম বৌদ্ধ মানব জন্মের কারণ
অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছিলেন। তার সামনে প্রশ্ন ছিল কয়েকটি। জীর্ণতাই
যদি সত্য হয়, দুঃখই যদি সত্য হয় এবং মৃত্যুই যদি অবধারিত হয় তাহলে মানুষ
কেন জন্মগ্রহণ করলো? তিনি এ সমস্তকে অতিক্রম করার কথাই বলেছিলেন যার নাম
তিনি দিয়েছিলেন নির্বাণ। আমার কাছে গৌতম বুদ্ধের দুঃখ অতিক্রম করার এই
প্রক্রিয়াটি অপূর্ব মহিমামণ্ডিত বলে মনে হয়। বর্তমান কালের মানুষ তার
কর্মের দায়ভাগের মধ্যে নিযুক্ত থেকে দুঃখের সর্ববিধ কল্লোল অতিক্রম করবে
তাহলেই তো তার শান্তি এবং তাহলেই তো মৃত্যুর ঊর্ধ্বে তার প্রতিষ্ঠা।' তার
কথাগুলো আমি আমার মতো করে বললাম।
কবি টেড হিউজের সঙ্গে আমার নিবিড় পরিচয়
ছিল। তার গৃহ ছিল বিবিধ প্রকার প্রস্তর খণ্ডের সংগ্রহশালা। হীরক ছিল
সেখানে, সমুদ্র তীরের নুড়ি পর্যন্ত তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। কত বিচিত্র তাদের
রং এবং আকৃতি। অভিভূত হয়ে আমি তাঁর এই সংগ্রহ দেখেছিলাম। জিজ্ঞেস
করেছিলাম, পাথরের প্রতি আপনার এ আগ্রহ হল কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন ‘সকল
জীর্ণতাকে উপেক্ষা করে সকল আঘাতকে অতিক্রম করে যে শক্তির সংহতরূপে পাথরগুলো
জেগে ওঠে তার সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন কিছু নেই। কত যুগের প্রতাপ সহ্য করে
একটি কাষ্ঠখণ্ড হীরকে রূপান্তরিত হচ্ছে তা অবর্ণনীয়। সুতরাং পাথরের দিকে
দৃষ্টিপাত করলে যেমন ক্লেশকে অনুভব করা যায়, এবং অবশেষে জোতির্ময়কে অনুভব
করা যায়। আমি তাই আজীবন এই পাথরই সংগ্রহ করেছি।'
সাধারণভাবে আমাদের
ক্ষুদ্র সংসারের মধ্যে আমার মা তার প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড এবং শাসনের মধ্য
দিয়ে তার ছেলেমেয়েদের মানুষ করে তুলেছিলেন। আমি তাই তার কাছে চিরদিনের জন্য
ঋণী এবং চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞ। একটি অসহায় অবস্থা থেকে তিনি আমাকে দৃঢ়তার
মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার অসাধারণ মহিমা আজও আমাকে সর্বমুহূর্তে
আচ্ছন্ন করে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ শৈশবে মাতৃহারা হয়েছিলেন; কিন্তু
শান্তিনিকেতনে একটি প্রার্থনা সভায় তিনি বলেছিলেন যে স্বপ্নে তিনি কখনো
কখনো তার মাকে দেখেন এবং স্বপ্ন যখন ভেঙ্গে যায় তখন তিনি অনুভব করেন যে তার
মা তার সঙ্গেই আছেন। অবিরাম জলধারা যেমন একটি প্রস্তরখণ্ডকে পরিচ্ছন্ন করে
দেয় তেমনি তার জীবনধারাও তার মাতার অস্তিত্বের দ্বারা প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন
হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘প্রেম তো কিছু না দিয়ে বাঁচতে পারে না। মাতা
জীবিত থাকুন বা নাই থাকুন তিনি আমাদের প্রেমে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন।
গ্রামের
