বিভ্রম দীর্ঘজীবী হোক

কায়সার হেলাল ।।
Is all that we see or seem / But a dream within a dream? - Edgar Allan Poe
সাধারণত চীনে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কিন্তু আজ রবিবারের সকালটা মাটি করে দিল ল্যাব মিটিং। এমনই হয়। হয়তো সপ্তাহব্যাপী পরিকল্পনা করছি যে রবিবারে কী কী ব্যক্তিগত কাজ করবো তো হুট করেই মিটিং বা কোনো লেকচারের নোটিশ চলে আসবে। মাঝেমাঝে শনিবারের অর্ধবেলা ছুটি কাটানো যায়। যদিও এই শনিবার সন্ধ্যায়ও গ্রুপ মিটিং ছিল। তবে এমন অনিশ্চয়তা খারাপ না। এতে আত্মিক আনন্দের আকাঙ্ক্ষা ও অন্বেষণ উভয়ই গভীর হয়। জনারণ্যে একা থাকার এই এক সুন্দর দিক। যাই হোক, গতকাল দুপুরের খাবারের পর বন্ধু খালেদের সঙ্গে মেসেঞ্জারে হালকা বাতচিতের ফাঁকে সে একজন কথাসাহিত্যিকের ছোটগল্পের বই পাঠিয়ে বললো- ‘হালারপো দেবর্ষি ডাকাইত ডাকাইত!’ ডাকাইত শব্দটি খালেদ সত্যিই দুইবার উচ্চারণ করেছে। অর্থ্যাৎ, এই গল্পকারের গল্প মারাত্মক পর্যায়ের ভালো। সে আমাকে সাজেশন দিল যেন ‘প্রেম, তবুও’ গল্পটা দিয়ে শুরু করি৷ কিন্তু গতকাল আর শুরু করা হয় নি। আজ অপরাহ্নে পড়লাম।
বাইরে মাইনাস চার ডিগ্রির হাড়কাঁপানো চীনা শীত। আকাশ গুমোট। বেশ ক’দিন ধরেই আবহাওয়া দপ্তর বৃষ্টি ও তুষারঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ঘরে ফেরার আগে একটি পার্সেল তুলে এনেছিলাম পাশের কুরিয়ার থেকে। পারফিউম অর্ডার করেছিলাম কিছুদিন হয়। সেটিই খুলে দেখি মোটা খাকি কাগজে মোড়ানো সবুজাভ হলুদ তরলের বোতল। অনেকটাই মসলার দোকান থেকে পণ্য খরিদ করলে যেরকম পোটলা দেয় সেরকম। আমার পারফিউম কেনার অভিজ্ঞতায় এইরকম কোনদিনই চোখে পড়ে নাই। বস্তুত ব্র্যান্ড পারফিউমের বোতলের প্যাকেজিং টেকসই বক্স ও পলি দিয়ে সিল করা থাকে। যেটি কিনলাম সেটার ক্ষেত্রে এসবের কোন বালাই ছিল না। যদিও পরিচিত কোন ব্র্যান্ড না, ভাবছিলাম ঠকে গেলাম কিনা। সুগন্ধি অত্যধিক পছন্দ আমার। কিন্তু ভালো সুগন্ধির এতো দাম যে আমার দ্বারা এই বিলাসিতা করা দুঃসাধ্য। তবে চীনে আসার পর কিছু স্থানীয় সুগন্ধি ব্যবহার করে তাজ্জব বনে গেছি! ফলে প্রায়ই কৌতুহল আর নতুন সুগন্ধি সংগ্রহের নেশায় অনলাইন শপ থেকে এটাসেটা অর্ডার করে ফেলি। ‘ব্লাইন্ড বাই’ যাকে বলে। পারফিউমের ক্ষেত্রে ব্লাইন্ড বাই করা উচিত না। কিন্তু এসব লোকাল ব্র্যান্ডের অফলাইন দোকান সচরাচর পাওয়া যায় না বললেই চলে।
