
মাত্র
আট মাস আগে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছিলেন জমজ দুই বোন জয়া ও বিজয়া। চোখে
ছিল উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, মনে ছিল পরিবারের দুঃখ ঘোচানোর অদম্য প্রত্যয়। সেই
স্বপ্নের দেশ জাপান থেকেই এবার ফিরেছে শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ। স্বপ্ন
পূরণের আগেই জোড়া ভেঙ্গে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বিজয়া।
কুমিল্লার
দেবীদ্বার উপজেলার বরকামতা গ্রামের রিটন রঞ্জন ঘোষের মেয়ে বিজয়া ঘোষ।
জাপানের ওকায়ামা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে পড়াশোনার
ফাঁকে কাজ করতেন। লক্ষ্য ছিল—নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি পরিবারের অভাব
দূর করা। সেই স্বপ্ন পূরণে বাবা রিটন ঘোষ বিক্রি করেছেন নিজের সম্পদ ও
স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার। দধি-মাঠা বিক্রি করে সংসার চালানো এই মানুষটি
ধার-দেনা করে প্রায় ৩০ লাখ টাকা জোগাড় করে জমজ দুই মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন
জাপানে। ভেবেছিলেন, কষ্টের দিন একদিন শেষ হবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম
পরিহাস—গত ২১ জুন হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে হাসপাতালে নেওয়া হয় বিজয়াকে।
দু'দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৩ জুন জাপানের ওকায়ামা প্রিফেকচারের একটি
হাসপাতালে স্বপ্নকে অধরা রেখে পৃথিবীকে বিদায় জানান বিজয়া।
বিজয়া
বরকামতা নলিনী শিক্ষা নিকেতন থেকে ২০২২ সালে মাধ্যমিক এবং চান্দিনা ডা.
ফিরোজা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে
জাপানি ভাষা শেখার পর ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর জমজ বোন জয়ার সঙ্গে পাড়ি জমান
জাপানে। কেউ জানত না, সেটিই হবে তাঁর শেষ বিদায়।
পিতা রিটন রঞ্জন ঘোষ
জানান- ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় অনেক মনোযোগী ছিল আমার দুই মেয়ে জয়া ও
বিজয়া। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পর জাপান যাওয়ার জন্য
আমাদেরকে বলেন। নিজের জীবনের সব সম্পদ ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করে
দুই মেয়েকে একসাথে জাপান পাঠিয়েছি। কিন্তু কে জানতো এ যাওয়ায় আমার দুই
মেয়ের জোড়া ভেঙ্গে আমার বুক খালি করে দিবে।
সনাতন ধর্মের নিয়মানুযায়ী,
মা-বাবা মারা গেলে সন্তানরা শ্রাদ্ধ করে। কিন্তু আমি বাবা হয়ে মেয়ে মৃত্যুর
তিন দিন পর শুক্রবার সন্তানের শ্রাদ্ধ করলাম। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে
কি পরিমাণ ভারী তা কাউকে বোঝাতে পারবো না।
পিতামহ মনোরঞ্জন ঘোষ মন্টু
যেন ছিল তার পরম বন্ধু। দাদাকে নাম ধরে না ডাকলে তৃপ্তি পেতো না ৮০ বছর
বয়সী বৃদ্ধ দাদু মন্টু। দেশে থাকাবস্থায় বা বিদেশে থেকে দাদু নাতনির
ফোনালাপ যেন বাল্য বন্ধুকেও হার মানায়। নাতনির স্মৃতিচারণ করতে ফুপিয়ে
কাঁদছেন তিনি।
তিনি বলেন- "এই মন্টু" এমন প্রানবন্ত ডাকে আমার বুক ভরাবে
কেন? এই বাড়িটিতে এখন আর দুই বোনের হাসির শব্দ নেই। চারদিকে শুধু আহাজারি।
সবচেয়ে বড় কষ্ট থেকে যাবে অর্থাভাবে বিজয়ার মরদেহ দেশে আনতে পারেনি।
পরিবারকে
সুখী করার স্বপ্ন নিয়ে হাজার মাইল দূরের দেশে গিয়েছিলেন বিজয়া ঘোষ। কিন্তু
সেই স্বপ্ন আজ থেমে গেছে একটি হাসপাতালের নিস্তব্ধ কক্ষে। রয়ে গেছে শুধু
এক বাবার অপূর্ণ প্রত্যাশা, এক মায়ের বুকভাঙা কান্না, আর একটি পরিবারের
আজীবনের শূন্যতা।