জীবনে রাতের বেলা মোমের বাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন
ফু দিয়ে বাতি যেই নিভিয়ে দিয়েছি তখনই পূর্ণিমার চন্দ্রের আলোক জানালা দিয়ে
এসে আমাদের ঘরে পুরিপূর্ণ করে দিল। শৈশবের স্মৃতিমাখা আলোয় উৎসাহিত হয়েছি,
অভিভুত হয়েছি কিন্তু তাৎপর্য বুঝিনি। এখন মনে হয় আমরা ক্ষুদ্রের দ্বারা
বৃহৎকে আড়াল করি! যখন মোমবাতিটি জ্বলছিল তখনতো চাদের আলো দেখা যায়নি
কিন্তু। বাতি নিভে যেতেই চন্দ্রালোক সমস্ত কক্ষকে আপুত করে দিয়েছিল। এভাবেই
মানুষ প্রতিদিন ক্ষুদ্রকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয় আবার সঙ্গে সঙ্গে
ক্ষুদ্রুতাকে অতিক্রম করতে হয়। তাই তো আমাদের জীবনে বঞ্চনা আছে অসহায়তা আছে
এবং আছে বলেই মহত্বের মাধুর্য আছে, ত্যাগের বিভা আছে এবং অসার্থকতার মধ্যে
সার্থকতার প্রদীপ আছে। এ কারণেই আমি স্থবিরতাকে স্বীকার করি না,
স্রোতোবাহী নদীর মতন জীবনের গতিময়তাকে স্বীকার করি।
রবীন্দ্রনাথ তার
একটি কবিতায় ‘ঝিকিমিকি আলোর খেলায় আমলকি বনের অধীরতার কথা লিখেছিলেন এবং
আরো লিখেছিলেন যে নতুন পাতার কাঁচা সবুজ রং থেকে মানুষের রক্তে কিসের যেন
খবর আসে। শৈশবে রবীন্দ্রনাথের এ কথাগুলো পড়িনি কিন্তু আমার মনে হয় তিনি তার
শৈশবের অবস্থাকেই এ কথাগুলোর মধ্য দিয়েই বর্ণনা করেছেন। শৈশবকালে আমরা
প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকি-যেমন আমলকি পাতার সঙ্গে, তেমনি নদীর
স্রোতের সঙ্গে, তেমনি বাতাসের প্রবাহের সঙ্গে, তেমনি আকাশের মেঘমণ্ডলকে
বিচিত্র রূপান্তরের সঙ্গে। এ অভিজ্ঞতার তুলনা হয় না।
আমরা শৈশবে যে
জীবনধারা দেখেছি আমার চতুর্দিকে এখন সে জীবনধারা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
বিভিন্ন মানুষকে দেখলাম বিভিন্ন রকমের বেশে এবং এসব মানুষের সামাজিক এবং
ধর্মীয় আচরণের মধ্যেও ব্যবধান ছিল। কাউকে দেখেছি মন্দিরে যেতে, সন্ধায়
যেখানে কাসার ঘন্টা বাজতো এবং প্রতিমার সামনে পূজারী পূজার উপাচার রাখতো,
কাউকে দেখেছি মসজিদে যেতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে। ছোটবেলায়
খৃষ্টান কিংবা বৌদ্ধ এদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল না। কিন্তু
এই যে হিন্দু এবং মুসলমান সামাজিকভাবে এবং ধর্মীয়ভাবে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ
করতো এগুলো আমার কাছে অসম্ভব এবং অদ্ভুত মনে হয়নি। কৌতুহল যে না হত তা নয়।
তাই মাকে জিজ্ঞেস করতাম যে এই রকম এক একজন এক এক রকম পোশাক পরে কেন, অথবা
একজন পূজা করে একজন মসজিদে যায় কেন? আমার এখনো মনে আছে মা সংক্ষিপ্ত উত্তরে
বলেছিলেন বাবা চারদিকের গাছপালার, দিকে তাকিয়ে দেখতো সব গাছ কি এক রকম? সব
গাছ কি এক রকম ফুল ও ফুল দেয়? সব গাছ কি সবল গাছ? কোনো গাছ বিরাট আকৃতির
চতুর্দিকে ডালপালা ছড়ানো। কোনো গাছ লম্বা হয়ে ওঠে, কতকগুলো পাতা ছড়িয়ে ঠায়