ঘন জঙ্গলের ভেতর হাঁটলে যেমন ঘোরেল ঘ্রাণ পাওয়া যায় তেমন একটা সুগন্ধির কথা ভাবছিলাম বহুদিন। সঙ্গে থাকবে বৃষ্টি শুরুর পরের সোঁদা মাটির ঘ্রাণ। পোড়া কাঠের ধোঁয়ার একটা বেস নোট পাওয়া গেলে আরও ভালো হয়। গত বছর অন্তর্জাল ঘাঁটাঘাঁটি করে যেসব নাম পাওয়া গেল সেগুলোর দাম আর আমার সামর্থ্যের মধ্যে ফারাক অর্ধ-আলোকবর্ষ। এবার দুয়েকদিন আগে একটি চীনা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঘ্রাণের এই একই বৈশিষ্ট্যওয়ালা সুগন্ধি পেয়ে পুরনো ইচ্ছা চাগাড় দিয়ে উঠলো। দাম নাগালের মধ্যে থাকায় অনেকটা ঝোঁকের বশেই অর্ডার করেছিলাম। কিন্তু দেশি কবিরাজেরা শুকনো ভেষজ যেভাবে কাগজে মুড়িয়ে দেয় ঠিক তেমনই একটি পার্সেল পাঠানো হয়েছে আমাকে।
খালেদের পরামর্শ অনুযায়ী দেবর্ষি সারগীর ‘প্রেম, তবুও’ পড়ছিলাম। বছরের পর বছর প্রতীক্ষার পর প্রেমাস্পদ অবশেষে প্রেমিককে ভালবাসতে রাজি হয়। শীতের বিকেলের হিংস্র বুনো পথ জুড়ে ঝরা পাতার শব্দ। শ্বাপদের আর্তনাদ, ঝিঁঝির ডাক, বাসায় ফেরা পাখির ছায়া। দূরে শীর্ণ নদী, মানুষহীন তীর। প্রেমাস্পদ তাকে নিয়ে যায় এক নির্জন গুহায়। গুহামুখে মাকড়সার জাল। ভেতরে আদিম অন্ধকার। দেয়ালে প্রকৃতির আঁকা মানুষ-পশুর মুখ, কোণে নিশ্চল সবুজ অজগর শীতনিদ্রায়। মোমবাতির কাঁপা আলোয় পাথুরে মেঝে। সভ্যতা থেকে দূরে। সময়ের ঊর্ধ্বে এক প্রাগৈতিহাসিক, বিপজ্জনক, রহস্যময় নিঃসঙ্গতা। অতঃপর তাদের গভীর নিমজ্জন। কিন্তু প্রেমের আতিশয্যে প্রেমিক তার সমস্ত প্রাণশক্তি হারাতে থাকে। চোখ বন্ধ হয়ে যায়, অঙ্গ অসাড় হয়, সময়ের বোধ লুপ্ত হয়। শতাব্দী পরে কিছু মানুষ গুহায় প্রবেশ করে দেখে একটি নরকঙ্কাল, একটি আধপোড়া মোমবাতি, আর একটি ব্লাউজ। প্রেমাস্পদের কোনো চিহ্ন নাই। সে যেন কখনো ছিলই না। প্রেম, মৃত্যু, এবং এইসব বিমূঢ়তা মিলে এই হলো গল্পটির সার ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ।
কেন খালেদ গল্পকারকে ‘ডাকাইত’ অভিধা দিয়েছিল তা টের পেলাম। লেখক জানেন কী বলতে হবে, কী বলতে হবে না। Keats'i উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু (....I shut her wild wild eyes with kisses four) পুরো গল্পটির টোন এই এক লাইনে সেট করা। প্রতিটি উপাদান প্রতীকী এবং ব্যাখ্যাহীন যেন পাঠককে ভাবানোই তাঁর উদ্দেশ্য। গল্পে সময়ের ভাংচুর এতো সাবলীল যে পাঠক টেরই পায় না কখন বাস্তব থেকে অধিবাস্তবে চলে গেছে। সংলাপ অতি মিতব্যয়ী। বর্ণনা কাব্যিক কিন্তু অতিরঞ্জিত নয়। প্রতিটি শব্দ/বাক্য মেপে মেপে বসানো। দেবর্ষির সবচেয়ে বড় দক্ষতা বোধহয় শেষ পর্যন্ত গল্পটির অস্পষ্টতা বজায় রাখা। এটি কি বাস্তব, কল্পনা, রূপক, নাকি স্মৃতি- কিছুই নিশ্চিত না। এই সংশয়ই গল্পের প্রাণ।
গল্পপাঠের এক পর্যায়ে সম্ভবত বেখেয়ালে সেই সুগন্ধি-শিশি’র ছিপি খুলেছিলাম। উচ্চাশা দমন করে গায়ে কয়েকখানা স্প্রেও করে ফেলেছিলাম বোধহয়।
সব মিলে গেল!
