সোমবার ৯ মার্চ ২০২৬
২৫ ফাল্গুন ১৪৩২
নতুন সরকারের সামনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ ও বার্তা
এম সাখাওয়াত হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:১৭ এএম আপডেট: ২৪.০২.২০২৬ ২:০৭ এএম |

 নতুন সরকারের সামনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ ও বার্তা
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার মধ্যে একটা সুস্পষ্ট বার্তা রয়েছে। দেশের জনগণ চায়, বাংলাদেশ আগামী দিনে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চালু করলে তা যেন সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই চালু হয় এবং সে ভিত্তিতেই তা অব্যাহত থাকে। সম্পর্ক গড়ে উঠবে। দেশবাসী একটি ভালো নির্বাচন দেখার আশায় ছিল। কারণ, তারা বিগত ১৭ বছর সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি, ভোট দিতে পারেনি। এ কারণে মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলো। এ রকম শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। অন্তর্বর্তী সরকার যখন নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ভোট আয়োজন করা। সেটা সম্ভব হয়েছে। নির্বাচন ব্যাপক প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়েছে। এ জন্য আমি শুরুতেই দেশের মানুষ, অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানাই। রাজনৈতিক দলগুলোকেও অভিনন্দন জানাই। কারণ, তারা দায়িত্বশীল আচরণ করেছে বলে শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব হয়েছে। জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি কঠিন অবস্থায় দায়িত্ব নেয়। তখন অনেকেই বলাবলি করেছেন, সরকার নির্বাচন দেবে না। এরপর বলা হতো, নির্বাচন হলেও তা শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হবে না। পতিত শক্তি বারবার হুমকি দিয়েছে। প্রতিবেশী একটি দেশের বিরূপ ভাব ছিল। পরে দেশটি তাদের কূটনৈতিক অবস্থান বদলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভালো নির্বাচন করার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। সবকিছু মিলিয়ে একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ২০০৮ সালটি বাদ দিয়ে বলছি, আমার মনে হয়, এবার দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা নির্বাচন হয়েছে। ২০০৮ সালে সেনাবাহিনী নির্বাচনে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পেরেছিল। কারণ, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী ছিল। পরে কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত করা হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাদের বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তাকারী হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে দায়িত্বে রাখা হয়। এবার আবার তাদের পুরো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষভাবে তারা সে দায়িত্ব পালন করেছে।
এ নির্বাচনের মাধ্যমে এবারও প্রমাণ হলো, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই বাংলাদেশে ভালো নির্বাচন হয়। অবশ্য সারা জীবন তত্ত্বাবধায়ক অথবা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ভালো নির্বাচন করার অভ্যাসটি তৈরি করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত যেকোনো নামে হোক নিরপেক্ষ সরকার থাকা দরকার। অতীতের তিনটি নির্বাচন বিবেচনায় এবার পুলিশের ভূমিকা ছিল আকাশপাতাল তফাত। প্রশাসনও সঠিক ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন যদি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের এ ধারা অব্যাহত রাখে, তাহলে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। সেটার একটা ইতিবাচক সূচনা হলো।
এখন নতুন সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। আমি তিনটি বিষয়কে সামনে আনতে চাই। প্রথমত, ‘মেগা’ দুর্নীতি দমন করতে না পারলে নতুন সরকারকে বড় বিপদে পড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটি সরকার দ্রুত অজনপ্রিয় হওয়ার কারণ চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগ কম হয়। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে না পারলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে না। তৃতীয়ত, পরিকল্পনা। আমরা অনেক বড় বড় পরিকল্পনা করি। কিন্তু ছোট সমস্যা সমাধানে জোর দিই না। যেমন- দেশে বড় বড় সড়ক ও সেতু হয়েছে, কিন্তু নৌপথ উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়নি। তাই নিচে থেকে পরিকল্পনা করতে হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক কারণে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বহুপক্ষীয় যে সম্পর্ক, সে সম্পর্কের সর্বত্রই একটা শীতল অবস্থা বিরাজমান, যা মোটেই কাম্য নয়। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে যে শুভেচ্ছাবার্তা প্রেরণ করেছেন, তা ইতিবাচক বার্তাই বহন করছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যেহেতু দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, তাই আস্থার ঘাটতি মেটানোর জন্য দুই দেশের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার পরিধি বাড়াতে হবে; যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বস্তুত, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ভিজিট অব্যাহত থাকা দরকার। ভারত ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কড়াকড়ি করা হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভিসা প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ বা স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে অতি দ্রুত গুরুত্ব বাড়ানো দরকার। দুই দেশের মধ্যকার রেল যোগাযোগ, বাস যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সেগুলোকে আবারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আমাদের গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে যে চুক্তি আছে, সেটিও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এখন দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা উভয় দেশ উভয় দেশকে একসঙ্গে কাজ করার একটা প্রতিশ্রুতি দিতে পারি এবং অন্য যেসব বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হওয়া দরকার। বস্তুত, দুই দেশের দিক থেকে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই দেওয়া-নেওয়ার একটা জায়গা তৈরি করা যেতে পারে এবং এ প্রক্রিয়া ঠিকমতো চললে তবেই সম্পর্কটা স্বাভাবিক জায়গায় যেতে পারে।
দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান দূরত্ব কমাতে চাইলে জাতীয় স্বার্থে মৌলিক কিছু বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহমত পোষণ অত্যন্ত জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীল আচরণ করবে, এটাই প্রত্যাশিত। আমরা ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে চাই; আমরা যদি এ নীতিগত অবস্থানে দৃঢ়তা প্রকাশ করতে পারি, ভারতের কাছে সে বার্তাটা পৌঁছালে তখন তার ভিত্তিতেই ভারত বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনায় উদ্যোগী হবে।
সবশেষে, আমি বলতে চাই, বাংলাদেশকে আর পুরোনো পথে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। বারবার যদি আমরা এ ধরনের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পড়ি, তাহলে বাংলাদেশ যতটুকু এগোবে, তার চেয়ে বেশি পেছাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং আমরা আশা করি, যারা বিরোধী দলে থাকবেন, তারাও সঠিক ভূমিকা রাখবেন। বাংলাদেশকে আর কখনো পিছিয়ে দেওয়া যাবে না, এটাই আশাবাদ। 
লেখক: অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম ও নৌ-উপদেষ্টা এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লায় মন্দিরে ও মসজিদের সামনে ককটেল হামলার ঘটনায় মামলা
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ঈদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার তাগিদ
গীবত বা পরনিন্দা
তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে যাবে -ড.মোশাররফ
মেঘনায় হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় মন্দিরে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যাবার সময় মসজিদের মুসল্লিদের উপর ককটেল নিক্ষেপ, আহত ৩
কুমিল্লায় মন্দিরে ও মসজিদের সামনে ককটেল হামলার ঘটনায় মামলা
বাংলাদেশে এ মুহূর্তে তেলের কোনো সংকট নেই -মন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ঈদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার তাগিদ
চান্দলা করিম বক্স হাই স্কুল এন্ড কলেজে সংবাদ সম্মেলন
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২