দাঁড়িয়ে থাকে। যেমন সুপারি নারকেল! আবার কোনো গাছকে গাছই বলা যায় না।
সেগুলো লতা, কিন্তু সবগুলো আসলে গাছই, অর্থাৎ সবারই জন্ম আছে, বৃদ্ধি আছে,
ফলমূল দেবার আছে এবং অবশেষে মৃত্যুও আছে। মানুষও সেরকম। কেউ ধুতি পরে, কেউ
পাজামা পরে, কেউ লুঙ্গি। কেউ মাথায় টুপি দেয়, কারো মাথায় বাবরি চুল, কারো
মাথা সম্পূর্ণ কামানো। এদের মধ্যে যারা হিন্দু তারা মন্দিরে যায় পূজো করে,
আর যারা মুসলমান তারা মসজিদে যায়। কিন্তু সবাই মানুষ। সবারই জন্ম হয় সবাই
বড় হয় বিয়ে করে সংসারী হয় অবশেষে মৃত্যু ঘটে। সুতরাং মানুষকে কখনো অন্য
মানুষ ভাবতে নেই অথবা অন্য কোনো রকম জীবন ভাবতে নেই। সবাই আমরা মানুষ
হিসেবে এক। কিন্তু গাছে গাছে যেমন পার্থক্য তেমনি সামাজিক এবং ধর্মীয় আচরণ
পার্থক্য আছে। মা কথাগুলো আরো সহজ করে বলেছিলেন এবং কিছু উদাহরণ দিয়েও
বলেছিলেন। আমি অবিকল যে সেরকম উপস্থিত করতে পারলাম তা ঠিক নয়। তবে আমার
বিশ্বাস মতে যতদূর সম্ভব মার বক্তব্যটুকু এখানে ঠিকই পেশ করেছি।
আমার
শৈশবে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ ছিল না। কোনো বিরোধ ছিল না। রথের
মেলায় উপস্থিত হত হিন্দু মুসলমান সকলেই। তেমনি ঈদের মেলায়ও হিন্দু মুসলমান
সকলেই উপস্থিত হত। গ্রামে প্রকৃতির যে ঔদার্য নদীর যে স্নিগ্ধতা এবং
বাতাসের যে অনাবিল প্রফুল্লতা সবগুলোই যেন সেকালের মানুষের মধ্যে সংক্রমিত
হয়েছিল।
৩
আমার শৈশবের কথা বলতে গিয়ে মা অনেক পরে একবার বলেছিলেন যে
জন্মগ্রহণ করার পর আমার কানে আযান দেয়া হয়েছিল এবং আযান দিয়েছিলেন আমার এক
মামা। আমার এখন মনে হয় জন্মের পর সুললিত কণ্ঠে একটি শিশুর কানে আযান
দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাকে একটি মধুময় মুহূর্তের মধ্যে জাগ্রত করা। এই কথাটি
এইজন্য বললাম যে, ইসলামে সর্বপ্রথম যখন আযান প্রবর্তিত হয় তখন সর্বপ্রথমেই
অনুসন্ধান চলেছিল একটি সুললিত কণ্ঠস্বরের এবং সে সুললিত কণ্ঠ ছিল হযরত
বেলালের। উপমা স্বরূপ বলা হয়েছে যে হযরত বেলালের আযান শুনে পশুপাখি এবং
গাছের পাতা স্তব্ধ হয়ে থাকতো। মনে হয় তারা যেন সেই সুললিত সুর লহরী শ্রবণ
করছে। আযানের মধ্যে এভাবেই ইসলামের প্রাথমিক যুগেই সঙ্গীতের সুষমা দান করা
হয়েছিল-যেন সেই সুষমায় আকৃষ্ট হয়ে সকলেই নামাজের জন্য একত্রিত হয়। সুতরাং
শিশুর কানে আযান দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাকে আনন্দের মধ্যে, সুর-সাম্যের মধ্যে
এবং সংহতির মধ্যে বরণ করে নেওয়া। এই আপাততঃ ধর্মীয় ব্যাপার বলে মনে হলেও
এটি একটি সামাজিক আচরণ এবং বিধি। হিন্দু সমাজেও অনুরূপ বিধি প্রচলিত আছে।
তারা শিশুর কানে মন্ত্র দেয়। তাদের মন্ত্র দেওয়াটা একটি ধর্মীয় বিশ্বাস।
কিন্তু আমার মনে হয় ধর্মীয় বিশ্বাসের চাইতেও এখানে বড় কথা হচ্ছে একটি
শিশুকে আমি কর্কশ শব্দের সঙ্গে পরিচিত করাচ্ছি, না সুমধুর সুর লহরীর সঙ্গে?