মানে গল্পে যা পড়ছি সুগন্ধির ঘ্রাণেও যেন তাই পাচ্ছি। গল্পের আবহ ও সুগন্ধির যুগপৎ সংবেদ যেন একটি অন্যটিকে পূর্ণতা দিচ্ছে। আর আমার অনুন্নত শব্দ-বিবর্ধক যন্ত্রে বেগম আখতার গাইছেন 'বালামওয়া, তুম ক্যায়া জানো প্রীত।' গল্প, সঙ্গীত ও সুগন্ধিটির ঘোরে আচ্ছন্ন অবস্থায় মনে হলো সুগন্ধিটির সম্পর্কে আরও জানা প্রয়োজন। খুঁজেপেতে চীনা ভাষায় একটি বর্ণনা পেলাম৷ সেটি ভাষান্তর করলে এরকম দাঁড়ায়:
উন্মাদনা ও স্বচ্ছ চেতনার নিষিদ্ধ রাজ্যে যদি আপনি সুগন্ধির উপর দেবত্ব অর্জন করতে চান এবং একটি ঘ্রাণ-বিপ্লবের অংশ হতে চান তবে এই সুগন্ধি-উদ্যোগের পেছনের গল্পটি আগে পড়ুন। এর আবিষ্কারক লরেঞ্জো ভ্যালেন্টিনো। তিনি একজন মশলা-শিকারি যিনি ঘুরে বেড়াতেন বিশ্বজুড়ে। ছিলেন সার্কাসের জাদুকরও। নিজেকে বলেন- 'ভাগ্য কর্তৃক নির্বাসিত সুগন্ধ-যাদুকর।'
ভ্যালেন্টিনো বড় হয়েছেন ইটালির সিসিলির রাস্তায়, ১৯৮৮ সালে। তার বাবাও ছিলেন সুগন্ধি নির্মাতা, আর মা ছিলেন জিপসি নৃত্যশিল্পী। ছোটবেলা থেকে তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন বাবার পরীক্ষাগারে আইরিস শেকড় আর পাচৌলির গন্ধে। শুঁকতেন মায়ের স্কার্টের আঁচলে লেগে থাকা আগুনের গন্ধ, ঘাম আর আম্বরের সুবাস। এই পরস্পরবিরোধী ঘ্রাণস্মৃতি হয়ে উঠেছিল তার পরবর্তী উন্মাদ নন্দনতত্ত্বের উৎস।
সতের বছর বয়সে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। নিজের হাতে তৈরি ধোঁয়ার বোমা দিয়ে স্কুলের রসায়ন পরীক্ষাগার উড়িয়ে দেয়ার অপরাধে। তখন তিনি বলেছিলেন- ‘আমি শুধু প্রাচীন মিশরীয় মন্দিরের ধূপের গন্ধ পুনর্সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম!’ এরপর তিনি উঠে পড়লেন এক মালবাহী জাহাজে। শুরু হলো কুড়ি বছরের ভবঘুরে জীবন। মরক্কোর খোলা বাজারে শিখলেন মশলার গোপন মিশ্রণ। বিনিময়ে ভারতের গঙ্গার তীরের সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে পেলেন ভেষজ রেসিপি। এমনকি আমাজনের রেইনফরেস্টে শামানদের অনুসরণ করে চিবিয়েছেন বিভ্রম সৃষ্টিকারী উদ্ভিদ। এই শামানদের দাবী তারা ঘ্রাণ ও রঙের স্বাদ ধরতে পারে।
তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় আলেকজান্দ্রিয়ায়। এক মাতাল-রাতে হোঁচট খেয়ে তিনি ঢুকে পড়েন এক পরিত্যক্ত বৌদ্ধ মিনারে এবং আবিষ্কার করেন ভেঙ্গে পড়া ম্যুরালের পাশে একটি ব্রোঞ্জের বানরের মূর্তি। বানরের থাবায় চেপে ধরা একটি হলদে পার্চমেন্ট, যাতে লেখা ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের এক পাগল মশলা ব্যবসায়ীর বিশেষ সুগন্ধি প্রস্তুতপ্রণালী: বর্ষা মৌসুমের চন্দন, বজ্রাহত আগরকাঠ, আর কাকের পালকের ছাই মিশিয়ে তৈরি করো এমন সুগন্ধি যা মানুষকে অলিক বিভ্রমে আক্রান্ত করবে। লরেঞ্জো রেসিপি অনুসরণ করলেন, কিন্তু ধূপ জ্বালানোর মুহূর্তেই তিন দিনের ঘুমে তলিয়ে গেলেন! জেগে উঠে প্রতিজ্ঞা করলেন তৈরি করবেন বিভ্রম উদ্রেককারী ওষুধের চাইতেও বিপজ্জনক একটি সুগন্ধি যা মানুষের অবচেতন উন্মাদনার মুহূর্তগুলোকে জাগিয়ে তুলবে।
এরপর তিনি তার বেসমেন্টে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘পাগলা বানর’ (প্রকৃত নাম ইংরেজিতে)। লোগো হলো বানরের মাথা; কামড়ে ছিঁড়ে ফেলছে একটি পারফিউমের বোতল। এর চোখে উন্মত্ত সোনালি আলো। লরেঞ্জো ঘোষণা করলেন- ‘মানুষ সুগন্ধি ব্যবহার করে নিজের আসল রুপ ঢাকতে, আর আমি সুগন্ধি ব্যবহার করতে চাই তাদের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে।’
পাগলা বানরের মূল দর্শন বন্যতা ও ভদ্রতার অযৌক্তিক সামঞ্জস্য। তাদের প্রতিটি সুগন্ধিই নাকি ভিন্ন ভিন্ন পারফরম্যান্স আর্ট।
লরেঞ্জোকে ঘিরে বিতর্ক ও কিংবদন্তির শেষ নাই। একবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল একটি সুগন্ধির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনশ ভেটিভার-মিশ্রিত ধোঁয়ার বোমা ফাটিয়ে অর্ধেক রাস্তা জুড়ে ফায়ার সাইরেন বাজিয়ে দেয়ার জন্য। একবার তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মোটা অঙ্কের অফার এই যুক্তি দিয়ে যে ‘বানরদের সোনার খাঁচার দরকার নেই।’ তার নিজের ভাষায়- ‘প্রকৃত উন্মাদনা হচ্ছে পৃথিবীর ঘৃণ্য বাস্তবতাকে সুগন্ধিতে পরিণত করে নিজের ধমনীতে ছিটিয়ে দেয়া।’
