শুক্রবার ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১ ফাল্গুন ১৪৩২
সংবাদের ভাষা ও সাহিত্যের ভাষা
তপন বাগচী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:১৩ এএম |

 সংবাদের ভাষা ও সাহিত্যের ভাষা
ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। তবে ভাষার ব্যবহার সকল মাধ্যমে একই রকম হয় না। মোটাদাগে পার্থক্য করা যেতে পারে। সংবাদের ভাষা এবং সাহিত্যের ভাষা একই বাংলা ভাষার অন্তর্গত হলেও রূপ, রীতি ও প্রকরণের দিক থেকে এদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য দাঁড়িয়ে গেছে। সংবাদের ভাষা মূলত তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবধর্মী, অন্যদিকে সাহিত্যের ভাষা আবেগময়, কল্পনাপ্রবণ ও শিল্পগুণসম্পন্ন হতে পারে। একই সংবাদপত্রে স্থান পায় সংবাদ ও সাহিত্য। কিন্তু ভাষাদৃষ্টেই তাঁদের ঘনিষ্ঠতা এবং বিদ্বিষ্টতা নিরূপণ করা যায়।
সংবাদের ভাষার উদ্দেশ্য হলো দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পাঠককে জানানো। তথ্যপ্রদানই মূল দায় তার। এখানে গুরুত্ব পায় ঘটনার স্থান, কাল ও পাত্রের বিবরণ। সংবাদের ভাষা তাই সংক্ষিপ্ত ও সোজাসাপটা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এতে অলংকারপূর্ণ শব্দ বা অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশের সুযোগ নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—“আজ ঢাকা থেকে দূর পাল্লার বাস ছাড়ছে না।” এ ধরনের বাক্য সরাসরি তথ্য প্রদান করে, কোনো কল্পনা বা সৌন্দর্যচর্চা এখানে মুখ্য নয়।
অন্যদিকে সাহিত্যের ভাষার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং মানুষের অন্তর্লোকের অনুভূতি, চিন্তা, স্বপ্ন, প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনা ও জীবনদর্শনকে শিল্পরূপ দেওয়া। সাহিত্যের ভাষা তাই অনেক বেশি রূপকধর্মী ও কাব্যিক। সেখানে উপমা, রূপক, প্রতীক, অলংকার, ছন্দ ও ধ্বনিমাধুর্যের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন একই ঘটনার সাহিত্যিক প্রকাশ হতে পারে—“দূর পাল্লার বাসের চাকা ঘুরবে না আজ, থমকে আছে শহর’।
সংবাদের ভাষায় লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি কিংবা পক্ষপাত থাকে না। বস্তুনিষ্ঠতা শব্দটির বাস্তবায়ন ঘটে সংবাদে। কিন্তু সাহিত্যে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, পক্ষপাত ও অভিজ্ঞতা যুক্ত হতে পারে। তাই সাহিত্য হয়ে ওঠে হৃদয়গ্রাহী ও চিরন্তন।
সংবাদপত্রে বাক্য ছোট ও তথ্যকেন্দ্রিক হয়, যাতে পাঠক সহজে দ্রুত বুঝতে পারে। ৪ থেকে ১০ শব্দের মধ্যে সংবাদের বাক্য মেস করতে পারলে ভাল। এর বেশি হলে সেই বাক্য বুঝতে সমস্যার সৃষ্টি করে। সাহিত্যে বাক্য কখনো দীর্ঘ, ছন্দময় এবং গভীর অর্থবহ হতে পারে। সাহিত্যের বাক্যে শব্দের সীমা নির্দিষ্ট করার দরকার নেই। সাহিত্য বাক্যের আকার নির্ভর করে শব্দের সৌন্দর্য ও ব্যঞ্জনার ওপর।
সংবাদের ভাষা হলো বাস্তব তথ্যের বাহন এবং সাহিত্যের ভাষা হলো অনুভূতির বাহন। সংবাদ পাঠককে ঘটনার খবর দেয়, আর সাহিত্য পাঠককে অন্তর্জগতে নাড়া দেয়।
