শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২৫ মাঘ ১৪৩২
অবৈধভাবে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ কুবির সাবেক রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৪ এএম আপডেট: ০৭.০২.২০২৬ ১২:৩৫ এএম |


  অবৈধভাবে ৩৩ লাখ টাকা  আত্মসাতের অভিযোগ কুবির  সাবেক রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে  নিজেই নিজের পদোন্নতির ফাইলে স্বাক্ষর করে অবৈধভাবে গ্রেড উন্নীত করা এবং পিএইচডি শিক্ষা ছুটির নামে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাবেক রেজিস্ট্রার মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগগুলোর সত্যতা মিলেছে পদোন্নতি সংক্রান্ত নথিপত্র এবং অর্থ দপ্তরের নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনে। সংশ্লিষ্ট নথি এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। 
নথিতে দেখা যায়, নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিজের ফাইলে নিজেই স্বাক্ষর করে গ্রেড উন্নীত করার পাশাপাশি পিএইচডি সংক্রান্ত ব্যয়ের নামে ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম ও জনবল কাঠামো এবং জাতীয় বেতনস্কেল-২০০৯ অনুযায়ী ৩য় গ্রেডের পদ হচ্ছে রেজিস্ট্রার। কিন্তু অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন বা সংশোধন না করেই মুজিবুর রহমান ২য় গ্রেডের পদোন্নতি নিয়েছেন। এমনকি নিজের পদোন্নতি নীতিমালার রিভিউ কমিটির সদস্য-সচিবের দায়িত্বও পালন করেছেন নিজেই। নিজের নিয়োগ, পদোন্নতি, তদন্ত কমিটিতে নিজেই থাকতে পারবে না এমন আইন থাকলেও তিনি আইন অমান্য করে সভায় উপস্থিত থাকেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোন দপ্তর বা শাখায় কারো নিয়োগ, পদোন্নতি বোর্ড থাকলে সেখানে তার উপস্থিতির সুযোগ নেই। যদি কেউ সেটা করে তাহলে তা স্পষ্ট আইনের ব্যতয়।
এদিকে মুজিবুর রহমানের নিয়ম লঙ্ঘন করে ৩য় গ্রেড থেকে ২য় গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়ে অডিট আপত্তি দিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের অডিট মেমো নং-১০ এর বিবরণ অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় গ্রেডের রেজিস্ট্রার পদটিকে স্কেল লঙ্ঘন করে ২য় গ্রেডের বেতন-ভাতা প্রদান করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ ও ২০১৫-এর নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ২০২৪-এর ৩১ জুন পর্যন্ত বেতন-ভাতাদি গ্রহণ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ লক্ষ ২৭ হাজার ৯৮০ টাকা। যা ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে অডিটে। 
এছাড়া পিএইচডির নামে শিক্ষা ছুটির বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। তাদের অডিট মেমো নং-১১ তে উল্লেখ করা হয়েছে শিক্ষা ছুটির চুক্তিপত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছুটি বিধির নীতিমালা ভঙ্গ করে শিক্ষা ছুটি ও পিএইচডি ডিগ্রি সম্পূর্ণ না করে চাকরিতে যোগদান করায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ছুটিকালীন গৃহীত বেতন-ভাতাদি আদায় না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ লাখ ১৪ হাজার ১৪০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা আদায়যোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছুটি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক/কর্মকর্তা শিক্ষা ছুটি শেষ না করে নিজ কর্মস্থলে যোগদান করলে ছুটিকালীন বেতন-ভাতাদি ফেরত দেয়ার বিধান রয়েছে। যদিও মুজিবুর রহমান সেটি এখনো ফেরত দেয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নির্দিষ্ট বিধি বিধান ও আইন রয়েছে। শিক্ষাছুটির ব্যাপারেও সেখানে স্পষ্ট বলা আছে। এখন কেউ যদি বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে তাহলে তা অপরাধ এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।
মুজিবুর রহমানের শিক্ষা ছুটির বিষয়ে জানা যায়, পিএইচডি ডিগ্রি সম্পূর্ণ না করে ২৪ সালের ৮ আগস্টে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি রেজিস্ট্রার (স্বীয়) পদে যোগদানের জন্য আবেদন পত্র দাখিল করেন তিনি। আবেদনপত্র দাখিলের তারিখ, কো-অর্ডিনেটর সুপারিশে তারিখ, যোগদান আবেদনপত্র মার্ক করার তারিখ ও ফাইল উত্থাপনে তারিখও একই হওয়ায় তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সে সময় বিষয়টি রহস্যজনক বলে মনে করেন কর্মকর্তারা। ফলে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের এমবিএ ও পিএইচডি প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর ড. মো. কামরুল হাসান একটি সুপারিশ প্রদান করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, মো. মজিবুর রহমান মজুমদার তার পিএইচডি থিসিসের প্রথম প্রগতি প্রতিবেদন সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। গবেষণার বিষয়টি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তাকে বাংলাদেশে থেকেই বাকি কাজ শেষ করার অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ড. কামরুল হাসান কো-সুপারভাইজার হিসেবে একটি প্রত্যয়নপত্রও প্রদান করেন। 
তবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মো. মজিবুর রহমান মজুমদার ২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর কেবল প্রাথমিক বা সাময়িক নিবন্ধন পায়। ২০২৩ সালের ২১ মে থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ, তথ্যস্বাক্ষরতা এবং গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ক কিছু স্বল্পমেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করেন। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন ছাড়াই তার কর্মস্থলে ফেরার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত তড়িঘড়ি। এমনকি তিনি সাক্ষাৎকারে নিজের চাকরির মেয়াদ অল্পদিন আছে উল্লেখ করে তাকে যেন ‘সম্মানজনক বিদায়’ (অবসর) দেওয়া হয়, সেই অনুরোধও করেছিলেন।
এতে আরো বলা হয়েছে, যোগদানের আবেদনপত্র ও সুপারিশের বিষয়ে সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হলে আবেদনপত্রটি অন্য কারো মাধ্যমে পাঠিয়েছে এবং যোগদান আবেদনপত্রে আপনি পিএইচডি সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেটর কর্তৃক সুপারিশের বিষয়ে স্পষ্ট কোন জবাব দিতে পারেনি বলে জানানো হয়।
প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ৩ মার্চ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই দিনে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটি ২৭ জুলাই ১০৫ তম বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় প্রতিবেদন উপস্থাপন করলে একইদিনে আরেকটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় তাদের প্রতিবেদন জমা দেন। 
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, 'উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা মুজিবুর রহমানকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকরি বিধিমালা-২০১৮ কঠোরভাবে অনুসরণ করছে এবং বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
এদিকে মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এর আগে তথ্য জালিয়াতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, উপাচার্যের অনুমতি ব্যতিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং নথির মূল নোট পরিবর্তন করে বিভিন্নজনকে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। নানা অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা একাধিক আন্দোলনও করে। নানা অভিযোগের কারণে ২০১৮ সালে রেজিস্ট্রার পদ থেকে সরিয়ে তাকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বদলি করা হয়। 
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ব্যস্ত আছেন বলে প্রতিবেদকের ফোন কেটে দেন। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। 
তবে আইনী পদক্ষেপের কথা জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল, 'আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাসী এবং বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তার বিরুদ্ধে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এখানে কোনো প্রকার আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অবকাশ নেই।'















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের লড়াই বিএনপির দৃঢ় অবস্থানে জামায়াত-এনসিপি
জিয়াউর রহমানের আদর্শের বিএনপি এখন আর নাই
দি কাজী ফাউন্ডেশন এর আয়োজনে কুমিল্লায় ফ্রি হেলথ ক্যাম্প
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সনাতনী সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- মনিরচৌধুরী
বরুড়ায় বিএনপি প্রার্থীর উঠান বৈঠক-পথসভা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
হাসনাতের আসনে গণঅধিকারের জসিম উদ্দিনকে বিএনপির সমর্থন
লাশ পোড়ানোর মামলায় ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
আপনারা জানেনও না, নীরবে বিপ্লব ঘটে গিয়েছে
৩০০ টাকার ঘুষের ভিডিও প্রচার না করতে ২৯ হাজার টাকা প্রদান
কুমিল্লায় বাসচাপায় আহত ছাত্রীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২