আজ ‘পাগলা বানর’র ভক্তদের মধ্যে আছে গোপন রক তারকা, অনিদ্রাগ্রস্ত ওয়েব ইঞ্জিনিয়ার, আর ওয়াল স্ট্রিটের সেই ব্যবসায়ীরা যারা তাদের অফিসের ভেতর বিষধর মাকড়সা পোষে। তারা এটাকে ‘সুগন্ধি’ বলে না, বলে- ‘ব্যক্তিত্বের তরল লাইসেন্স।’
‘একজন উন্মাদ যেমন
মৃত্যুকে জাগাতে পারে, তেমনি নন্দনের গভীরে থাকা পশুত্বকেও হত্যা করতে পারে’- এই বাক্যটি ছিল উল্লেখিত সুগন্ধি-উদ্যোগ সম্পর্কীয় বিবিধ দাবীর অন্তিম পংক্তি।
সুগন্ধি ও সুগন্ধি উৎপাদকদের গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু লরেঞ্জোর ‘পাগলা বানর’ তার অরণ্যগন্ধী সুবাসের মতোই মগজে জেঁকে বসেছে। দেবর্ষির গল্পেও বানর সংক্রান্ত একটি উপমা পাওয়া গেল। উপমাটি এমন-‘(গুহার দেয়ালে) একটা মানুষের মুখকে দেখাচ্ছিল যেন কোনও প্রাজ্ঞ বানর হাসছে।’
বেগম আখতার; গজলের রাণী আখতারিবাঈ ফৈজাবাদি’কে লুপে ফেলে দিয়েছি৷ তিনি অনবরত গেয়েই চলেছেন-
বাত না পুঁছি নেহা লাগাকে
নেহা লাগাকে দুখ মে ফাঁসাকে
ফির ভি হুয়ে না মিত
বালামওয়া তুম ক্যায়া জানো প্রীত
ইশক হ্যায় এক চৌসর কি বাজি
জান কি বাজি...
হার হ্যায় ইসমে জিত...
বালামওয়া তুম ক্যায়া জানো প্রীত
০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; চীন
বাংলা সাহিত্যে ১৮৬০:
একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

-মাসুমুর রহমান মাসুদ
বাংলা
সাহিত্যের ধারায় ১৮৬০ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। কেবল বছর বা সংখ্যার ক্রম
হিসেবে নয়, বরং এই সময়ে সাহিত্যে বেশ কিছু নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, সে
হিসেবে বছরটি খুবই উল্লেখযোগ্য। মাইকেল মধূসূদন দত্ত, দ্বীন বন্ধু মিত্র,
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখকদের উত্থান এবং সাময়িকী ও পত্রিকার
মাধ্যমে নতুন ভাবধারার প্রচারেও এই সময়কালটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যদিও
বঙ্কিমের বিখ্যাত উপন্যাসগুলো পরের দশকে প্রকাশিত হয়। এই সময় বাংলা তথা
গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক শাসনের মাঝামাঝি কাল পাড় করছিলো। ফলে ওই
সময়টি নিয়ে সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ বাস্তবতা প্রভৃতি বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের
সুযোগ রয়েছে নিঃসন্দেহে। এই পর্যালোচনায় সাহিত্যিক দিকটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে
বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হবে।
১. বাংলা কাব্যে ধারা
১৮৬০ সালে
বাংলায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)-এর ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’
প্রকাশিত হয়। এই কাব্যের মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্যের ধারায় প্রথম অমিত্রাক্ষর
ছন্দের ব্যবহার শুরু করেন মহাকবি মধুসূদন দত্ত, যা বাংলা ছন্দের ইতিহাসে এক
বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করে। কাব্যটি মহাভারতের সুন্দ ও উপসুন্দ নামক দুই
অসুর ভাইয়ের তিলোত্তমা নামক অপ্সরার কারণে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ধ্বংস
হওয়ার পৌরাণিক কাহিনীকে অবলম্বন করা হয়। এই ছন্দ ও কাহিনীর বয়ন বাংলা কাব্য
জগতে নতুন ধারা সংযোজন করে। এটি বাংলা কাব্য সাহিত্যের গতি ও প্রকৃতি আমূল
পরিবর্তন করার পাশাপাশি মধুসূদনের মহাকাব্য রচনার পথ সুগম করে। ১৮৬০ সালের
মে মাসে এটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’
মধুসূদনের সৃষ্টিশীলতার প্রথম ধাপ, যা বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা করে।
কাব্যের চারটি চরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো:
“এ হৈম নির্জ্জন স্থানে দেব পুরন্দর,
কেন গো বসিয়া আজি, কহ পদ্মাসনা,
বীণাপাণি। কবি, দেবি, তব পদাম্বুজে,
নমিয়া জিজ্ঞাসে তোমা, কহ, দয়াময়ি!”
