
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের শপথ আগামী দু-এক দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি ফলাফলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে গেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করছে। সেই সঙ্গে বিদায় নেবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। তারেক রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের ১৩তম প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচন-প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হবে বিএনপির দেশ শাসন পর্ব। জনরায় অনুসারে সরকার গঠন করছে বিএনপি। দেশ শাসনের ভার তাদের ওপরই অর্পিত হবে। জনপ্রত্যাশা থাকবে সার্বিকভাবে সুশাসনের। গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে সুশাসন উপহার দিতে পারেনি। বহুমুখী সংকটে দেশ জর্জরিত ছিল।
এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা। নতুন সরকার দ্রুত একে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে, এটাই হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রথম প্রত্যাশা। ইউনূস সরকারের আমলে জনজীবনে মব-সন্ত্রাস স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠেছিল। শারীরিকভাবে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, চাঁদাবাজি ও হত্যা এই মব-সন্ত্রাসের নামে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ভাঙা, ৩২ নম্বর গুঁড়িয়ে দেওয়া, মাজার ভাঙা, মানুষ পুড়িয়ে মারা- এ রকম সন্ত্রাসী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রতিটি দিন কেটেছে দেশের মানুষের। নিরাপত্তাহীনতার সংকট ছিল তীব্রতর। এখনো মানুষের দিন কাটে চরম আতঙ্কে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দ্রব্যমূল্য ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের দিক। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা তো দূরের কথা, লাগামহীনভাবে শনৈ শনৈ দ্রব্যমূল্য বেড়েছে কিন্তু সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। নতুন সরকারকে এই নিত্যপণ্যের দামে লাগাম টেনে ধরতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণগুলো সবার জানা। আমদানি, উৎপাদন, বাজার নজরদারি, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ইত্যাদি কারণে দ্রব্যমূল্য স্থির থাকে না। নতুন সরকারকে এসব সংকট দূর করে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।
শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও দুর্নীতি দূর করতে পারেনি। দুর্নীতি আগের মতোই অব্যাহত ছিল। দুর্নীতির বৈশ্বিক ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবনতি ঘটেছে। এমনকি উপদেষ্টাদের ঘনিষ্ঠ অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল- এমন খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যারা দুর্নীতি করেছেন, নতুন সরকার তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে।
অর্থনীতিও এ সময় মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ব্যাংকব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অভাব, বেকারত্ব, শ্রমিক ছাঁটাই, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, তৈরি পোশাকশিল্পে স্থবিরতা ও নৈরাজ্য দেশকে চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিদেশিদের সঙ্গে যেসব কেনাকাটা ও বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে, বন্দর পরিচালনার ভার তুলে দেওয়া হয়েছে, এর কোনো কিছু সম্পর্কে জনগণকে জানানো হয়নি। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতিকে সামগ্রিকভাবে পুনরুদ্ধার করে গতিশীল করা। পূর্বের প্রবৃদ্ধির ধারায় অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনা। বেকারত্ব দূর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। মুক্তভাবে সংস্কৃতিচর্চার পথও রুদ্ধ করে রাখা হয়। সংগীতানুষ্ঠান, নাট্যানুষ্ঠান, এমনকি বাউলদের ওপর শারীরিকভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে ঘটে যাওয়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে যে বিচার চলছে, সেই বিচার দ্রুত শেষ করা উচিত। দীর্ঘদিন কাউকে কারাগায়ে আটক রাখা ঠিক হবে না। এতে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটে। আমরা মনে করি, সুবিচারের স্বার্থে প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করা উচিত।
সার্বিকভাবে গত ১৮ মাসে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক- কোনো ক্ষেত্রেই স্বস্তি ছিল না। সব ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে এখন জনপ্রত্যাশার মূল কথা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে সরকার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নৈরাজ্য বাড়ে এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই সংঘাতের সুযোগে দেশকে সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। রাজনৈতিক এই স্থিতিশীলতার জন্য নতুন সরকারকে তাই রাজনৈতিক মতাদর্শের দিকটি প্রথমেই স্থির করে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ধারায় উদার গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থা অবলম্বন করা হলে দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলে আমরা মনে করি। মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশ পরিচালিত হোক, নির্বাচনের জনরায়ে এরই প্রতিফলন ঘটেছে। সেই সঙ্গে তারা উগ্র ধর্মান্ধদেরও প্রত্যাখ্যান করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মতাদর্শ ও ভিশন সম্পর্কে নতুন সরকারকে তাই সিদ্ধান্তে এসে দেশ পরিচালনা করতে হবে। এটাই হচ্ছে জনরায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এ জন্য শুরুতেই নতুন সরকারকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। সংস্কারের যে দিকগুলো সম্পর্কে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছিল, সেসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে সংস্কারের বিষয়ে সংসদে ঐকমত্যে আসতে হবে। এটা যত দ্রুত সম্পন্ন করা যাবে, জনপ্রত্যাশা ততই পূর্ণতা পাবে।