আমার মনে হয় ধর্মীয় চিন্তাটাকে অস্বীকার না করেও আমরা বলতে পারি যে শিশু
জন্মলগ্নেই পৃথিবীর মধুরতার সঙ্গে পরিচিত হোক এই বোধহয় আমাদের আন্তরিক
অভিপ্রায়, অন্তত শুরুতে বোধহয় তাই ছিল।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন, একটি
শিশু মাতৃক্রোড়ে যখন থাকে তখন যে স্নিগ্ধ বাতাস তাকে স্পর্শ করে যায় অথবা
যেসব শব্দ তার কানে সাড়া তোলে সেগুলো কোনোদিন হারিয়ে যায় না জীবনে তার
জাগরণ এগুলোর মধ্য দিয়েই। শৈশবের নিস্পাপ পবিত্রতা সারা জীবন তাকে উদ্বেলিত
করে এবং প্রায় সময় ও আকাঙ্ক্ষীকে নির্মাণ করে। বড় হয়ে যখন ওয়ার্ডসওয়ার্থের
কবিতা পড়েছিলাম তখন এ কথাগুলো আমার বড় ভালো লেগেছিল এবং তখনই আমার শৈশব
মুহূর্তের সমস্ত গ্লানির অপসারণ করে আমাকে আনন্দিত করেছিল। শৈশবের কোনো
ঘটনাই কিন্তু হারিয়ে যায় না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ যেভাবে বলেছেন যে আমরা বিপুল
উজ্জ্বলতায় এবং মনোহারিত্বে এই পৃথিবীতে আসি বিধাতার কাছ থেকে যিনি আমাদের
পরম আশ্রয় এবং সান্ত্বনা।
বাবা কখনো কখনো গল্প বলতেন এবং গল্পগুলো
মহাপুরুষদের কাহিনী। কিন্তু তিনি কোনরূপ উপদেশের কথা বলতেন না। তিনি
অন্তরঙ্গ সুরে আকর্ষণীয় করে গল্পের মতো করে কাহিনীর ক্রমধারা তৈরী করতেন
এবং আমরা শুনতাম। এই শোনার মধ্য দিয়ে আমি একটি সমৃদ্ধ জীবনকে প্রত্যক্ষ
করতাম, কিন্তু অভিজ্ঞতার প্রশ্রয় ছিল বলে তখন সে কথা বলতে পারতাম না। আজ
মনে হয় জীবনে স্রোতস্বিনী সমস্ত স্মৃতিকে একত্রিত করে আমার সম্মুখ দিয়ে
নিয়ে চলেছে। আমি সব স্মৃতিকে ধরে রাখতে পারছি না। স্মৃতির কোনো ধারাবাহিকতা
নেই; কিন্তু একটি বালকের চিত্তে শৈশবকালের অভিজ্ঞানগুলোর একটি ধারাবাহিকতা
নিশ্চয়ই নির্মাণ করে। আজ তাই স্মৃতিকে অনুধাবন করতে গিয়ে আমার মার সুন্দর
মুখকান্তি এবং বাবার বিনম্র তন্ময়তা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।
বার্ট্টান্ড
রাসেল বলেছেন যে গৃহের অনুভূতি এবং অন্তরঙ্গ সকলের অনুভূতি শিশুর মনে তখনই
জাগতে আরম্ভ করে যখন সে ঘরের মেঝেতে ধুলোর ওপর আঙ্গুল দিয়ে দাগ কাটতে