লক্ষ্যণীয়
চরণ সমূহে স্বাধীন যতিচিহ্নের ব্যবহার রয়েছে। চরণান্তিক ভাবের সমাপ্তিগত
বাধ্যবাধকতা পরিহার করা হয়েছে, যা পয়ার ছন্দের ক্ষেত্রে ছিলো অবশ্যপালনীয়।
২.মুদ্রণ শিল্প
সাহিত্যের
সাথে মুদ্রণ শিল্প আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। আগ্রহী পাঠকদের বৃহদাংশের
নিকট সংবাদপত্র, কবিতা, গল্প সহ যে কোন সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেয়ার প্রয়াস
বাস্তবায়নে মুদ্রণ শিল্পের সীমাহীন ভূমিকা। কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭৭৭ সালে। ‘জেমস অগাস্টাস হিকি’ কলকাতায় ওই ছাপাখানাটি
খোলেন। সমালোচনা থাকলেও ‘আলোকায়ণ’ এর সেই সময়ে ওই ছাপাখানা থেকেই ভারতের
প্রথম সংবাদপত্র ‘‘হিকি’স বেঙ্গল গেজেট’’ প্রকাশিত হয়, যদিও এর কিছুদিন আগে
হুগলিতে অন্য একটি প্রেস স্থাপিত হয়েছিল। ‘আলোকায়ণ’ এর সেই সময়ে সাহিত্য
চর্চা কলকাতা কেন্দ্রিক ছিলো বলেই সমালোচকরা মতামত দিয়ে থাকেন।
এই
কলকাতা কেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে ১৮৬০
সালে ঢাকায় স্থাপিত প্রথম ছাপাখানাটি। এখানে বলে রাখা ভালো ঢাকায় প্রথম
মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপিত হয়েছিল ১৮৪৮ সালে। যা পুরান ঢাকার ছোটকাটরায়
ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা স্থাপন করেন। এটি ছিল একটি ছোট আকারের ছাপাখানা
যেখানে মূলত ইংরেজি ও কিছু বাংলা নির্দিষ্ট বই, যেমন: ‘প্রহেলিকা’ ও
‘প্রার্থনা অনুক্রম’ ছাপানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। সেটি সর্বসাধারণের জন্য
উন্মুক্ত ছিলোনা। ফলে ১৮৬০ সালে ‘‘ঢাকা বাঙ্গালা যন্ত্র’’ নামে দ্বিতীয়
প্রেসটিকেই প্রথম এবং বড় পরিসরের একটি মুদ্রণালয় হিসেবে ধরে নেয়া যায়।
কেননা এটি প্রথম বাংলা প্রেস, যা বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রসারে
সাহায্য করে। এই প্রেস থেকে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ নাটক ‘‘নীল
দর্পণ’’ প্রকাশিত হয়।
৩. নীলদর্পণ ও উত্তর উপনিবেশবাদ
দ্বীন
বন্ধু মিত্রের ‘‘নীল দর্পণ’’ নাটকটি ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে মুদ্রিত হয়েছিল,
যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি বাংলা
সাহিত্যের অন্যতম একটি সামাজিক নাটক। নাটকটির পটভূমি নীল চাষের জন্য
সাধারণ কৃষকদের উপর ইংরেজ শাসকদের অত্যাচার ও নিপীড়ন। অসিতকুমার
বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘‘নীলদর্পণ নাটক প্রকাশিত হলে এবং এর ইংরেজি
অনুবাদ প্রচারিত হলে একদিনেই এ নাটক বাঙালিমহলে যতটা প্রশংসিত হয়েছিল,
শ্বেতাঙ্গমহলে ঠিক ততটাই ঘৃণিত হয়েছিল। এই নাটক অবলম্বন করে বাঙালির
স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সূচনা, এই নাটক সম্বন্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত
সম্প্রদায় ও রায়তদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন স্থাপিত হয়, এর মধ্যে দিয়েই
শ্বেতাঙ্গ নীলকরদের বর্বর চরিত্র উদ্ঘাটিত হয়।” মনে করা হয়ে থাকে, নীল
দর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তবে আধুনিক গবেষকগণ
এই বিষয়ে একমত নন।
জনসাধারণের মনে জাতীয়তাবাদের উত্থান হয় নিজস্ব ঐতিহ্য
