
বাংলাদেশে
সাম্প্রতিক নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে
এসেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের
প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত
করার নতুন অঙ্গীকারের সূচনা। নতুন সরকারের কাছে তাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা,
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে মানবাধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।
কেননা, এখনই সময় রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসনিক চর্চা এবং আইন প্রয়োগ
ব্যবস্থাকে মানবাধিকারবান্ধব রূপে পুনর্গঠনের।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, উন্নয়ন ও মানবাধিকার এই দুই বিষয়কে প্রায়ই আলাদা
করে দেখা হয়েছে। অথচ টেকসই উন্নয়ন কখনই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সম্ভব
নয়। নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং
ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা; এসবই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। নতুন
সরকারের উচিত হবে রাষ্ট্র পরিচালনায় “ভয়হীন নাগরিক সমাজ” গঠনের লক্ষ্যকে
অগ্রাধিকার দেওয়া।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে বিচারবহির্ভূত হত্যা,
গুম, হেফাজতে নির্যাতন এবং কারা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ
তদন্তে। এসব অভিযোগ কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের
আইনের শাসনের ওপর নাগরিক আস্থাকে দুর্বল করে। প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে
স্বাধীন তদন্ত করা, ক্ষেত্র বিশেষে কমিশন গঠন, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা
এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে জরুরি। পাশাপাশি
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করলে এই প্রক্রিয়া আরও গ্রহণযোগ্য
হবে। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক
সংস্থাগুলোর গবেষণা ও সুপারিশগুলো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হতে পারে সরকারের
জন্য।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলো
গণতন্ত্রের প্রাণ। ভিন্ন মতকে দমন, ভয় দেখানো বা আইনি জটিলতায় ফেলা একটি
রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে। নতুন সরকারের উচিত হবে গণমাধ্যম, নাগরিক
সমাজ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করা। একটি
শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সমালোচনাকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে, দমন পীড়ন করার
মধ্য দিয়ে নয়।
এছাড়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত
করাও এখন সময়ের দাবি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা যেন কোনোভাবেই বৈষম্য বা
সহিংসতার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একই
সঙ্গে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার
এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য এটি এখন অপরিহার্য।
আমরা সকলেই
জানি, নারীর সমানাধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনও রাষ্ট্র আধুনিক ও
সমৃদ্ধ হতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা,
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান
অগ্রগতি প্রয়োজন। নারীর ক্ষমতায়ন কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়; এটি
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
পিছিয়ে
পড়া জনগোষ্ঠী যেমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, জলবায়ু ঝুঁকিতে
থাকা মানুষ এবং প্রান্তিক পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি
বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একটি মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র কেবল অধিকারের কথা
বলে না; সেই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোও তৈরি করে।
রাষ্ট্র
পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো অনুসরণ করা এখন বৈশ্বিক মানদণ্ড।
বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল এর নীতিমালা এবং বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রের
আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে এটি বৈদেশিক সম্পর্ক ও
অর্থনৈতিক সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নতুন
সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার
মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। নিরাপত্তার নামে যদি নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়,
তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা
শক্তিশালী করার পাশাপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়,
নতুন সরকারের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যদি
মানবাধিকারভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে তা কেবল বর্তমান
প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে। একটি
ভয়হীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনই হওয়া উচিত নতুন সময়ের
মূল অঙ্গীকার।
নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র এমন একটি
পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে নাগরিকের মানবিক মর্যাদা প্রাধান্য পাবে। এবং
নতুন সরকার এই দায়িত্বকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করবে, কেননা এর মধ্য দিয়ে দেশের
গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা সবই শক্তিশালী হবে। আমরা
বিশ্বাস করি, মানবাধিকার রক্ষা কোনও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; এটি
রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী
