
স্বাধীনতার
৫৪ বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা অর্জিত হয়নি। ২০৩২
সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত
হলেও এখন পর্যন্ত অর্ধেকের মতো মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নাগালের মধ্যে
আসেনি। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলেও এখনো ডেঙ্গুর মতো কীটপতঙ্গ
বাহিত রোগ, কলেরাসহ ডায়রিয়া পেটের অসুখ, অপুষ্টিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ
বিশেষ করে শিশুরা ভুগছে। অসংক্রামক ব্যাধিতে ভোগা মানুষ ও এতে মৃত্যুর
সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এসব অসংক্রামক ব্যাধি হচ্ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস,
ক্যানসার, কিডনি রোগ, হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। আর মানসিক
স্বাস্থ্য সমস্যাকে আমরা কতজন গুরুত্ব দিই? এ মুহূর্তে আমরা ডেঙ্গু
মহামারির মধ্যে আছি। গতানুগতিক পথে এ সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। কাজ
তেমন হচ্ছে না। রোগী অনুপাতে মৃত্যুর হার পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। পানি ও
বায়ুদূষণ দিন দিন বেড়েই চলছে। তাই পেটের ও শ্বাসতন্ত্রের অসুখ প্রতিযোগিতা
করে বেড়ে চলেছে।
আমাদের দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির যদি উল্লেখযোগ্য
উন্নয়ন ঘটাতে হয়, তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে প্রাথমিক
স্বাস্থ্যসেবাকে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি সুদৃঢ় কাঠামো দেশব্যাপী
বিশেষ করে শহর-নগরে গড়ে ওঠেনি। গ্রামাঞ্চলে অন্তত স্থাপনাগুলো গড়ে উঠলেও
শহরে তা বড় বড় হাসপাতালের বহির্বিভাগে সীমিত। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই
হযবরল অবস্থা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে বিশেষায়িত হাসপাতালে
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বহির্বিভাগ ও রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা, মাধ্যমিক
স্বাস্থ্যসেবার রোগী পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালের শয্যা আর জটিল রোগের
বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা- সব একসঙ্গে জড়াজড়ি করে আছে। ফলে সারা দেশের
রোগী ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে ভিড় করছেন, মেঝেতে-বারান্দায় শুয়ে আছেন। সরকার এ
অবস্থার পরিবর্তনের জন্য স্তরভিত্তিক চিকিৎসা ও বিকেন্দ্রীকরণের দিক না
গিয়ে প্রতিটি জেলায় তৃতীয় পর্যায়ের (টারসিয়ারি) বিশেষায়িত মেডিকেল কলেজ
প্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়েছে। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো ভিড়াক্রান্ত হাসপাতালে
সারা দেশ থেকে রোগী আনার ব্যবস্থা করার জন্য এ হাসপাতালেই আরও হাজার হাজার
শয্যা যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে!
অথচ প্রয়োজন একদিকে চিকিৎসাব্যবস্থার
বিকেন্দ্রীকরণ, অন্যদিকে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের কৌশল গ্রহণ।
দরকার মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানানোর ব্যবস্থা
করা। দরকার চিকিৎসা ও হাসপাতাল কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা না সাজিয়ে,
সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে চিকিৎসাকে দেখা। দরকার
জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল নেওয়া। রোগীর সংখ্যা কমানোর দিকে
জোর দিতে হলে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের দিকে
জোর দিতে হবে। সারা দেশের মানুষ যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে
থাকেন, আর তা থামানোর জন্য যদি নজর না দিই তাহলে গ্রামে গ্রামে মেডিকেল
কলেজ হাসপাতাল করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। এসব অসংক্রামক রোগে
মানুষের অকালমৃত্যুও থামানো যাবে না। ঘরে ঘরে কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা
পৌঁছবে? ওষুধ দিয়ে ঘর বোঝাই করে দেবে সরকার? স্বাস্থ্যসেবা বলতে তো সরকারও
বোঝে ওষুধ, মানুষও বোঝে ওষুধ। হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে গিয়ে যদি শোনে
সে সুস্থ, ওষুধের প্রয়োজন নেই, তখন মানুষ হতাশ হয়, ডাক্তার ও হাসপাতালের
ওপর বিরূপ হয়। এ ধারণা আগে বদলাতে হবে। নাহলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র
চলবে না। স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা, ওষুধ বিতরণ
একমাত্র কাজ নয়।
আমাদের নীতি নির্ধারক, বুদ্ধিজীবী, জনসাধারণ সবার কাছেই
স্বাস্থ্য হচ্ছে শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসা কর্মী। তাই রোগ প্রতিরোধ ও
স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য যেসব স্বাস্থ্যকর্মী কমিউনিটি ক্লিনিকে বসেন,
তাদের কোনো গুরুত্ব এ প্রতিবেদনে নেই। কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক
স্বাস্থ্যসেবা দেন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)। তিন মাসের
প্রশিক্ষণ নিয়ে সিএইচসিপি কাজ শুরু করেন। প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা ছাড়াও
তাদের কাজের একটি বড় অংশ রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, অন্তঃসত্ত্বাদের
স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া, শিশুদের টিকা দান, পুষ্টি সেবা, স্বাস্থ্য তথ্য ও