ও সংস্কৃতির পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। যা ‘‘উত্তর উপনিবেশবাদ’’ এর অন্যতম
একটি পর্যায় হিসেবে গণ্য। উত্তর উপনিবেশবাদ একটি রাজনৈতিক-সামাজিক
প্রপঞ্চ। উত্তর উপনিবেশবাদ তত্ত্বের উদ্ভব ও যাত্রা সাধারণত রাজনৈতিক
পরিবেশ এর বিরোধিতা থেকে। যাকে সর্ব প্রথম কেতাবি রূপদেন ‘‘ফ্রঁৎস ফ্যানন’’
(১৯২৫-১৯৬১)। ‘‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস’’ ১৯৫২ সালে এবং ‘‘দ্য রেচেড
অব দ্য আর্থ’’ ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। এই দুটি বই প্রকাশের মাধ্যমে তিনি
দেখান, উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম তিনটি পর্যায়ের মধ্যে দিতে এগোয়।
প্রথম
পর্যায়: উপনিবেশিক জাতি রাজনৈতিক চেতনা লাভ করে। দ্বিতীয় পর্যায়: জাতি তার
আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে চায় নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনরাবিষ্কার ও
পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তৃতীয় পর্যায়: হচ্ছে সরাসরি সংঘর্ষের।
এখানে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ফ্রঁৎস ফ্যানন’ এর জন্মের আগে দ্বীন বন্ধু
মিত্রের ‘‘নীল দর্পণ’’ নাটকটি প্রকাশিত হয়। উপনিবেশিতদের মনে যে ঔপনিবেশিক
শাসন বিরোধী মনোভাব জন্মায়, তা এই নাটকে চিত্রায়িত হয়। যেখানে ঔপনিবেশিক
শক্তির সকল পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে নাটকের অন্যতম
চরিত্র ‘নবীন মাধব’। যিনি নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক
প্রতিবাদী কৃষক। কৃষক গোলক বসুর পরিবার নীলকর অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে গেল,
সাধুচরণের মেয়ে ক্ষেত্রমণির মৃত্যু হলো তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র এই নাটক।
এতে নবীন মাধব তার বাবা গোলক বসু ও স্ত্রী সৈরিন্দ্রীর সঙ্গে মিলে নীল
চাষের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন।
এ থেকে স্পষ্ট একটি ধারনা লাভ করা যায়
যে, ঔপনিবেশিক শাসনকালেও ‘‘উত্তর উপনিবেশবাদী’’ বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা বাংলা
সাহিত্যিকদের মধ্যে অবিচল ছিলো।
৪. প্রহসন
১৮৬০ সালে মাইকেল
মধুসূদন দত্ত রচিত দুটি বিখ্যাত প্রহসন ‘‘একেই কি বলে সভ্যতা’’ এবং ‘‘বুড়ো
শালিকের ঘাড়ে রোঁ’’ প্রকাশিত হয়। এ দুটি প্রহসনকে বাংলা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট
প্রহসন হিসেবে গণ্য করা হয়। সেগুলোতে সমসাময়িক সমাজের কুসংস্কার ও ভণ্ডামি
তুলে ধরা হয়। বিশেষত ‘একেই কি বলে সভ্যতা’য় কলকাতার নব্য ইংরেজি শিক্ষিত
ইয়ং বেঙ্গলদের উচ্ছৃঙ্খল জীবন ও ভ্রান্ত আধুনিকতার নামে নিজেদের ইংরেজ করে
তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টায় ব্যস্ত। জমিদারবাবুরা গ্রামে প্রজাদের শোষণ
করেন, তার থেকে যে অর্থ আয় হয় তাতে পুত্রকে কলকাতা পাঠান শিক্ষিত করে তোলার
জন্য। কিন্তু পুত্র মোসাহেবদের নিয়ে উৎসব করে বেড়ায়, চেষ্টা চলে ইংরেজ
হবার। বৈষ্ণব পিতার সন্তান ছুটে যায় মদের আসরে বারবিলাসিনীর নূপুরের শব্দ
শুনতে। ধর্ম, জাত, মানবিকবোধ আর মানব সম্পর্কের চিরায়ত শৃংখলা হারায় নেশার
