
সকল
আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা অতিক্রম করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন দেশের
রাজনৈতিক গতিপথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছে। প্রত্যাশার চেয়েও অধিক
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। সরব রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং তুমুল অনলাইন হাইপ
সত্বেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এই ফলাফল কেবল
আসন সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাজনৈতিক দর্শন, কৌশলগত অবস্থান ও অগ্রাধিকারের
পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির পক্ষে
প্রদত্ত এই সুস্পষ্ট জনরায়ের তাৎপর্য তাই বহুমাত্রিক।
সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় আবেগের রাজনৈতিক ব্যবহার বেড়েছে। এই
প্রেক্ষাপটে ভোটাররা এমন একটি ধারা বেছে নিয়েছেন, যা সংঘাতের পরিবর্তে
সহাবস্থান, প্রতিশোধের বদলে পুনর্মিলন এবং স্লোগাননির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে
বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দেয়। বিএনপির বিজয়কে অনেকেই তাই
মধ্যপন্থা, কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতি এবং সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির পক্ষে
জনসমর্থন হিসেবে দেখছেন। দলটি যেমন হিন্দু সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য আস্থা
অর্জন করেছে, তেমনি ডানপন্থী কওমী ঘরানার বৃহৎ অংশের ভোটও নিজেদের পক্ষে
টানতে সক্ষম হয়েছে যা তাদের নির্বাচনী সাফল্যের সামাজিক ভিত্তিকে বিস্তৃত ও
বহুমাত্রিক করেছে।
এই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্ব বিশেষভাবে আলোচিত
হয়েছে। ধারাবাহিক উস্কানি এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখেও দলটির চেয়ারম্যান
তারেক রহমান যে পরিমিত প্রতিক্রিয়া ও সংযমের পরিচয় দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক
সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। প্রতিক্রিয়াশীল ভাষা বা পাল্টা
উত্তেজনার পথে না গিয়ে দলটি নিজেদের কর্মসূচি, সংস্কার পরিকল্পনা ও
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এই কৌশল
ভোটারদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
অন্যদিকে
জামায়াতের পরাজয় কেবল একটি দলের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক
ধারা ও কৌশলের প্রতি জনমতের অবস্থানও নির্দেশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ব্যাপক উপস্থিতি সবসময় বাস্তব জনসমর্থনের প্রতিফলন নয়, নির্বাচনের ফলাফল
সেই বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। জনগণ ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করলেও
ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে সমর্থন করেন না- এই বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে
নিরঙ্কুশ বিজয় শাসনকে সহজ করে না; বরং প্রত্যাশার ভার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়
এবং স্বৈরাচারী প্রবণতার শঙ্কা বৃদ্ধি করে। জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে
আসলেও নতুন সরকারের পথ মোটেও সহজ হবে না। দেশের অর্থনীতি বর্তমানে
সংকটাপন্ন। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, ডলারের তীব্র সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা
দৃশ্যমান। জ্বালানি সংকট শিল্প ও কৃষি- উভয় খাতে প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিনের
অনিয়ম, লুটপাট ও খেলাপি ঋণের ভারে ব্যাংক খাত নড়বড়ে; মুদ্রা পাচার ও
অব্যবস্থাপনা সামগ্রিক অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির
অভিঘাতে জনজীবন বিপর্যস্ত।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার
হওয়া উচিত- ১. ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ
আদায়ে দৃশ্যমান কঠোরতা, মুদ্রা পাচার রোধ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর
স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ২. দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা দুর করে
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থাশীল পরিবেশ তৈরি করা। ৩. দীর্ঘমেয়াদি
জ্বালানি কৌশল প্রণয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৪. উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি
বহুমুখীকরণ এবং ডলার সংকট মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা।
অর্থনীতির
পুনরুদ্ধার কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; এটি আস্থা পুনর্গঠনের
প্রক্রিয়া। দুর্নীতি দমন, বাজারে স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে
ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক বিজয় দ্রুত জনঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে।
প্রশাসনিক ও
প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাও কম জটিল নয়। দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার সংকট, সংসদের