শেখে। তখনই সে একটি বীজ বপন করে যা পরিণতিতে একটি বিরাট বৃক্ষে রূপান্তরিত
হয়। শিশুর পরিচিত পৃথিবী প্রথমে একটি কক্ষ, ক্রমান্বয়ে অনেকগুলো কক্ষ
অবশেষে সমগ্র একটি গৃহ এবং সর্বশেষে একটি দেশ। যে দেশের বাতাস এবং পানি
তাকে উচ্ছল এবং জীবন্ত করে। কথাগুলো অত্যন্ত মধুর এবং উষ্ণ। শৈশবের বরাভয়
মানুষের জীবনের একটি আশ্রয়ের মতো, একটি উজ্জ্বলতার মতো একটি মধুর বেদনার
অভিষেকের মতো। আমি তো আমার মধুর শৈশবকে কখনোই ফিরে পাব না কিন্তু স্মৃতিগত
তাৎপর্যে তা আমাকে চিরকাল সম্মানিত করছে, আমাকে সমৃদ্ধ করছে এবং আমার
অগ্রযাত্রাকে দীপান্বিত করছে।
আমার শৈশবকালে গ্রামের জীবনে পরিচ্ছন্নতা
ছিল, তাই সকল দৃশ্যেরই সুস্পষ্টতা ছিল। কথার ভিড় ছিল না, মানুষের ভিড় ছিল
না, শুধু গাছ ও লতাপাতার ভিড় ছিল এবং অফুরন্ত সবুজের ঔদার্য ছিল। এবং সেই
ঔদার্যের মধ্যে যেসব শব্দ এসে ভিড় করতো তাদের কোনো পরাভব ছিল না। বড় হয়ে
বুঝেছি এ শব্দ যেমন বিশ্বাস ও অনুভূতির আদিমতা, তেমনি প্রত্যয়ের দৃঢ়তা,
তেমনি জিজ্ঞাসার অস্থিরতা, তেমনি অসম্ভবের আয়োজন।
চিত্রকর যেমন রঙ দিয়ে
রেখা দিয়ে ভাষার সন্ধান করেন, একজন কবিও তেমনি প্রতিদিনের বিশ্বে কল্লোলিত
কলকণ্ঠের মধ্যে শব্দের ঔদার্য এবং সম্মোহন সন্ধান করেন। শৈশবে গ্রামে
সুদুর্লভ সবুজের বন্যায় আমি যখন কোনো পাখির কণ্ঠস্বর শুনতাম তখন পাতায়
পাতায় বাতাসের সাড়ায় জীবনের স্পন্দন অনুভব করতাম। প্রতিদিন ঘাসের সৈকতে
সবুজের সমারোহে আমার নিরুদ্ধ কণ্ঠ তখনই মর্মের গভীরে যথার্থ কবিতায় বাঙময়
হয়েছিল। সেদিনের কথা আজো যেন চিরকালের এ মুহুর্তেরই কথা। কবিতা পাঠে আমি
আনন্দিত হই এবং কবিতা স্নায়ুকে শিহরিত করে। দুঃখ নিয়েই হোক অথবা ব্যর্থতা
নিয়েই হোক কবিতা আমার জন্য একটি উৎসবের আয়োজন। শব্দ যখন আমাকে অভিভূত করে
তখন আমি আমার শৈশবের দিন যাপনের রহস্যকে স্বাগত করি। সেই কবে কোন অতীতে
শব্দের কম্পন জেগেছিল আজও তার জন্য আমার কাতরতা রয়েছে। আমি সেই কাতরতার
সাহায্যে আমার বর্তমানের বিশ্বাসের অভিধর্ম এবং উপলব্ধির উতরোল নির্মাণ
করেছি।
মানুষের জীবনে কতগুলো অনুভূতি থাকে সে অনুভূতিগুলো দৃষ্টির,
