
গত
২৫ জানুয়ারি কুমিল্লার সুয়াগাজী ডিগবাজী মাঠে আয়োজিত বিএনপির সমাবেশে
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপির
দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, বিএনপি জানে কিভাবে একটি দেশ পরিচালিত হয়।
বিএনপি অভিজ্ঞতা রয়েছে কিভাবে নারী শিক্ষার উন্নয়ন করা যায়, কিভাবে
দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের সামগ্রিক
উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে আসলেই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরাই দরকার।
গত
১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ ভোটে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে, চলতি
সপ্তাহের প্রথমভাগে নতুন নির্বিিচত মাননীয় সংসদ সদস্যরা শপথ নিবেন, তারপরই
আগামী বাংলাদেশের নতুন প্রধামন্ত্রীও মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হবে।
নতুন
ভোটারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আগামী বাংলাদেশের নতুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
হবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এখন আপনার জনগনের নিকট নির্বাচনের
সময় আপনার যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন সেই ওয়াদা পূরণ করার পালা। তবে সবার
আগে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা জরুরী।
যে দেশ যত বেশি অর্থনৈতিকভাবে
শক্তিশালী, সে দেশ তত বেশি বিশ্বে প্রভাব রাখছে। এই অর্থনীতির মধ্যে এক
বিষফোড়া হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি অর্থনীতিকে সচল রাখতে বাধা দেয়।
দুর্নীতির কারণে দেশের উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটে। দুর্নীতিগগ্রস্ত ব্যক্তিরা
সম্পদের পাহাড় গড়ে, অথচ এই সম্পদের মধ্যে দেশের নিম্ন শ্রেণির মানুষেরও অংশ
থাকে। এভাবেই গরিবদের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় কতিপয় বিভিন্ন
শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। দুর্নীতির নেতিবাচক ফলাফলগুলোর মধ্যে
অন্যতম হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, অর্থ-সম্পদ গুটিকয়েক
মানুষের হাতে চলে যাওয়া, অর্থ পাচার।
যে কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার
বেড়ে যায়। মোটকথা, দুর্নীতি উন্নয়নকে গ্রাস করে। এই দুর্নীতি রাষ্ট্র ও
সমাজে কীভাবে এবং কেন আসে সে দিকটাও দেখা দরকার। দুর্নীতির প্রধানতম কারণ
হলো সীমাহীন লোভ। মানুষ জন্মগতভাবে অনেকগুলো মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়
এর মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো লোভ। লোভে মানুষ হয়ে পড়ে নীতিহীন। সরকারের
আইনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন থেকে দূরে থাকাও দুর্নীতির
কারণ।
বিশেষ করে অনিয়মের কারণেও দুর্নীতি বেড়ে যায়। অনিয়মের আরেক নাম
হলো দুর্নীতি। তাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৎ ও যোগ্য
ব্যক্তিকে পদায়ন করা। সততা ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে সক্ষম
ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া। এছাড়াও সুশাসন, আইনের শাসনই হলো দুর্নীতি দমনের
চাবিকাঠি, এর পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে, দেশ ও
জাতির কল্যাণের কথা চিন্তা করে দুর্নীতিমুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়।
২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তৎকালীন জাতীয় সংসদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে ১৬টি পরামর্শ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
দুর্নীতি
দমন কমিশনের কর্মচারী নিয়োগের জন্য পৃথক, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নিয়োগ বোর্ড
এবং স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস গঠন করাসহ ১৬টি পরামর্শ বাস্তবায়ন করলে ১০
বছরের মধ্যে বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে
দাঁড়াতে পারবে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং তা অনেক আগে
থেকেই চলে আসছে। তবে আশার কথা এই যে জার্মানিভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে পূর্ববর্তী সময়ের
তুলনায় বাংলাদেশের কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। সুশাসনের পথে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে
যাক, দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের গৃহীত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান
সঠিকভাবে অব্যাহত থাকুক এবং দেশ হোক সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত, যা
দেশপ্রেমিক জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।
দেশে আগের তুলনায়
অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি হচ্ছে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির
ব্যবহার কোথায় হচ্ছে এবং কারা ভোগ করছে, সেটি সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কি না
ইত্যাদি বিষয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবারই ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নতি করলেও সমাজে দুর্নীতি থাকায় জনগণ
পরিপূর্ণভাবে এর সুফল পাচ্ছে না। আর দুর্নীতি না থাকলে দেশের যে আরো অনেক
উন্নতি হতো, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আমাদের প্রিয় এ দেশে যতগুলো
সমস্যাÑজাতীয় উন্নয়ন, অগ্রগতি, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে
দাঁড়িয়েছে এবং দাঁড়াচ্ছে, দুর্নীতি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেক জনসংখ্যা ও
ক্ষুদ্র আয়তনের এই দেশটির একদিকে যেমন এখনো বিরাজ করছে দারিদ্র্য ও সম্পদের
অভাব, তেমনি অন্যদিকে সমাজের বিভিন্নস্তরে বিরাজ করছে দুর্নীতির কালো
ছায়া।
দুর্নীতি নামক এই কালো ব্যাধির কারণে একদিকে যেমন জিডিপি তার
কাক্সিক্ষত লক্ষ্যেপৌঁছতে পারেনি, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফলতা পায়নি;
তেমনি অন্যদিকে জীবনযাত্রার মানও হয়েছিল এবং হচ্ছে নিম্নগামী। আবার
দুর্নীতির কারণে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে অনেক
সময়। দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে
নাটকীয়ভাবে।
বিগত আমলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য,
স্থানীয় সরকার, বন ও পরিবেশ, জেলা-উপজেলা, কর্মকর্তাভিত্তিক, অর্থনৈতিক,
রাজনৈতিক, ধর্মীয় ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত দুর্নীতির মহোৎসব চলতে
দেখা গেছে। তবে এখনো যে ওই অবস্থার শতভাগ ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়।
দুর্নীতি প্রতিরোধে আইডিবি, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা
দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সরকারকে দুর্নীতি হ্রাস করার উপায় হিসেবে অনেক
পরামর্শ দিয়েছেন।
টিআইবিও বিভিন্ন সময়ে সভা, সেমিনার ও রিপোর্টের
মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে নানাভাবে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু
ফলাফল তেম নেই বললে চলে। মূলত দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে সব কাজের স্বচ্ছতা ও
জবাবদিহির যথাযথ ব্যবস্থা করা, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ
গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন, সর্বদা দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থেই
স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং দুর্নীতিবিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা
জরুরি। পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে শুধু
‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তি প্রদান দরকার।
দুর্নীতি রোধের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কারসহ
কার্যকর গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও তা দূর করতে
বাস্তবমূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও আবশ্যক। তা ছাড়া গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ
করার সুযোগ দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়া, সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় সম্পৃক্ততা বিচ্ছিন্ন করা এবং সর্বক্ষেত্রে
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানোও জরুরি।
দুর্নীতি
থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্য দেশের সর্বত্র প্রয়োজন ‘সততা’র একটি
আবহ। দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ।
আমাদের
মনে রাখা দরকার, এই দেশটি আমার, আপনার, সবার। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্ত ও
হাজারো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যেসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে এই দেশটির জন্ম
হয়েছিল, সেসব উদ্দেশ্যকে সফল করার পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে
হলে এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত এ দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে হলে
দেশ থেকে ‘দুর্নীতি’ নামক এই কালো, ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী ব্যাধিকে যেকোনো
মূল্যে প্রতিহত করতে হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে হাইকোর্টের দেওয়া যে ১৬টি
পরামর্শ বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি বিএনপি সরকারই সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতির
লাগাম টেনে ধরতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশের পথে চলবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজ, বাগিচাগাঁও, কুমিল্লা