সচেতনতা তৈরি, জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের কাজ ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা
বড় অংশই হচ্ছে চিকিৎসার বাইরে জনস্বাস্থ্যের কাজ। জনস্বাস্থ্যের কাজ আরও
কার্যকরভাবে করতে গেলে আরও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। সেটা
আমাদের অগ্রাধিকারে নেই।
দেশের প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখবে
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্যের তথ্য ডিজিটাল রেকর্ডে রাখবে স্থানীয়
প্রাথমিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তথ্য অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
হবে। স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এলাকাতে সংক্রামক ব্যাধি
প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেবে তার নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে, যার একটি অংশ এখন
চালু আছে টিকাদান কর্মসূচি হিসেবে। অন্তঃসত্ত্বাদেরও খোঁজ রাখা হয় এখন,
তবে সবার জন্য এখনো ব্যবস্থা হয়নি। স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য শিশু-কিশোরদের
স্বাস্থ্যকর জীবণাচরণে উৎসাহিত করা ও ব্যবস্থা নেওয়াও জনস্বাস্থ্যের কাজ।
এজন্য স্কুলগুলোকে কেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। খেলার মাঠের ব্যবস্থা,
সাইকেল চালানোর জন্য রাস্তায় লেন তৈরি করা, স্কুলে নিরাপদ খাবার ও পানি
নিশ্চিত করা প্রভৃতি স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধের উদাহরণ। এলাকার
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া,
ম্যালেরিয়া থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করাটাও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ অন্যান্য
বিভাগের সঙ্গে মিলে নিশ্চিত করবে। একই ভাবে মাদকমুক্ত রাখা, বায়ু-পানিসহ
পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্ত রাখাও এর অংশ। আর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বাড়ির কাছে
চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা, বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি চিকিৎসার জন্য
যাওয়ার ব্যবস্থা, রোগ জটিল হয়ে পড়লে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে
বিশেষায়িত টারসিয়ারি হাসপাতালে রোগীর পরীক্ষা ও প্রয়োজনে ভর্তির ব্যবস্থা
করা প্রভৃতি। এসবই নাগরিকের কাছে স্বাস্থ্য পৌঁছে দেওয়ার উদাহরণ। আমরা যদি
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিউবওয়েল স্থাপন করে মানুষকে নিরাপদ পানির
ব্যবস্থা করে, স্বাস্থ্যসম্মত লেট্রিনের ব্যবস্থা করে কলেরায় মৃত্যু প্রায়
নির্মূল করতে পারি, তাহলে প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা কেন পৌঁছাতে
পারব না?
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে কমিউনিটি ক্লিনিক
পর্যায়কে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সম্ভবত এমবিবিএস ডাক্তার দ্বারা ক্লিনিক্যাল সেবাকে প্রাথমিক
স্বাস্থ্যসেবার ন্যূনতম মানদণ্ড বিবেচনা করেছেন সংস্কার কমিশনের সদস্যরা। এ
দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু বাস্তব? সিএইচসিপিরা সরকারি অনুমোদনক্রমেই প্রাথমিক
চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। সেটা কেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে বিবেচিত হবে
না? চিকিৎসক কর্তৃক সরাসরি চিকিৎসা দেওয়া ছাড়াও মাঠপর্যায়ের
স্বাস্থ্যকর্মীরা জনসাধারণকে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের বিষয়ে
অবহিত করেন, উদ্বুদ্ধ করেন, জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করেন (যেমন-
টিকা প্রদান কর্মসূচি, কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনায় কমিউনিটি গ্রুপ
পরিচালনা)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী সর্বজনীন স্বাস্থ্য
সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্যের পাঁচটি উপাদানই। সেগুলো হলো-
প্রতিরোধমূলক, উন্নয়নমূলক, প্রতিকারমূলক, পুনর্বাসনমূলক ও উপশমমূলক। কাজেই
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্তর্গত প্রাথমিক
স্বাস্থ্যসেবা যথাযথভাবেই পালন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত। দরকার এগুলো আরও
শক্তিশালী করা। তবে কমিউনিটি ক্লিনিক নামের মধ্যে ‘ক্লিনিক’ লাগিয়ে
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাকে এর প্রধান কাজ বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।
কারণ, তারা মনে করেন ‘ক্লিনিক’ বা ‘হাসপাতাল’ নাম না দিলে এবং ওষুধের স্টোর
না থাকলে মানুষ এ কেন্দ্রে আসবে না। এ মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। না হলে
জনস্বাস্থ্য গুরুত্ব পাবে না।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার করতে হলে
দেশের সংবিধান সংস্কারের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে জনসাধারণকে সোচ্চার হতে
হবে। সামনের বছরের বাজেটে যেন এর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ হয় সেজন্য
এখন থেকেই কথাবার্তা শুরু হওয়া দরকার। আর সবচেয়ে বেশি দরকার
জনস্বাস্থ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে জনগণেরই এগিয়ে আসা। জনগণের
চাহিদা সৃষ্টি না হলে কোনো প্রয়োজনীয় কাঠামো, উপরিকাঠামো ও ব্যবস্থা তৈরি
হলেও তা টিকে থাকে না।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
