মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ ফাল্গুন ১৪৩২
জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন এবারের নির্বাচন
ড. বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:২৮ এএম আপডেট: ১৭.০২.২০২৬ ২:৩০ এএম |

 জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন এবারের নির্বাচন

জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল। এই নির্বাচনের জন্য বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও রক্ত দিতে হয়েছে। যারা প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে চরম আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা। যারা ভোট দিতে চেয়েছেন, তারা ভোট দিতে পেরেছেন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবাই অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। সেই সঙ্গে বিজয়ী দলকেও অভিনন্দন।
অন্তর্র্বতী সরকার, সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী নিজ নিজ অবস্থান থেকে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে; যে কারণে মানুষ ভয়হীনভাবে ভোট দিতে পেরেছে। বিশেষ করে তরুণরা ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। নারী ভোটাররাও আগ্রহ নিয়ে ভোট দিয়েছেন। তবে ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কিছু কম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গতকাল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হয়ে গেল। একসঙ্গে দুটি নির্বাচন করার ব্যবস্থাপনা মোটেও সহজ নয়।
এখানে একটি কথা বলা দরকার, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ন্যায়ানুগ নির্বাচন নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের অনেকগুলো রায় রয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, এবার কিছু ক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তিরাও প্রার্থী হয়েছেন। যেমন—ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক এবং যারা আইনগতভাবে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য, কিন্তু দেননি। তাদের মনোনয়নপত্র ত্রুটিপূর্ণ বিবেচনায় বাতিল হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটি হয়নি। ফলে এমন কেউ জয়ী হয়ে যেতে পারেন, যিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যই নন। যে কারণে নির্বাচনের সঠিকতা ও ন্যায়সংগতা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে।
সামনে নতুন একটি সরকার আসছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বহু গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি। সমাজ ও রাজনীতির মধ্যে বিভাজন এবং অশুভ প্রতিযোগিতা রয়েছে। এগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে—মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া বা ন্যায়নীতির ভিত্তিতে কাজ না করার পরিণাম কী হতে পারে আমরা দেখেছি।
আগামী দিনে নেতৃত্বের গুণগত মান ও দূরদর্শিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন যে সরকার গঠিত হবে, সেই সরকারে বিতর্কিত ব্যক্তিরা যেন জায়গা না পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর করুণ অবস্থা। প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কারের দিকে নতুন সরকারকে শুরু থেকেই নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এবার নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দিক হলো তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি। তরুণ-তরুণীরা হাসিমুখে ভোট দিচ্ছে—এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশই আমাদের এত দিনের চাওয়া ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ গঠনে নিজের মতামত দিচ্ছে, যা জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বড় ভূমিকা রাখবে। এই তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেছেন তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান।
বিএনপি তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের জন্য যারা কাজ করবে, যেমন—টেকনিক্যাল ও ভোকেশনালের দিকে তারা গুরুত্ব দিয়েছে। আবার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বা অটোমোবাইলের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বব্যাপী বড় সংকট, বিএনপি সেই দিকটিতে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সব মিলিয়ে বিএনপি এই জেনারেশনকে দেশের কাজে যুক্ত করতে পেরেছে। আমরা জাতিকে আশা দেখাতে পেরেছি। আমরা আশাবাদী যে নতুন প্রজন্ম বিএনপির দেশ গড়ার পলিসি গ্রহণ করেছে। এ বিষয়টি আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। কাজেই বলতে পারি, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলো।