ঘোরে। ইংরেজদের ভাষায় অসভ্য বর্বর বাঙালির চোখে সভ্যতার পিঠে দগদগে ঘা
স্পষ্ট হয়। এতো শুধু একপক্ষ, অন্যপক্ষে শাসকের মুখও খুঁজে পাওয়া যায়
প্রহসনে। ঘুষখোর ইংরেজ আমলাদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রহসনে ‘সারজন’ চরিত্রটি
এসেছে। পরবর্তীতেও আমলাদের এই চরিত্রের বদল হয়নি। জমিদারনন্দন কালী এবং
নব’র ধর্মবিরুদ্ধ সব কার্যকলাপ জানার পরও বাবাজি চুপ করে থাকেন দক্ষিণার
বিনিময়ে। এখানে সমকালীন ধর্মগুরুরা প্রশ্নের সম্মুখীন হন। এসব নিয়ে ব্যঙ্গ
করা হয় প্রহসনটিতে।
‘একেই কি বলে সভ্যতা’য় ইয়ং বেঙ্গলদের উচ্ছৃঙ্খল ও
অসংযত জীবনযাপন, মদ্যপান, বারোবণিতা সঙ্গ এবং তাদের ভণ্ডামির প্রতি এক
তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। এর কাহিনি আবর্তিত গ্রামের জমিদারের কীর্তিকলাপকে কেন্দ্র
করে। এ প্রহসনের জমিদার আর দশজন শোষকের মতোই প্রজাদের লুটে সম্পদের পাহাড়
গড়ে তোলে। প্রজার অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই, মূল কাজ খাজনা
আদায়। হানিফকে তিনি সরাসরি বলেন, ‘‘তোদের ফসল হৌক আর না হৌক তাতে আমার কি
বয়ে গেল ?’’
তবে বিত্তের সঙ্গে যোগটা যেহেতু ভোগের তাই ভোগের জন্য
মনোভঙ্গি বদলাতে সময় অপচয় হয় না। অর্থের অপরিমিত ব্যয়ও তার এ প্রবণতাকে
নষ্ট করে না। শোষকের চরিত্রে এটাই চিরন্তন। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের
অর্থনৈতিক সম্পর্ককে মধুসূদন এ প্রহসনের নানা বাঁকে বিচিত্র ভঙ্গিতে তুলে
এনেছেন। বাচস্পতি আর ভক্তপ্রসাদের সম্পর্ক, অর্থদানে অনীহা, বাচস্পতির
প্রতিশোধপরায়নতা সবটুকুই অর্থনৈতিক সম্পর্ক সূত্রে ঘটে। ভক্তপ্রসাদের
নারীভোগ প্রবণতাও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার কাছে নারী পণ্য, যার কোনো
ধর্মীয় পরিচয় নেই। অর্থের বিনিময়ে ভোগ করায় কোনো পাপ থাকে না। অর্থনীতি
ধর্ম সম্পর্কহীন, তাই মুসলমানদের অপছন্দ করলেও ভক্তপ্রসাদ মুসলমান নারীকেই
ভোগ করতে চায়। এভাবে কাহিনি এগিয়ে চলে।
এতে মুসলমান হোক কিংবা হিন্দু
নারী কেউই তার ভোগতৃষ্ণা থেকে দূরবর্তী নয়। হানিফের স্ত্রী ফাতিমা,
ভট্টাচার্যের মেয়ে ইচ্ছে, পীতেশ্বর তেলীর মেয়ে পঞ্চী সবই তার কাছে সমান।
বাচস্পতি, হানিফ আর ফাতেমা মিলে ভক্তপ্রসাদকে শুধু অপদস্থ করেনি, জরিমানাও
আদায় করেছে। বাচস্পতি ফিরে পায় জমি এবং পঞ্চাশ টাকা, হানিফের আয় দু‘শ।
ভক্তপ্রসাদের লোভের মধ্যে দিয়েই মধুসূদনের শ্রেণি চেতনাকে আবিষ্কার করা
সম্ভব। অত্যাচারী জমিদার মাথা নোয়ায় নিজের প্রজার কাছে। সামন্ততান্ত্রিক
সমাজে শ্রেণিসংগ্রাম থাকলেও তা শ্রেণি বিপ্লবের রূপলাভ করা দুস্কর। তাই
মাইকেলের প্রহসনে শ্রেণীদ্বন্দ্ব থাকলেও শ্রেণী বিপ্লব প্রসঙ্গটি উহ্য।
এভাবে প্রহসন দুটি বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
৫. রামারঞ্জিকা
প্যারীচাঁদ
মিত্রের লেখা ‘‘রামারঞ্জিকা’’ প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে। এটি একটি সামাজিক
উপন্যাস। উনিশ শতকের বাঙালি সমাজের পারিবারিক জীবন, বিশেষত মেয়েদের শিক্ষা ও
তাদের সামাজিক অবস্থান বোঝতে পারা যায়। এটি ছিলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
প্রথার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরোয়া