নিষ্ক্রিয়তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ প্রশাসনিক কাঠামোকে
অকার্যকর করেছে। জবাবদিহিহীন আমলাতন্ত্র, পুলিশ বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা
এবং বিচারব্যবস্থার প্রশ্নবিদ্ধ স্বাধীনতা- এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া টেকসই
উন্নয়ন সম্ভব নয়। সংসদকে কার্যকর বিতর্ক ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে ফিরিয়ে
আনা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা নতুন
সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, মানবাধিকারসম্মত ও
আধুনিক প্রশিক্ষণনির্ভর পুলিশি কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। দল-মত
নির্বিশেষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে
জনআস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না। চাঁদাবাজি, দখলদারি আর প্রভাব বিস্তারের
গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে জনমত ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে
পড়বে।
সমাজ এখনো বিভাজিত। রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ঘৃণাচর্চা এবং সম্ভাব্য দেশি-বিদেশি উস্কানি অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
তাৎক্ষণিক আবেগনির্ভর “মবোক্রেসি” গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জনআবেগকে
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে ধারণ ও পরিচালনা করাই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও
ভিন্নমতের নিরাপত্তার সমন্বিত কাঠামো। দীর্ঘ সময়ের গণতন্ত্রহীনতার পর জনগণ
পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছে। এই আস্থা রক্ষা করা নতুন সরকারের নৈতিক
দায়িত্ব।
বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নও এক গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এগুলো কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; রাষ্ট্রীয়
কাঠামো ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংস্কারের প্রস্তাব। নীতিগত সামঞ্জস্য বিধান,
জুলাই সনদে দেয়া নোট অব ডিসেন্ট মোকাবিলা এবং সাংবিধানিক সংস্কারে রাজনৈতিক
ঐকমত্য গঠন- এসবই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলগত দক্ষতার পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ অতিক্রম করে সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে বাস্তবে রূপায়ন
করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
গণতন্ত্রে বিরোধী দল কেবল সমালোচক
নয়; তারা এক ধরনের ছায়া সরকার। শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারের ভুল সংশোধন এবং
স্বেচ্ছাচার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। জামায়াত পরাজিত হলেও তাদের
ভোট ও আসন বৃদ্ধির হার ইঙ্গিত দেয় যে একটি অংশ বিকল্প রাজনৈতিক ভাষ্য
খুঁজছে। দায়িত্বশীল, নীতিনির্ভর ও গঠনমূলক বিরোধিতার মাধ্যমে জামায়াত দেশের
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুদৃঢ়করণের পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার
সুযোগ পাচ্ছে।
নির্বাচন ঘিরে শুরু থেকেই নানা অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ ছিল।
নির্বাচন পেছানো বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার মহল বিশেষের
অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে
তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে এবং তারেক রহমান-এর নেতৃত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত
করেছে। আওয়ামী লীগ-এর অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের
সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন ও
সেনাবাহিনীর সমন্বিত ভূমিকার ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হয়েছে- এই
অর্থে সংশ্লিষ্ট সবাই এক ধরনের যৌথ বিজয়ের অংশীদার।
বাংলাদেশ আজ এক
গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। জনরায় একদিকে আশার প্রতীক, অন্যদিকে সতর্কবার্তা।
জনগণ বিএনপির প্রতিশ্রুত স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের পক্ষে আস্থা রেখেছে।
সেই আস্থার পূরণ না হলে হতাশা, ক্ষোভ আরও গভীর হতে পারে। বিএনপির বিজয় তাই
কেবল ক্ষমতা লাভের বৈধ অধিকার নয়; এটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়ও বহন
করে।
এবারের নির্বাচন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সম্ভাবনার এক নতুন দ্বার
উন্মোচন করেছে। এখন প্রশ্ন- সেই সম্ভাবনাকে নীতিনিষ্ঠ শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কার ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে নতুন সরকার কতটা বাস্তবে রূপ
দিতে পারে। দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও সহাবস্থান বজায় থাকলে নতুন এক
গণতান্ত্রিক অধ্যায় সূচিত হতে পারে; অন্যথায় নিরঙ্কুশতার অহংকার সেই
সম্ভাবনাকে দ্রুত ম্লান করে দিবে। বিএনপি সবাইকে নিয়ে কাজ করার, দেশ গড়ার
স্বপ্ন দেখিয়েছে। জনগণ তাদের পক্ষে রায় দিয়েছে; এখন সময় সেই রায়ের মর্যাদা
রক্ষার।
লেখক- সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মডেল কলেজ