স্বাদের, ঘ্রাণের, শ্রবণের এবং স্পর্শের। এই অনুভূতির সাহায্যেই আমরা
প্রাণবন্ত মানুষ বলে পরিচিত হই। শিল্প ও সাহিত্যকর্মে এসব অনুভূতির দায়ভাগ
প্রচণ্ড। পৃথিবীর সকল বস্তুর তাৎপর্য সৌন্দর্য এবং মোহনীয়তাকে আমরা অনুভব
করি এসব অনুভূতির সাহায্যেই। শীতকালে রোদের তাপটি ভালো লাগে, গ্রীষ্মকালে
ছায়া ভালো লাগে। এটা স্পর্শের অনুভূতি থেকেই জাগে। তেমনি অন্যান্য
অনুভূতিও। এসব অনুভূতি নিয়ে সৃষ্টিকামী মানুষ তাদের সৃষ্টিকর্মের কল্যাণ
ব্রতে অগ্রসর হয়। আমার জীবনে এবং আমার জীবনেই বা বলি কেন সকলের জীবনেই
শৈশবকালেই এ সমস্ত অনুভূতির উন্মেষ ঘটে। তবে শৈশবে বিশ্লেষণের ক্ষমতা থাকে
না, তাই বিশ্লেষণ করতে আমরা পারি না, আমরা শুধু ভালো লাগাকে ব্যক্ত করতে
পারি। অসুস্থতার পর অতি সাধারণ খাবারও আমার কাছে সুস্বাদু হয়ে উঠেছিল। সেই
খাবারের স্বাদ এবং মধুর অনুভূতি। আজো আমি অনুভব করি।
সেকালের জীবনে এই
পরিচ্ছন্নতাই ছিল মানুষের স্বভাব এবং অনুশীলন। যেমন একটি শিশু খেলা করতে
গিয়ে ঘাসের গন্ধের মধ্যে নিরাবরণ পরিচ্ছন্নতায় শুয়ে পড়ে তেমনি পরিচ্ছন্নতা
ছিল জীবনের সকল ক্ষেত্রেই। প্রকৃতির বদান্যতা ছিল শংকা ছিল , ভবিষ্যতের
জন্য কোন অভিপ্রায় ছিল না কিন্তু একটি মধুর অনুভূতির বিস্ময়কর এবং লীলাময়
প্রশান্তি ছিল।
লেখার প্রতি সম্মান এবং লেখনীর প্রতি সম্মান, এমনকি যে
কালি দিয়ে কোনো কিছু লেখা হয় এবং যে কাগজের উপর লেখা হয় সেসবের প্রতি
সম্মান প্রদর্শন আমি দেখেছি। আমাদের হাতে মুখে কালি লাগলেও পায়ে যাতে কালি
না লাগে সেদিকে আমাদের লক্ষ্য থাকতো। কলম মাটিতে পড়ে গেলে তুলে নিয়ে চুমু
দিতাম। মা বলতেন কলম, কালি এবং কাগজ হচ্ছে পবিত্র। তার কারণ কুরআন শরীফ
কাগজের উপর কালি এবং কলম দিয়ে লেখা হয়ে থাকে। আমরা কাগজ কলম ও কালির প্রতি
সম্মান দেখিয়ে মূলতঃ কুরআন শরীফের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করে থাকি।
যে
সময় আমরা অতিক্রম করে এসেছি সে সময় গ্রামীন মানুষের জীবন ছিল স্বনির্ভর ।
জীবনের সকল প্রকার কর্মকাণ্ডের উপকরণ তারা নিজেরাই সংগ্রহ করতো। এই আশ্চর্য
সাবলীল স্বনির্ভরতা আজকের দিনে কল্পনা করা অসম্ভব।