সংবাদ কেবল নিটোল সংবাদ নয়। সেখানে ক্রীড়া, বিজ্ঞান, অপরাধ, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, অর্থনীতি প্রভৃতি সংবাদও পরিবেশন করতে হয়। দেখা যাচ্ছে, ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদে সাহিত্যের ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে সম্প্রতি একটু বেশি পরিমাণে। ক্রীড়াসংবাদে সাহিত্যের ভাষা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করা যেতেই পারে। ক্রীড়াসংবাদ অন্যান্য সাধারণ সংবাদের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ খেলাধুলা কেবল একটি ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে উত্তেজনা, প্রতিযোগিতা, নাটকীয়তা, আবেগ, জয়-পরাজয়ের আনন্দ-বেদনা এবং দর্শকের গভীর আগ্রহ। তাই ক্রীড়াসংবাদে শুধুমাত্র শুষ্ক তথ্য পরিবেশন করলে অনেক সময় পাঠকের কাছে তা নিরস মনে হতে পারে। খেলাধুলার ঘটনাকে প্রাণবন্তভাবে তুলে ধরার জন্য কিছু সাহিত্যিক উপাদান ব্যবহার সংবাদকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। যেমন—“শেষ ওভারে ঝড় তুললেন ব্যাটসম্যান”, “গোলরক্ষক হয়ে উঠলেন দলের প্রাচীর”, কিংবা “শেষ মিনিটে ভাগ্য বদলে গেল অতসীর”—এ ধরনের বাক্যে উপমা ও রূপকের মাধ্যমে খেলার উত্তেজনা পাঠকের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ফলে পাঠক শুধু ফলাফল নয়, ম্যাচের আবহ ও রোমাঞ্চও অনুভব করতে পারে।
তবে ক্রীড়া সংবাদে সাহিত্যের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। সংবাদের মূল ধর্ম হলো সত্য ও নির্ভুল তথ্য পরিবেশন। অতিরিক্ত সাহিত্যিক ভাষা বা অলংকারপূর্ণ উপস্থাপন অনেক সময় তথ্যকে অস্পষ্ট করে তোলে এবং অতিরঞ্জনের সৃষ্টি করে। সংবাদ তখন বাস্তব বিবরণ না হয়ে গল্প বা কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। যেমন, “বিজয়ের রথ আকাশ ছুঁয়ে ছুটল” বললে কে জিতলো, কে হারলো তা স্পষ্ট হয়ে না ওঠায় পাঠক বিরক্ত হতে পারে। “মাঠ কাঁপিয়ে শত্রুকে ধ্বংস করল” ধরনের অতিরঞ্জিত বাক্য সংবাদকে বাস্তবতার সীমা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ‘ধবল ধোলাই’ শব্দটি অন্য ভাষা থেকে সরাসরি অনূদিত হওয়ায় তা পাঠকের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠলেও তা বাস্তবতাবর্জিত। কারণ অনেক ব্যবধানে জিতলে বিজিতের সকল কৃতিত্ব ম্লান হয় না। তাই বাঙালি সংস্কৃতি ‘ধবল ধোলাই’য়ের চেয়ে ‘নিরঙ্কুশ জয়’ বলাই যথেষ্ট। আবার ‘আবাহনীর বিরুদ্ধে মোহামেডানের খেলা’ না বলে ‘আবাহনীর সঙ্গে মোহামেডানের খেলা’ বলাই সঙ্গত। কারণ আমাদের ক্রীড়া হচ্ছে সম্প্রীতিমূলক। তাই ‘সাথে’ হবে, ‘বিরুদ্ধে নয়।
বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদে সাহিত্যের ভাষা ব্যবহার কতটা প্রয়োজনীয়- তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। বিজ্ঞান সংবাদ মূলত গবেষণা, আবিষ্কার, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মহাকাশ কিংবা নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। কিংবা হতে পারে কোনো বিজ্ঞানীর জীবনীভিত্তিক সংবাদ। বিজ্ঞানভিত্তিক লেখার প্রধান লক্ষ্য হলো তথ্যের যথার্থতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। কারণ বিজ্ঞানের জগতে সামান্য ভুল বা অতিরঞ্জন মানুষের ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। কোনো নতুন ওষুধ আবিষ্কারের কিংবা বাজারে আসার সংবাদে যদি আবেগময় বা অতিরঞ্জিত ভাষা ব্যবহার করা হয়, তবে পাঠকের মনে ভুল প্রত্যাশা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে বিজ্ঞান সংবাদে তথ্যকে স্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিকভাবে তুলে ধরাই সবচেয়ে জরুরি। অনেক বৈজ্ঞানিক বিষয় সাধারণ পাঠকের কাছে কঠিন ও দুর্বোধ্য মনে হয়। জটিল শব্দ, পরিভাষা, পরিসংখ্যান কিংবা গবেষণার ফলাফল অনেক সময় সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভাষার কিছু উপাদান বিজ্ঞান সংবাদকে সহজ, আকর্ষণীয় ও পাঠযোগ্য করে তুলতে পারে। যেমন, মহাকাশ গবেষণার কোনো সংবাদে বলা যায়—“মঙ্গল গ্রহে পা রাখলো বিজ্ঞানীরা’ শিরোনামটি সাহিত্যের ভাষায় “মঙ্গলের নিঃসঙ্গ প্রান্তরে মানুষের পদচিহ্নের স্বপ্ন আরও এক ধাপ উজ্জ্বল হলো” লেখা যেতে পারে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনে ‘পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে’র বদলে “পৃথিবীর উষ্ণ শ্বাস দিন দিন বাড়ছে” বলা যেতে পারে। এ ধরনের ভাষা বিজ্ঞানকে মানবিক অনুভবের সঙ্গে যুক্ত করে সাধারণ পাঠকের কাছে বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদে সাহিত্যের ভাষা অপরিহার্য নয়, তবে তা সম্পূর্ণ বর্জনীয়ও নয়। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য পরিমিত সাহিত্যিক ভাষা ব্যবহার করা যুক্তিসঙ্গত। তবে সেই ভাষা যেন তথ্যকে বিকৃত না করে, সত্যকে আড়াল না করে এবং বিজ্ঞানের নির্ভুলতা বজায় রাখে-এটাই বিজ্ঞান সাংবাদিকতার প্রধান শর্ত।
ভাষার মাধ্যমেই মনের ভাব প্রকাশ করতে হয়। মানুষ ভেদে তাই ভাষার ধরনও ভিন্ন হয়। আবার বিষয়ের কারণে ভাষার ভিন্নতা হতে পারে। সংবাদের ভাষা আর সাহিত্যের ভাষা যে আলাদা হয়ে আছে, তা নিয়ে আর তর্ক নেই। সংবাদ যেহেতু ‘সাততাড়াতাড়ির সাহিত্য’, তাই আটপৌরে এবং সহজবোধ্য হওয়াটাই প্রত্যাশিত। আর সাহিত্য যেহেতু চিরকালীন সংবাদের গোত্রে পড়ে, তাই তাকে হতে হয় অবগুণ্ঠিত ও অলংকারঋদ্ধ।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
বিএনপির জয়জয়কার
উৎসবের ভোট; ব্যাপক উপস্থিতি
ভোটকেন্দ্রে হঠাৎ ককটেল বিস্ফোরণ, ছোটাছুটি
দেবিদ্বারে হাসনাতের বিজয়ে মিছিল ‘ক্ষমতা এখন জনতার হাতে’
‘বিদ্রোহী’ শাওনে ধরাশায়ী রেদোয়ান
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় ১১ টি আসনে ৮৬ প্রার্থীর ভোটের লড়াই
হুমকির বক্তব্য ভাইরালের পর আদালতে বিএনপি নেতা মুন্সী
বিএনপি প্রার্থীর সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট যুদ্ধের সম্ভবনা
কুমিল্লায় টাকাসহ বিএনপি ও জামায়াতের ৩ নেতা আটক
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক কুমিল্লা অংশ ফাঁকা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২