নিজস্ব প্রতিবেদক: যে ক্যাম্পাসে প্রতিদিন জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কথা, সেখানে এখন রাজত্ব করছে হাঁটুপানি, কাদা আর দুর্গন্ধযুক্ত স্থির জল। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি শাখা সামান্য বৃষ্টিতেই পরিণত হয় জলাবদ্ধ এক দুর্ভোগের নগরীতে। ভারী বর্ষণ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নগরীর বিভিন্ন এলাকার বৃষ্টির পানি এসে জমে পুরো ক্যাম্পাস তলিয়ে যায় হাঁটুপানির নিচে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে কলেজে প্রবেশ করতে হয়। এতে শুধু শিক্ষা কার্যক্রমই ব্যাহত হচ্ছে না, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, ডিগ্রি শাখার প্রধান সড়ক, একাডেমিক ভবনের নিচতলা, অডিটোরিয়াম, ছাত্রাবাসের সামনের অংশসহ অধিকাংশ এলাকায় পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও পানি এতটাই স্থির যে সেখানে জন্ম নিয়েছে শ্যাওলা ও মশার উপদ্রব। বৃষ্টির কয়েকদিন পরও পানি না নামায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। প্রতিদিন ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হাজারো শিক্ষার্থীকে এই নোংরা পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
অর্থনীতি বিভাগের ফেরদৌসী আক্তার ও গণিত বিভাগের রাকিবুল হাসানসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই কলেজ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেকেই সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারেন না। পরীক্ষার দিন ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। অনেকে জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে পানি পার হন, আবার কেউ ভেজা পোশাক নিয়েই ক্লাসে বসতে বাধ্য হন। নোংরা পানির সংস্পর্শে এসে অনেকের চর্মরোগ, পায়ের সংক্রমণ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে নিয়মিত উপস্থিতির হারও কমছে।
ওইসব শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নির্মাণ, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তাই কলেজ প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তারা।
এদিকে কলেজে ক্যাম্পাস বার্তা, সাংবাদিক সমিতি, বিতর্ক পরিষদ, থিয়েটার, বাঁধন, রেড ক্রিসেন্ট, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটসহ বেশকিছু সামাজিক সংগঠন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করার কথা থাকলেও সচেতন শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের কল্যাণে এসব সংগঠনের কোন কর্মকাণ্ডই চোখে পড়ছে না। ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান বিভিন্ন সংকটের মধ্যে বর্তমান জলবদ্ধতা সংকটে চরম দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা। অথচ কোন সংগঠনের পক্ষ থেকেই কোনো সামাজিক আন্দোলন কিংবা এসব বিষয় নিয়ে কলেজ প্রশাসনের মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি। তাহলে কলেজ ক্যাম্পাসে এসব সংগঠনের কাজ কি? প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল বাশার ভূঁইয়া বলেন, কলেজ ক্যাম্পাসে স্থায়ী জলবদ্ধতার অন্যতম কারণ শহর ও বিসিক শিল্প নগরীর ব্যবহৃত পানি। তুলনামূলক হারে কলেজ ক্যাম্পাস নিচু হওয়ায় সবগুলো পানি এখানে প্রবাহিত হয়। ফলে বর্ষায় বৃষ্টির পানি সঙ্গে ওইসব নোংরা পানি মিশে জলবদ্ধতা তৈরি হয়। আমরাও উদ্যোগ গ্রহণ করেছি ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাঁধের মাধ্যমে শহর ও বিসিক শিল্প নগরীর পানি গুলো আটকানোর। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময় মত কাজ শুরু না করায় বর্ষায় সে পড়েছে। এ বর্ষার মধ্যেই আমরা উন্নয়ন কাজগুলো করছি। আশা করি বাঁধ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজগুলো শেষ হলে ক্যাম্পাসে ৭০ ভাগ জলবদ্ধতার সংকট সমাধান হয়ে যাবে। একইসঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের কথা চলছে যেসব জায়গায় কালভার্ট গুলো না করায় পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন প্রকল্পের মাধ্যমে সেই কালভার্টগুলো পুনঃনির্মাণ করলে বাকি ৩০ ভাগ সমস্যাও দূর হবে।
অন্যদিকে জলাবদ্ধতার সংকট শুধু কলেজ ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নয়। একই জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে পাশের ধর্মপুর খাদ্যগুদাম, বিসিক শিল্পনগরী এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ আবাসিক এলাকা। মাসের পর মাস জমে থাকা দূষিত পানিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে খাদ্যগুদামে খাদ্য সংরক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পনগরীর অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় মানুষকে প্রতিদিন জলাবদ্ধ রাস্তা পেরিয়ে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারে যেতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় খাল, কালভার্ট ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলাধার ভরাটের কারণেও পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নগরীর বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে না পেরে নিচু এলাকাগুলোতে এসে জমা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এ অব্যবস্থাপনা এখন স্থায়ী জলাবদ্ধতার রূপ নিয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এলাকাটি সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক সীমানার বাইরে থাকায় সিটি কর্পোরেশন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। আবার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। ফলে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং প্রতি বর্ষায় তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র একটি ড্রেন নির্মাণ বা খাল পরিষ্কার করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন পুরো এলাকার জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ।
কুমিল্লার ব্যবসায়ী নেতা জামাল আহমেদ বলেন, একটি আধুনিক শহরের জন্য পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-জলাধার সংরক্ষণ, অবৈধ দখলমুক্ত পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতিটি বর্ষাই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, ধর্মপুর খাদ্যগুদাম, বিসিক শিল্পনগরী এবং আশপাশের জনপদের মানুষের জন্য নতুন করে দুর্ভোগের বার্তা বয়ে আনবে।
জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ওয়াসাকে কার্যকর করা জরুরী। উনেন কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসার কার্যকর হলে সকল সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করলে শহরতলীর এ অঞ্চলটির জলাবদ্ধতা দূর করার সম্ভব হবে। ভিক্টোরিয়া কলেজ, খাদ্যগুদাম, শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকাকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে বেশ কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এই সংকট দূর হবে।