তরিকুল ইসলাম তরুন ।।
কুমিল্লার
মাঠে এখন সোনালি হাসি। বাতাসে দুলছে হাজারো সূর্যমুখী, আর সেই দৃশ্য যেন
কৃষকের নতুন স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখীর
ফুল ফুটতে শুরু করেছে, যা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না কৃষকদের
মাঝেও নতুন আশার আলো জ্বালাচ্ছে। কৃষি বিভাগের প্রণোদনা, অনুকূল আবহাওয়া
এবং লাভজনক সম্ভাবনা এ বছর অনেক কৃষককে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী করে তুলেছে।
জেলা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জেলার ১৭টি উপজেলায়
প্রায় ৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা কিছুটা কমে ৬
হেক্টরে দাঁড়ালেও দাউদকান্দি, চান্দিনা ও কুমিল্লা সদর উপজেলায় নতুন করে
কৃষকদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সরিষার মতো সহজে বীজ
থেকে তেল উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকাই এই ফসলের বিস্তার কমে যাওয়ার অন্যতম
কারণ। এ ছাড়া সরিষা কাটার পর দ্রুত ধান চাষ করা গেলেও সূর্যমুখী তুলনামূলক
দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় অনেক কৃষক সময়ের হিসাব মিলাতে পারেন না। তবুও যারা সাহস
করে এই ফসল করছেন, তারা লাভের মুখ দেখছেন। কুমিল্লা সদর উপজেলার আড়াইওড়া
গোমতীর চরে কৃষি বিভাগের দেওয়া বিনামূল্যের বীজ ব্যবহার করে এক কৃষক মাত্র
এক মাস আগে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেন। এখন তার ক্ষেত হয়ে উঠেছে
দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে
ছবি তুলতে ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন। একইভাবে পাচথুবী ইউনিয়নের
বামুইল ব্লকের শরীফপুর মৌজায় আধুনিক কৃষক সামসুল হক মজুমদার পতিত এক একর
জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে সফল হয়েছেন। তার ক্ষেত এখন যেন একটি জীবন্ত
প্রদর্শনী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।
সামসুল হক মজুমদার
বলেন, অন্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী অনেক লাভজনক। এই একটি ফসল থেকেই তেল,
খৈল ও জ্বালানিসহ নানা উপকার পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে প্রায় আধা
লিটার তেল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি বিঘায় ৭ থেকে ১০ মণ বীজ পাওয়া যায়। ফলে ১৪০
থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল উৎপাদন করা যায়, যার বাজারমূল্য বর্তমানে প্রতি
লিটার ৪২০ থেকে ৫০০ টাকা। ব্লকের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা এ কে এম
আরিফুজ্জামান জানান, প্রতি বিঘায় সূর্যমুখী চাষে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার
টাকা খরচ হলেও আয় হতে পারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফুল সংগ্রহের পর
গাছ শুকিয়ে জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা
নিজাম উদ্দিন বলেন, সূর্যমুখী চাষে সার, কীটনাশক ও সেচের প্রয়োজন তুলনামূলক
কম। পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হওয়ায় ঝুঁকি কম থাকে। ফলে অল্প খরচে বেশি লাভ
সম্ভব। তবে তেল উৎপাদনের সহজ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কৃষক আগ্রহ হারিয়ে
ফেলছেন। তিনি আরও জানান, সূর্যমুখী তেল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং
স্বাস্থ্যসম্মত। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য এটি উপকারী। তাই
সোয়াবিন তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।
কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে সমস্যাগুলো সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে তুলে ধরেছে এবং
কৃষকদের উৎসাহ দিতে বিনামূল্যে বীজ ও বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রম চালিয়ে
যাচ্ছে।
আজ কুমিল্লার মাঠে ফুটে ওঠা সূর্যমুখীর সোনালি রঙ শুধু ফুলের
সৌন্দর্য নয়। এটি কৃষকের ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। সামসুল হক
মজুমদারের মতো কৃষকদের সফলতা প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে
সূর্যমুখী হতে পারে দেশের ভোজ্যতেল খাতে নতুন বিপ্লবের সূচনা। সোনালি এই
ফুল যেন কৃষকের ঘরে হাসি ফুটায়—এটাই এখন কুমিল্লার কৃষকদের প্রত্যাশা।