কথোপকথন ও বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলিকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন
সমাজচিত্র পাওয়া যায়। হরিহর ও পদ্মাবতীর মতো চরিত্রদের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত
পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, তাদের সুখ-দুঃখ, ভুল-ত্রুটি এবং সন্তান
প্রতিপালনের দিকটি ফুটে উঠে। এছাড়াও এটি উনিশ শতকের বাঙালি সমাজের
নারী-পুরুষের সম্পর্ক, পারিবারিক বিষয়ে স্পষ্ট ধারনা প্রকাশে সহায়ক। নারী
জাগরণেও এটি ভূমিকা রেখেছিলো। নারীশিক্ষা ও নারীসমাজের উন্নতির লক্ষ্যে এটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক পত্রিকা ‘‘বামাতোষিণী’’-এ ধারাবাহিকভাবে
প্রকাশিত এ রচনায় তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের কুফল তুলে ধরেছিলেন
প্যারীচাঁদ।
৬. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
১৮৬০ সালে বোর্ড অফ
একজামিনার্সের পদ থেকে ইস্তফা দেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এ বছর ১২ এপ্রিল
ভবভূতির ‘‘উত্তর রামচরিত’’ অবলম্বনে তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘‘সীতার
বনবাস’’ প্রকাশিত হয়। কথিত আছে বইখানি তিনি রচনা করেছিলেন মাত্র চারদিনে।
নারীর প্রতি সামাজিক অবিচার, বিশেষত লোকলজ্জা ও জনমতের চাপে একজন আদর্শ
নারী সীতার উপর নেমে আসা চরম দুর্দশা এবং তার আত্মমর্যাদা ও পবিত্রতার
সংগ্রাম।
‘সীতার বনবাস’এ রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার পর রাম
ও রাবণের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। সীতা উদ্ধারের পর অযোধ্যায় রাম-সীতার
সংসারজীবন যখন সুখে কাটছিল তখন সীতার নামে অযোধ্যায় লোকনিন্দা শুরু হয়। রাম
তখন তাকে রক্ষা করা ও লোকরঞ্জনের নিমিত্তে সীতাবর্জনের সিদ্ধান্ত নেন।
রামের নির্দেশে লক্ষ্মণ সন্তানসম্ভবা সীতাকে ভাগীরথী তীরবর্তী বাল্মীকির
তপোবনে রেখে আসেন। অরণ্যেই জন্ম হয় কুশ ও লবের।
এর মাধ্যমে বিদ্যাসাগর
একদিকে যেমন রামায়ণের এই করুণ অংশটিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন, তেমনি
সমাজে নারীর অবস্থান ও সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যা তাঁর সমাজ সংস্কারের
চেতনারই প্রতিফলন।
৭. মহাকাব্যের সূচনা
বাংলা সাহিত্যের একমাত্র
মহাকাব্য মাইকেল মধুসূদন দত্তের রচিত ‘‘মেঘনাদবধ কাব্য’’। কাব্যটি দুটি
খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ড (১-৫ সর্গ) ১৮৬১ সালের জানুয়ারি মাসের ৪ তারিখে
প্রকাশিত হয়, আর দ্বিতীয় খন্ড (৬-৯ সর্গ) ওই বছরই রচনা করেন মধুসূদন।
কার্যত ১৮৬০ সালেই মহাকাব্যটি রচনার সূত্রপাত বলে প্রতীয়মান হয়। এটিও
‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’র মতো অমিত্রাক্ষর ছন্দ বা ‘ফ্রি ভার্সে’ রচিত।
উপরিউক্ত
বিশ্লেষণ শেষে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের ধারায় ১৮৬০ সালটি অত্যন্ত
তাৎপর্যপূর্ণ। হাজার বছরের পয়ার ছন্দের ধারা ভেঙে দিয়ে অমিত্রাক্ষর ছন্দের
প্রবর্তন, প্রহসন রচনা, সমাজ সংস্কারের ভাবনা, উত্তর উপনিবেশবাদী ভাবধারা
এবং মহাকাব্যের সূচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এই সময়ই প্রচলিত হয়।