গতকাল যে নির্বাচন হলো তার জন্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। প্রথম দিকে প্রশাসনের প্রায় সর্বস্তরে একটি রাজনৈতিক দল তাদের লোক বসিয়েছিল। প্রশাসনে তারা মাস্টারপ্ল্যান করেছিল। ডিসি, ইউএনও, ওসি পর্যায়ে মহাপরিকল্পনা করে তারা নিজেদের লোক বসিয়েছিল। এ বিষয়টি শুরুর দিকে বিএনপিকে অনেক বাজেভাবে মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেশের সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে কাজ করেছে। আমি সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ দিতে চাই। এই একটিমাত্র শক্তি, যারা সব সময় দেশের জন্য কাজ করেছে। দেশ যখনই বিপদে পড়েছে, তখনই তারা এগিয়ে এসেছে। দেশের সেনাবাহিনী প্রকৃতপক্ষে বিএনপি বা কোনো দলকে সমর্থন করেনি, তারা দেশের জনগণকেই সাপোর্ট দিয়েছে। সেনাবাহিনী বলেছে, সবার আগে দেশ।
বাংলাদেশের মূল শক্তি আসলে কোথায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের জাতীয় জীবনের মহান অধ্যায়। একাত্তর আমাদের দিয়েছে নতুন একটি দেশ। এ কারণে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি পাই। অথচ আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করেছি, সেই একাত্তরকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, যেন মুক্তিযুদ্ধ বলতে আমাদের কিছুই হয়নি, যেন সেটি ছিল আমাদের ভুল। এমনকি চব্বিশের যে গণ-আন্দোলন হয়েছে, সেটিও মুক্তিযুদ্ধকে জাগ্রত করার প্রেরণাই। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, একাত্তরের চেয়ে চব্বিশ বড়। অনেকেই চব্বিশের গণ-আন্দোলন দিয়ে একাত্তরকে ম্লান করে দিতে চান। না, প্রকৃত চিত্র কখনোই এমন নয়। এমনটি যারা চেয়েছেন, তারা মূলত দেশের শত্রু, তারা কখনোই বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিতে চাননি।
দেশের মানুষ বিগত সরকারের তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনের নামে কী ধরনের প্রহসন হতে পারে, তা দেশের মানুষ দীর্ঘদিন দেখে এসেছে। সেই নির্লজ্জ অনিয়ম-ভোট চুরির প্রতিবাদ হিসেবেই চব্বিশের গণ-আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমেছিল। এই দিক থেকে গতকালের নির্বাচন ছিল সর্বস্তরের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার চাবিকাঠি।
দেশের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে এবার তাদের হাতে ক্ষমতা আসবে। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে তাদের কথাই বলবেন। একই সঙ্গে নানা সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে দেশে আর কোনো স্বৈরাচার জন্ম নিতে পারবে না। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আশা করা যায়, জনতাও ‘হ্যাঁ’ ভোটকেই জয়ী করবে। আমরা আশা করব, নতুন জনপ্রতিনিধিরা যেন জনতার ক্ষমতাকে সম্মান করেন। আর তা না করলে জনগণ এখন শত্রু-মিত্র বুঝতে শিখেছে। নিশ্চয়ই জনগণ তাদের হিস্যা বুঝে নিতে পিছপা হবে না। আমরা আশা করব, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফলাফল সব রাজনৈতিক দল মেনে নেবে। একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নতুন সরকার গঠিত হবে, এটিই কাম্য।
লেখক: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
এমপি-মন্ত্রিদের শপথ আজ
নাঙ্গলকোটে মহানগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত
কুসিক প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নবগঠিত কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ঐক্য পরিষদের ফুলেল শুভেচ্ছা
কুমিল্লায় সূর্যমুখী চাষে সফল কৃষক সামসুল হক মজুমদার
ব্রাহ্মণপাড়া তুচ্ছ ঘটনায় হাতের আঙ্গুল কেটে নেয় দুর্বৃত্তরা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় ৮৩ প্রার্থীর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন ৫৯ জন
তারেক রহমানের সাথে দেখা করলেন হাজী ইয়াছিন , জানালেন শুভেচ্ছা
আগামীর বাংলাদেশ হবে জামায়াতে ইসলামীর -মাওলানা আব্দুল হালিম
ভোটের গেজেট: অভিযোগ থাকলে হাই কোর্টে যেতে বলল ইসি
দাউদকান্দিতে ওভারটেক করতে গিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ২
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২